ভূতনাথ বললে—তোমার স্বাধীন ইচ্ছেয় বাধা দেবো না আমি, কিন্তু আমাকে তাদের ঠিকানাটা দাও।
জবা এবার উঠলো। উঠে ঘরের একপাশে কাঠের সিন্দুকটা খুলে একটা কাগজের টুকরো বার করলে। ভূতনাথের কাছে এসে বললে–এতেই ঠিকানা লেখা আছে, এ-চিঠি ঠাকুমা লুকিয়ে বাবাকে লিখেছিলেন।
অনেক বছর আগের চিঠি। ভাঁজে-ভাঁজে ছিঁড়ে গিয়েছে। সাদা কাগজ কালো হয়ে এসেছে। তবু স্পষ্ট বাঁকা-চোরা অক্ষর ডিঙিয়ে ভূতনাথ সমস্তটার পাঠোদ্ধার করলো। যে-ঘটনা জবা এতক্ষণ বলেছে হুবহু সেই কাহিনী। শেষে পাত্রের নাম ঠিকানা লেখা। ভূতনাথ পড়লে-পাত্রের নাম—শ্রীঅতুল চক্রবতী, পিতার নাম শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, স্বভাব কুলীন—নিবাস ফতেপুর, পোস্টাপিস-গাজনা, জেলা নদীয়া। পড়তে-পড়তে ভূতনাথের হাতটা হিম হয়ে এল! মনে হলো—এ কার কাহিনী শুনছে সে! তাদেরই গ্রাম, তাদেরই পোস্টাপিস, তারই বাবার নাম। আর তারই বাবার দেওয়া নাম—অতুল। বাবা মারা গিয়েছেন তার জ্ঞান হবার আগে। অল্প-অল্প মনে পড়ে বাবার কথা! বাবার সঙ্গে ঘুরতো সে। পিসীমা’র কাছেও শুনেছে। জমিদারীর কাছারিতে কাজ করতেন বাবা আর ঘুরতেন গ্রামে-গ্রামে। তার বেশি আর কিছু মনে নেই। কিন্তু এ-ঘটনা কেমন করে কবে তার জীবনে ঘটে গিয়েছে কেউ তো বলেনি। অথচ ভূতনাথ ছাড়া যে এ আর কেউ, সে-সন্দেহও করবার কারণ নেই। ও ঠিকানায় আর কে থাকবে। বাবার যে একমাত্র ছেলে সে!
আশ্চর্য হবার শক্তিও যেন চলে গিয়েছে ভূতনাথের। বিস্ময়ও নয়, আনন্দও নয়, দুঃখও নয়, অবসাদও নয়। এ এক অপূর্ব অনুভূতি। কোথায় কেমন করে এ-সংবাদ এতদিন লুকিয়েছিল কে জানে। কোথায় কী ভাবে কার অদৃশ্য ইঙ্গিতে সে এখানে এসে হাজির হয়েছিল, কে বলবে। কে বলবে এ সুসংবাদ না দুঃসংবাদ! সে কি অকপটে স্বীকার করবে নিজের পরিচয়! সে কি দাবি করবে তার ন্যায্য পাওনা! যা ছিল স্বপ্নের জিনিষ তা-ই যখন সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে, তখন কি ত্যাগের মহিমা দেখিয়ে বিড়ম্বিত হবে সারা জীবন! অযাচিত এমন দান সে কি গ্রহণ করতে অস্বীকার করবে! সে কি জবার সামনে এখনি স্বীকার করবে—এ নাম আমারই! এ ঠিকানা আমারই—এ আমারই বাবার নাম। আমিই সেই অতুল। আমার বাবার দেওয়া নাম অতুল আর পিসীমা নাম দিয়েছিল ভূতনাথ।
জবার মুখের দিকে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। সে-মুখে যেন কোনো বৈলক্ষণ্য নেই। কিন্তু আজ মনে হলো জবা যেন অনেক সুন্দরী। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য যেন ওই মুখে এসে আশ্রয় নিয়েছে আজ। এতদিনের দেখা জবাকে যেন নতুন ঠেকছে আজ এই মুহূর্তে! এখন এ-জবা তার নিজের। এখনি জবাকে সে নিজের বলে দাবি করতে পারে। জবার ওপর তার যেন বহুদিনের অধিকার। শুধু অধিকার নয়। অধিকারের চেয়েও বেশি কিছু। জন্মজন্মান্তরের পরিচয়ে তাদের দুজনের যেন হৃদয় বিনিময় হয়ে গিয়েছে। যেন বহুযুগ ধরে জবাই তার সঙ্গিনী হয়ে বার-বার পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে! আরো বহু যুগ ধরে বার-বার জন্মগ্রহণ করবে।
