ভূতনাথ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে তেমনি ভাবে। নরহরি মহাপাত্রের দেবতাগুলো যেখানে ছিল সেখানে সেই অশ্বগ্ধ গাছটা আর নেই এখন। একদিন ঝড়ে বেদীশুদ্ধ শেকড় উপড়ে পড়ে গিয়েছিল। ভূতনাথ গলির ভেতর ঢুকে সেইখানে দাঁড়িয়ে আবার পেছন ফিরে দাঁড়ালো। লোকটা যেন গলির মুখে এসে দাঁড়ালো একবার। তারপর ভূতনাথকে দেখেই সরে পড়লো আবার। ভূতনাথ ভাবলে—দূর হোক ছাই—ও নিশ্চয়ই স্পাই।
নিবারণ বলতে টিকটিকি। তা টিকটিকিই বটে। কয়েকবারু রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুধু নিবারণের সঙ্গে কথা বলেছে ভূতনাথ। তাতেই তার ওপর সন্দেহ। নরেন গোঁসাইকে জেলের মধ্যে গুলী করে মারার পরদিন থেকেই যেন ওদের দৌরাত্ম বেড়েছে। রাস্তায় বাড়িতে কোথাও শান্তি নেই।
নিবারণ বলেছিল—ম্যাটি কুলেশনে ব্রিটিশ-হিস্ট্রি পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে জানেন?
ভূতনাথ জানতো না। বললে—কেন, আমাদের সময়ে তো পড়েছি?
নিবারণ বললে—বেকার সাহেব আর ফুলার সাহেব ভাবলে ওই ব্রিটিশ-হিস্ট্রি পড়েই বুঝি আমাদের মাথা বিগড়ে গিয়েছে। ম্যাগনা কার্টা, স্টুয়ার্ট রাজাদের কাণ্ড, হ্যাম্পডেন, ক্রমওয়েল, চার্লস ফাস্ট এসব কথা হিস্ট্রি পড়েই তো জেনেছি কিন্তু হলে কী হবে, বন্ধ করার পর থেকে যারা হয় তো কখনও পড়তো না তারাও পড়তে আরম্ভ করেছে।
ভূতনাথের মনে আছে অত কাণ্ড করেও তবু কিছু সুরাহা হয়নি। কালীঘাটে যেদিন কেওড়াতলাতে পোড়াতে নিয়ে এসেছিল কানাই দত্ত আর সত্যেন বোসকে, সে কী ভিড়! পঞ্চাশ হাজার লোক রাস্তায় ভিড় করে সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটু দেখবে বলে। নরেন গোঁসাইকে খুন করার জন্যে ফাঁসি হয়েছিল দুজনের। অত ভিড় এক জায়গায় জীবনে কখনও দেখেনি ভূতনাথ। স্বামী বিবেকানন্দ এসেছিলেন সেই একদিন শেয়ালদ’ স্টেশনে, সে ছিল এক ভিড়, তারপর পার্শিবাগানে সেই আনন্দমোহন বোসের ‘সভার ভিড়, আর তারপর এই ভিড়। এ-ভিড় যেন সকলকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।
পাশের কোন্ বাড়িতে ঢং-ঢং করে অনেকগুলো বেজে গেল। রাত অনেক হয়েছে। আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই। পকেট থেকে চাবি বার করে বড়বাড়ির গেট খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো ভূতনাথ।
৪৩. সকালবেলা দুমদুম করে কে দরজা ঠেলছে
সকালবেলা দুমদুম করে কে দরজা ঠেলছে। দরজা খুলে ভূতনাথ দেখলে-বংশী।
—কাল আপনি কত রাত্তিরে এলেন শালাবাবু, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার পায়ে ব্যথা ধরে গেল।…একি আপনার চোখ যে লাল হয়ে রয়েছে, ঘুম হয়নি বুঝি?
ঘরের কোণে এটো বাসনগুলো এক হাতে তুলে নিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে দিলে বংশী। বললে—কাল বড় ভাবনায় পড়েছিলাম আজ্ঞে, আদালতের শমন এসেছিল, ছোটবাবুর কাছে নিয়ে গেলাম, ছোটবাবু পড়ে বললে-মেজবাবুর কাছে নিয়ে যা-তা এক হাতে সব কাজ তো করতে হয়, সব কাজ সেরে মরতে-মরতে গেলাম সেই গরাণহাটায় গিয়ে দেখালাম মেজবাবুকে—মেজবাবুর কী মেজাজ কী বলবো, বলে—আমার দেখার কি দরকার, বাড়ি আমি ছেড়ে দিয়েছি, ওরা যা ইচ্ছে করুক-বাড়ি আমার চাইনে।
আমি বললাম—ছোটবাবু যে আপনার কাছে আনতে বললে হুজুর?
