রাস্তাময় বেদানা ডালিম আঙুর নাশপাতির ছড়াছড়ি। ভিড় জমে গেল চারিদিকে। চার পাঁচটা কাবুলিওয়ালা যেন পাগলের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগলো। হাতের লম্বা লাঠিগুলো নিয়ে ঘোরাতে লাগলো। দমাদম জানালা-দরজা বন্ধ হয়ে গেল বেঙ্গল সেমিনারির। স্কুলের নাম লেখা সাইন বোর্ডখানা। টেনে নামিয়ে ভেঙে দিলে।
ভুতনাথের কেমন অবাক লাগলো—কেন হঠাৎ এই মারামারি। অথচ একটু আগেও তো কোনো কিছু ছিলো না। ছেলেরা ফল কিনছিল ওদের কাছে।
-কী হলো মশাই–কী হলো।
যে যা পারলে দুটো চারটে বেদানা কুড়িয়ে পকেটে পুরলে।
একজন বললে—ছেলেদেরই দোষ।
-কেন?
–ওরা ওদের বেইমান বলেছে।
–বেইমান! বেইমান বলা এত বড় অপরাধ! হট্টগোলের মধ্যে থেকে ভূতনাথ বেরিয়ে এল। কয়েকটা লাল চামড়ার সাহেব পুলিশ ততক্ষণ এসে পড়েছে। ভয়ে যে যেদিকে পারলে দৌড় দিলে। এখনি হয় তো লাঠি মারবে। ওরা ভয়ানক মারে। গোরাদের ক্ষমতা কি কম। এসেই চার পাঁচটা কাবুলিওয়ালাকে ধরে ফেললে। তারপর দমাদম লাথি মারতে লাগলো স্কুলের বন্ধ দরজার ওপর। রাস্তার গাড়ি ঘোড়া ট্রাম লোক-চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। হৈ হৈ কাণ্ড!
আবার বনমালী সরকার লেন-এর মধ্যে ঢুকে পড়লো ভূতনাথ। বুকটা তখনও তার দূর দূর করে কাঁপছে। বেইমান! কথাটার মানে কী!
মনে আছে বহুদিন আগে পঞ্চানন একবার হেডমাস্টার অবনী বাবুর কাছে খুব মার খেয়েছিল। দুই হাতের পাতায় তখনও লাল দাগ আছে। রাস্তায় এসে বলেছিল—এই বইগুলো একটু ধর তো—বোধ হয় জ্বর আসছে।
পঞ্চাননের কপালে হাত দিয়ে ভূতনাথ চমকে উঠেছিল। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে যেন। জ্বরের ঝোঁকে সেই রাস্তার মধ্যেই শুয়ে পড়েছিল পঞ্চানন।
মনে আছে সেই জ্বরের ঘোরেই পঞ্চানন বলেছিল—শালা হেডমাস্টারটা বেইমান।
ভূতনাথ সেদিন মানে বোঝেনি পঞ্চাননের কথাটার। বেঙ্গল সেমিনারির ছেলেদের বেইমান বলায় কাবুলিওয়ালাদের রাগের কারণটাও ভূতনাথ বুঝতে পারেনি সেদিন। কিন্তু মানে বুঝতে পেরেছিল অনেকদিন পরে, যেদিন ছোটবৌঠান বলেছিল—ভূতনাথ তুই এত বড় বেইমান–
হেডমাস্টারের বেইমানি বোঝবার বয়েস তখন হয়নি ভূতনাথের। কাবুলিওয়ালাদের বেইমানির অর্থও খুঁজে পাওয়া যায়নি সেদিন। কিন্তু ভূতনাথ যে কেমন করে বেইমান হলো সে প্রশ্ন…কিন্তু ছোটবৌঠান তো তখন অপ্রকৃতিস্থ। তাকে অবশ্য ক্ষমা করেছিল ভূতনাথ। ছোটবৌঠানকে চিনেছিল বলেই তো ভূতনাথ পরে। তাকে ক্ষমা করতে পেরেছিল।
০৪. সেদিন আপিস থেকে ব্রজরাখাল ফিরলো
সেদিন আপিস থেকে ব্রজরাখাল ফিরলো একটা মস্ত বড় বাণ্ডিল নিয়ে। বললে—তোমার ও জামা-কাপড়ে চলবে না বড় কুটুম—ভদ্রলোকের কাছে চাকরি করতে গেলে একটু ভদ্র হয়ে যেতে তো হবে–
একেবারে তৈরি কামিজ নিয়ে এসেছে। ধুতিও একজোড়া। লাট্ট মার্কা রেলির ধুতি। যেমন মিহি তেমনি খাপি।
-আর এই নাও জুতো—এ তো ফতেপুরের রাস্তা নয়। এখানে খোয়ার রাস্তা, খালি পায়ে চললে পা ছিঁড়ে যাবে একেবারে।
ভূতনাথ জুতো জোড়া পায়ে দিলে। ব্ৰজরাখাল নিজের হাতে ফিতে বেঁধে দিলে। বললে—পছন্দ হয়েছে তো। টেরিটি বাজারের খাস চিনে-বাড়ির জুতো।
সেই বিকেল বেলা ভূতনাথকে জুতা জামা কাপড় পরিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারদিক থেকে দেখলে ব্রজরাখাল। তারপর বললে–এইবার সব ছেড়ে রাখখা, পরশু আমার ছুটি আছে আপিসের, ওইদিন আবার পরতে হবে।
-কেন?