বড় ভালো লাগলো ভূতনাথের। ভালো লাগলো সান্নিধ্য। আজ এ-সান্নিধ্যে যেন কোনো অন্যায় নেই, কোনো অনুতাপ নেই। এই ভালো লাগা আজ আর অপরাধ নয়। এতদিন মনের যে প্রবণতাকে সে সযত্নে গোপন করে এসেছে, তার শিক্ষা, তার ধর্ম দিয়ে তাকে অগোচরে রেখেছে, আজ আর তার প্রয়োজন নেই। সে-প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে। আজ সে সগৌরবে বিশ্বসংসারকে তা জানিয়ে দিতে পারে। ঘোষণা করতে পারে ছাদের চূড়োয় উঠে নিজের সৌভাগ্যের কাহিনী।
কখন যে ভূতনাথ বার-শিমলে থেকে বেরিয়ে চলে এসেছিল তার খেয়াল ছিল না। সমস্ত অন্ধকার রাস্তাটাতে সে নিজের এই অবস্থার কথাতেই মগ্ন ছিল।
বেরোবার সময় জবা বলেছিল——আবার কবে আসবেন?
ভূতনাথ বলেছিল—এ খবরটা নিয়ে আসবো একদিন।
–আপনি কি ওদের দেশে যাবেন?
–ও তো আমাদেরই দেশ।
জবাও যেন আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। এক আশ্চর্য কৌতূহলে সমস্ত মুখখান ভাস্বর হয়ে উঠেছে যেন। বলেছে—আপনাদের বাড়িও কি ওখানে?
–শুধু বাড়ি নয়, এক দেশ, এক পোস্টাপিস, এক গ্রাম, এক পাড়া—একই…বলতে গিয়েছিল—একই নাম। বলতে গিয়েছিল
—ভূতনাথ আর অতুল নাম একই লোকের। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছে ভূতনাথ ঠিক সময়ে। হঠাৎ তাড়াতাড়ি কিছু করে ফেলা ভালো নয়। একটু ভাববে সে। নিরিবিলিতে তার চোরকুঠুরিতে তক্তপোশটার ওপর শুয়ে-শুয়ে সে ভাববে। ভাববে —এ কেমন করে সম্ভব হলো। কোথা থেকে কোন্ অদৃশ্য ঈশ্বরের ইঙ্গিতে এ সম্ভব হলে তার জীবনে। এ তার আশীর্বাদ অভিসম্পাত।
৪২. কলকাতার রাস্তা তখন জনহীন
কলকাতার রাস্তা তখন জনহীন। শুধু একবার যেন মনে হলো সেই আলোয়ান গায়ে লোকটা দূর থেকে তার পেছনেপেছনে আসছে। তাকে অনুসরণ করছে। অদ্ভুত লোকটা। যেখানে গিয়েছে ভূতনাথ, সেখানেই তাকে অনুসরণ করে। কিন্তু হঠাৎ সোজা হয়ে থমকে দাঁড়ালো ভূতনাথ। আজ যেন তার সাহস ফিরে এল। আজ—কি জানি কেন—তার যেন বিশ্বসংসারে কাউকে আর ভয় করবার কথা নয়। আজ যেন সে যে-কোনো বিপদের সামনে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে।
বনমালী সরকার লেন-এর মুখে এসে দাঁড়িয়ে ভূতনাথ একেবারে সোজাসুজি লোকটার দিকে মুখোমুখি হয়ে রইল। কাছে এলেই ভূতনাথ জিজ্ঞেস করবে—কে তুমি? কী চাও? কেন আমার পেছনে ঘোর দিনরাত? কী তোমার মতলব?
কিন্তু আশ্চর্য! লোকটা তাকে থামতে দেখেই পাশের একটা গলির ভেতর আত্মগোপন করে গিয়েছে।