মেজবাবু বললে—তা আমার কাছে এনে কী হবে? আমি কি বাড়িতে বাস করি?
মেজবাবুর পায়ে হাত দিয়ে বললাম—তা ছোটবাবুর তো এই অবস্থা, এখন কেমন করে বাড়ি ছাড়ে?…বিবেচনাটা দেখুন একবার মেজবাবুর।
ভূতনাথ জ্ঞিজ্ঞেস করলে—তারপর?
–তারপর গেলাম সেই পাথুরেঘাটায়। ছুটুকবাবু তো ননীলালবাবুর বন্ধু ছিল, ননীবাবুকে এক কালে কত আসতে দেখেছি। এ-বাড়িতে। ছুটুকবাবুর কথায় যদি ননীবাবু কিছু করে, তা গিয়ে দেখা হলো না-ছুটুকবাবু কাজে বেরিয়ে গিয়েছে।
—কী কাজ? ছুটুকবাবু আবার কি কাজ করছে আজকাল?
বংশী বললে—আমি তার কি খবর রাখি কিছু? ওদের সরকারই বলেছে ছুটুকবাবু নাকি উকিল হয়েছে, আদালতে যায় রোজ।
—ছুটুকবাবু উকিল হয়েছে? শেষকালে কি উকিল হলো নাকি?
বংশী বললে—তাই আপনাকে খুঁজছিলাম আজ্ঞে, আপনি যদি ছুটুকবাবুকে গিয়ে ধরেন, তো ননীবাবুকে বলে মামলা তুলে নেয়। মামলা হলে বড়বাড়ির বাবুদের মামে, তা বাবুরা তো সবাই বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে, শুধু ছোটবাবু আর ছটম আছে, কী করে বাড়ি ছাড়ে হুজুর, শরীরের যা অবস্থা তাতে কোথায়ই বা যাবে, এখনও ধরে বসিয়ে মুখে তুলে খাওয়াতে হয় যে!
ভূতনাথ চুপ করে রইল। খানিক পরে বললে—আমি যে কাল দেশে যাচ্ছি রে!
—দেশে? দেশ-এর কথা শুনে বংশীও অবাক হয়ে গিয়েছে। শালাবাবুও দেশ-এ যাবে।—দেশ-এ যে কেউ নেই বলেছিলেন?
—তবু যাবো একবার দেশে, পুরোনো বাড়িটা তো আছে, এতদিনে হয় তো জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছে, হয় তত বাঘ এসে উঠেছে ভিটেয়।
বংশী ভয়ে চোখ বড়-বড় করে রইল। বললে—এ-সময়ে আপনি গেলে চলবে কী করে শালাবাবু, দু’দিন পরে গেলে চলে না?
—না। মামলা কবে?
বংশী বললে-কাল।
ভূতনাথ চুপ করে রইল।
বংশী আবার বললে–কাল না হয় না-ই গেলেন শালাবাবু।
ভূতনাথ এবারও চুপ করে রইল। কী-ই বা সে করতে পারে!
বংশী আবার বললে—আমি কিন্তু আপনার কথা বলেছি ছোটবাবুকে।
—ছোটবাবুকে? কেন?
—আজ্ঞে, ছোটবাবু বড় মুষড়ে পড়েছে, আমি কাল ছুটুকবাবুর বাড়ি থেকে ফিরে এসে বললাম—কিছু ভাববেন না ছোটবাবু, শালাবাবু লেখাপড়ি জানা লোক, সব তিনি করবেন। তা আপনি একবার যাবেন আজ দেখা করতে ছোটবাবুর সঙ্গে?
–ছোটবাবুর সঙ্গে?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, দোষ কী, যে-বিপদে পড়েছেন, আমরা না দেখলে কে দেখবে বলুন তো!
ভূতনাথের তেমন ইচ্ছে ছিল না। তবু বললে—তা চল।