ব্ৰজরাখাল উত্তর দিলে না। কিন্তু খেতে বসে কথাটা বললে ব্ৰজরাখাল। বললে—চাকরি তো কখনও কয়রানি বড়কুটুম চাকরির শতেক জ্বালা—এক-একবার ভাবি ছেড়ে দেবো-আমার কিসের দায়। না-আছে বাপ-মা, না-আছে বউ-ছেলে,—কিন্তু ঠাকুর বলতেন—
ভূতনাথ মুখে ভাত পুরে বললে—কোন্ ঠাকুর?
—আমার ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব-গেঁয়ো ভূত, নাম শোনননি তুমি—দেখবে, বলে রাখছি তোমাকে—ওই ঠাকুরের ছবিই একদিন দেশের ঘরে ঘরে থাকবে—আমার চোখ খুলিয়ে দিয়েছেন ঠাকুর। তোমার বোন যখন মারা গেল বড়কুটুম, সে বড় কষ্টের মধ্যে কাটাতে লাগলাম—সে যে কী কষ্ট কী বলবো। বড় ভালোবাসতাম রাধাকে—বলে ভাত খেতে খেতে হো হো করে হেসে উঠলো ব্রজরাখাল।
ব্ৰজরাখাল হাসলো না কেঁদে উঠলো দেখবার জন্যে ভূতনাথ ব্ৰজরাখালের মুখের দিকে তাকালে। কিন্তু ব্রজরাখাল কোনো দিকেই যেন চেয়ে নেই।
আবার বলতে লাগলো বজ্ররাখাল—তোমার বোন আমায় একদিন কী বলেছিল জানো–
ভূতনাথ বললে—কী।
-এই অসুখ হবার কিছুদিন আগে, আমি শনিবার দিন বাড়ি গিয়েছি। রাধা বললে—তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল— বললাম—কী কথা বলো। রাধা বললে-আমার ভূতোদাদার বড় ইচ্ছে কলকাতা দেখবার। আমায় কতবার বলেছে-তুমি চাকরি করে কলকাতায়, ওকে একবার কলকাতা দেখাতে পারো না? বললাম—পারি। পারি তো বললাম, কিন্তু তার কিছুদিন পরেই ও মারা গেল। আমার মনের অবস্থা তখন তত বুঝতে পারছো—ফতেপুর থেকে ফিরে এসে লম্বা ছুটি নিয়ে দিনরাত কেবল দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে পড়ে থাকতাম। বেশ ভালো লাগতো। মনে হলো দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে আর সংসারে ফিরে যাবো না কিন্তু ফিরে এলাম ভাই,ঠাকুরই আমায় ফিরিয়ে দিলেন—কেমন করে দিলেন সেই কথা বলি–
সেদিন সব ভক্তরা বসে আছি। নরেন আছে, লাটু আছেগিরিশও ছিলো বোধহয়। আমি বললাম—ঠাকুর আমি আর সংসারে ফিরে যাবো না।
ঠাকুর জানতেন সব। রাধার মারা যাওয়ার খবর শুনে খুব কেঁদেছিলেন। জানতেন আমার কেউ নেই সংসারে—সংসারে কারো ওপর কোনও দায়িত্ব নেই। কার জন্যেই বা চাকরি করছি, কার জন্যেই বা টাকাকড়ি—একটা পেট, সে-জন্যে ভাবিনে। ঠাকুর শুনলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, একটা গল্প শোন। বললেন-দেখ নারদ মুনির ভারি অহঙ্কার ছিল যে, ত্রিভুবনে তাঁর মতন ভক্ত আর কেউ নেই। বিষ্ণু শুনে বললেন—তোমার চেয়েও আর একজন বড় ভক্ত আমার আছে হে—সে এক চাষী, যাও তাকে গিয়ে দেখে এসো নারদ। নারদ গেলেন দেখতে। গরীব চাষা। সারাদিন ক্ষেতে খামারে কাজ করে—ফুরসুৎ নেই মরবার। কেবল সকালে ঘুম থেকে উঠে আর রাত্রে শুতে যাবার আগে দু’বার মাত্র হরির নাম করে। নারদ কিছু বুঝতে পারলেন না। এলেন বিষ্ণুর কাছে। বললেন-দেখে এলাম তোমার ভক্তকে—কী এমন তার ভক্তি যে এতো বড়াই করছে। বিষ্ণু তাকে একটা বাটিতে টইটুম্বুর তেল দিয়ে বললেন—যাও নারদ, এই বাটিটা নিয়ে একবার সারা শহরটা ঘুরে এসো—কিন্তু সাবধান, তেল যেন একফোঁটাও না পড়ে। নারদ চললেন। অনেকক্ষণ পরে ফিরে এলেন আবার বাটিভর্তি তেল নিয়ে। তেল এক ফোটাও পড়েনি। বিষ্ণু জিজ্ঞেস করলেন—নারদ, আমার কথা ক’বার স্মরণ করেছো তুমি? নারদ বললেন,—প্রভু, আপনার নাম স্মরণ করবার সময় পেলাম কই। আমি তো সারাক্ষণ তেল নিয়েই ব্যস্ত। তখন বিষ্ণু নারদকে বুঝিয়ে দিলেন–সেই সামান্য চাষার ভক্তি কেন নারদের চেয়েও বড়। সেই চাষা হাজার কাজের মধ্যেও দু’বার তো অন্ততঃ হরিকে স্মরণ করে—
