বংশী বললে—আপনি একটু সবুর করুন, আমি সকড়ি বাসন ক’টা রেখে আসি।
আজো মনে আছে দুপুরবেলার বড়বাড়ির সেই বিগত-শ্রী চেহারা দেখে চোখে জল এসেছিল সেদিন। ছাদের ওপর অসংখ্য পায়রা এসে বাসা করেছে। কে তাদের খেতে দেয়, কে তাদের দেখাশুনো করে কে জানে। একদিন এই পায়রা নিয়েই কত মামলা হয়ে গিয়েছে ঠনঠনের ছেনি দত্তর সঙ্গে। কত পয়সা খরচ হয়েছে এদের খাওয়াতে, পুষতে। ভৈরববাবু ভালো শিস দিতে পারতো! সেই শিস শুনে কলকাতার আকাশে মেজবাবুর পায়রা একদিন বুক ফুলিয়ে উড়েছে।
সমস্ত বাড়িটা যেন খাঁ-খাঁ করছে। বাড়িটা তিন ভাগে ভাগ হচ্ছিলো। ভালো করে ভাগ হওয়ার আগেই সবাই আলাদাআলাদা হয়ে গেল। পাঁচিলগুলো পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়নি। বালির কাজ হয়নি শেষ পর্যন্ত। ইটের ফাঁকে-ফাঁকে শ্যাওলা গজিয়েছে। কতরকম বুনো গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ফাটলে-ফাটলে। কতরকম ফুল ফুটেছে গাছগুলোতে। বিচিত্র বুনো ফুল। হলদে, লাল, নীল। রান্নাবাড়ির এটো কাটা এসে জমে পাঁচিলের কোণে। বংশী একা সব ঝাঁট দিতে পারে না।
একটা চিল হয় তো নির্মেঘ আকাশে গোল হয়ে ওড়ে। মাঝেমাঝে কর্কশ ডাক ছাড়ে। সে-শব্দ এখান থেকে শোনা যায়। তারপর কখন বেলা পড়ে আসে, ছায়াটা আস্তে-আস্তে বড় হয়, আর তারপর এক সময় রোদের শেষ আভাটুকু পর্যন্ত মুছে যায় পৃথিবী থেকে। তখন শশী ডাক্তারের গাড়িটা এসে হয় তো লাগে গাড়িবারান্দার নিচে। শশী ডাক্তার লাঠিতে ভর দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায় ওপরে। বংশী পেছন-পেছন ওষুধের বাক্সটা বয়ে নিয়ে যায় সঙ্গে-সঙ্গে।
আজো মনে আছে ছোটবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে ভূতনাথ সেদিন খুব চমকে উঠেছিল। প্রথমে ইচ্ছেই ছিল না ভূতনাথের। কখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা তো বলেনি ছোটবাবুর সঙ্গে। কিন্তু বংশীর পীড়াপীড়িতে আর না বলতে পারেনি।
বংশী বলেছিল—আপনি বলবেন শালাবাবু যে, আপনি সব ব্যবস্থা করবেন—কোর্টে-কাছারিতে ঘোরাঘুরি আপনিই করবেন, ছোটবাবু যেন কিছু না ভাবেন।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু আমি যে দেশে যাচ্ছি কাল?
—সে কথা আর বলবেন না হুজুরকে, মনে বড় কষ্ট পাবেন।
ভূতনাথ বললে-আমাকে কি চেনেন ছোটবাবু?
—চেনেন না, কিন্তু আমি বলেছি আপনার কথা, বলেছি যে মাস্টারবাবুর শালা, এ-বাড়িতে অনেকদিন আছেন। শুনে চুপ করে রইলেন, বেশি তো কথা বলেন না আজ্ঞে, বেশি কথা কোনোদিনই বলতেন না, এদানি তা-ও ছেড়ে দিয়েছেন। চুপ-চাপ বসে চোখ বুজে কেবল ভাবেন, কী যে মাথা-মুণ্ডু ভাবেন কে জানে?
ঘরের সামনে গিয়ে প্রথমে বংশীই এগিয়ে গেল। ভেতরে উঁকি মেরে দেখে নিয়ে হাতছানি দিয়ে একবার ডাকলে ভূতনাথকে।
ভূতনাথ সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাতির দাঁতের কাজ করা একটা পালঙ। মোটা পুরু গদীর ওপর বিছানা পাতা। সামনে শ্বেতপাথরের ছোট টেবিলের ওপর ওষুধের শিশি-বোতল। পাথরের খল-নুড়ি। ঘরময় একটা বিষণ্ণতা। অনেকদিন ওষুধ আর অসুখের গন্ধ জয়ে-জমে ঘরের হাওয়া যেন বিষিয়ে উঠেছে। ঘরে ঢোকবার মুখে একটা তীব্র কটু গন্ধ নাকে লাগে। দেয়ালের পঙ্খের কাজ-করা ফুল লতাপাতাগুলো পর্যন্ত ধোঁয়া লেগে কালো হয়ে গিয়েছে।
ছোটকর্তার গায়ে মলমলের পাঞ্জাবী একটা। কিন্তু ভাঁজেভঁজে আগেকার সে-বাহার নেই আর। ময়লা হয়ে গিয়েছে পরে-পরে। অনেকদিন দাড়ি কামানো হয়নি। দেয়ালের গায়ে বালিশের ওপর হেলান দিয়ে বসেছিলেন ছোটকর্তা। জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে কী যেন ভাবছিলেন।
ভূতনাথ যেতেই বংশী বললে—এই যে শালাবাবু এসেছেন— যার কথা বলছিলাম ছোটবাবু।
ছোটকর্তা ঘাড় ফেরালেন।
ভূতনাথ দুটো হাত জোড় করে নমস্কার করলে।
ভূতনাথের মনে হলো—সেই ছোটবাবু, যার সামনে বেরোতে ভয় করত। কী বিরাট চেহারা ছিল। রাশভারী মানুষ। বংশীকে মারতে-মারতে একদিন প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন। কেমন যেন মায়া হলো ভূতনাথের। অনেকদিন আগেকার একটা বটগাছের কথা মনে পড়লো ভূতনাথের। মঙ্গলচণ্ডীতলার পাশে একটা বিরাট বটগাছ ছিল ফতেপুরে। চার-পাঁচ পুরুষের গাছ। ডালপালা বেড়ে-বেড়ে সমস্ত বারোয়ারিতলাটা একেবারে ছেয়ে ফেলেছিল। একদিন ঝড়ের রাত্রে সেই গাছটা হুড়মুড় করে পড়ে গেল। গাঁ শুদ্ধ লোক ভোরবেলা ভিড় করে দেখতে গেল। বিরাট গাছ প্রায় এক কাঠা জমি উপড়ে নিয়ে পড়েছে। কাছে গিয়ে কিন্তু সবাই অবাক হয়ে গিয়েছে। গাছ নয় তো বিরাট বনস্পতি বললেই চলে।
তারক স্যাকরা একটা কুড়ল নিয়ে কোপ মারতে যাচ্ছিলো।
নন্দজ্যাঠা থামিয়ে দিলে। বললে—খবরদার–
ভূষণকাকাও বললে—কেউ কাটতে পারবে না—মা মঙ্গলচণ্ডীর গাছ।
মল্লিকদের তারাপদ বললেও গাছ নদীতে ফেলে আসাই ভালো কাকা।
নন্দজ্যাঠা প্রবীণ লোক। বললে—না, যেমন আছে তেমনি থাক। মায়ের গাছ, মা যা ইচ্ছে করবেন তাই হবে।
মঙ্গলচণ্ডীর কী ইচ্ছে হলো কে জানে! সেই গাছ সেখানেই পড়ে রইল। লোকে মায়ের পূজো দিতে এসে ভাঙা গুড়িটাতেও সিঁদুর লাগিয়ে দিয়ে যায়। ষষ্ঠীপূজোর দিন দলে-দলে মেয়েরা আসে। পূজো দেয় মাকে। আর জল ঢালে গুড়িটার ওপর। কতকাল এমনি করে কেটে যায়। ফাটলের গর্ততে ক্রমে মাটি জমে তার ওপর আগাছা জন্মালো। সেই আগাছাই বড়-বড় হয়ে একদিন ঢেকে দিলে সমস্ত গুড়িটাকে। চড়কের মেলার সময় সেখানটা ঘিরে জলসত্র হতো। আবার মেলার শেষে অন্ধকার রাত্রিতে কেউ মঙ্গলচণ্ডীর পূজো দিতে এসে গুড়িটাকেও প্রণাম করে যেতে। কিন্তু ভূতনাথের বড় ভয় করতোগুড়িটাকে দেখলে। মনে হতো ওখানে যত রাজ্যের সাপ-খোপ যেন বাসা বেঁধে আছে!
