—তারপর?
বার-শিমলের আকাশে তখন ট্রেনের আর্তনাদ কর্কশ হয়ে বাজছে। কোথায় বুঝি ট্রেনটা থেমে গিয়েছে মাঝপথে। স্টেশনে আসবার অনুমতি মেলেনি। বার-বার গন্তব্যস্থানের উদ্দেশ্যে করুণ আবেদন জানাচ্ছে আর্তনাদ করে। ভূতনাথ চুপ করে রইল। তারও যেন সমস্ত যুক্তি ফুরিয়ে গিয়েছে। তবু জিজ্ঞেস করলে—তারপর?
জবা সে-কথার উত্তর না দিয়ে বললে—সুপবিত্রর সঙ্গে যদি দেখা হয় আপনার, আপনি বলে দেবেন ওকেও যেন এ-রাস্তায় আর না আসে। আমার বাড়ির সামনে যেন অমন করে আর দাঁড়িয়ে। থাকে। আমি কষ্ট পাই—আমি ওকে ভুলতেই চেষ্টা করি।
–কিন্তু কেন? তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, সে-বিয়ে তোমার সিদ্ধ?
জবা বললে—সে-কথার উত্তর তো বাবাকে আমি দিয়েছি ভূতনাথবাবু।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখো তুমি।
—ভালো করে ভেবে দেখেছি ভূতনাথবাবু, দিনরাত ভেবেছি, এক-একবার মনে হয়েছে, সব বুঝি স্বপ্ন, স্বপ্নের মত সব মিথ্যে, কিন্তু যখনি মনে পড়ে বাবার কথা তখনি আর অবিশ্বাস করে উড়িয়ে দিতে পারি না।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু তুমি তো ব্রাহ্ম? তুমিও কি হিন্দু-ধর্মে বিশ্বাস করো?
–কিন্তু আমার ব্রাহ্ম হওয়াও যে পুরোপুরি সত্য নয় ভূতনাথবাবু, আমি মনে প্রাণে যে হিন্দুই, হিন্দু-ঘরে আমার বিয়ে হয়েছে, আমি যদি আগে জানতে পারতাম এ-কথা, তা হলে অন্তত সুপবিত্রকে আর আসতে দিতাম না আমার বাড়িতে।
—আর তোমার স্বামী?
জবা বললে—তার কথা আমি আর জানিনে, বড় হবার আগেই ঠাকুর্দা মারা গেলেন, ঠাকুমাও আগেই মারা গিয়েছেন, বাবা এখানে নিয়ে এলেন আমাকে, তারপর আর তার খবর রাখা প্রয়োজন মনে করেন নি বাবা।
—কিন্তু কোথায় তার দেশ? কী তার নাম, কোনো পরিচয়ই পাবার উপায় নেই আর?
—সে পরিচয় আছে, কিন্তু সে-কথা ভাবতেও ভয় করে ভূতনাথবাবু, নতুন করে আবার জীবন শুরু করতে হবে। আমার সমস্ত আদর্শের সঙ্গে সংঘাত বাধবে পদে-পদে।
-কিন্তু তবে সে-পথে কেন পা বাড়াচ্ছো?
জবা বললে—কী জানি, কেন যেন মনে হয়, সেখানেই আমার সত্যিকারের পরিচয়, সেখানেই আমার সত্যিকারের আশ্রয়, আমার সংস্কার, আমার শিক্ষা, আমার মুক্তি আমার স্বামীর কাছে, বিধাতার সেই ইচ্ছেই বোধহয় ছিল, নইলে…
ভূতনাথ তবু বললে—যাকে জানো না, যাকে চেনো না, যার অবস্থার সঙ্গে তোমার অবস্থার, তোমার শিক্ষার হয় তো কোনো সঙ্গতি নেই-তাকে গ্রহণ করে সুখী হতে পারবে তো?
—আমার মন বলছে, সঙ্গতি না হোক, সামঞ্জস্য না থাক, তবু তাতেই আমার মঙ্গল, তাতেই আমার কল্যাণ। বাবার মুখেই শুনেছি-স্বাচ্ছন্দ্যটা বড় কথা নয়, কল্যাণটাই বড়। বাবা বলতেন-তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ—এতদিন তো আরামই চেয়ে এসেছি ভুতনাথবাবু, পেলাম কই? এবার কল্যাণ চেয়ে দেখি, পাই কিনা।
—কিন্তু সত্যিই কি তুমি মনে করে জবা এ কল্যাণেরই পথ? মঙ্গলেরই পথ?
জবা বললে—এইটুকু জানি যে, শুধু আরামের মধ্যে কল্যাণ নেই। বাবা তাই তার সমস্ত আরাম ত্যাগ করে কল্যাণের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু আরো একটা দিকের কথা ভেবে দেখেছো কি?
-কোন্দিক?
–ধরো তোমার স্বামী যদি ইতিমধ্যে আর একটা বিয়ে করে থাকেন—হতেও তো পারে, তোমার ধর্মান্তর গ্রহণের খবর পেয়ে তিনি হয় তত তোমার আশা ত্যাগ করেছেন।
জবা বললে তা-ও যদি হয় তবু তাকেই আমি গ্রহণ করবে। যতদিন তিনি জীবিত থাকবেন ততদিন তাকে স্বীকার করতেই হবে—ততদিন তিনিই আমার স্বামী।
—তারপরও তুমি সুপরিত্রকে গ্রহণ করতে পারবে না?
–না, পারবো না। আমার সংস্কার আমার শিক্ষা আমাকে বলে যে, বিয়েটা ধর্ম, ধর্মেরই অঙ্গ, বিয়েটা তুচ্ছ বিলাসিতাও নয়, লোকাচারও নয়।
—কিম্বা যদি দেখে তোমার স্বামী দরিদ্র কিম্বা লম্পট।
—তবু তিনি তো আমার স্বামী।
—কিন্তু যদি তার অকালেই মৃত্যু হয়ে থাকে?
জবা খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে—হিন্দুধর্মের বিধান ছিল সে-ক্ষেত্রে বিবাহ হতে পারে, কিন্তু কুলীনের ঘরে নয়, মৌলিকের সঙ্গে। সে-মেয়েকে বলা হয়…কিন্তু আপনি এত কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? আমি তো সব অবস্থার জন্যেই তৈরি হয়ে আছি ভূতনাথবাবু?
ভূতনাথ বললে—তবু তো খোঁজ নেওয়া দরকার।
–আপনি খোঁজ করবেন?
ভূতনাথ বললে—আমি তো তোমায় বলেছিলাম জবা, তোমার যদি কোনোদিন কোনো উপকার করতে পারি, তা হলে নিজেকে কৃতার্থ মনে করবো—আজ আমার সেই সুযোগ এসেছে।
জবার চোখ দুটো সজল হয়ে এল। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল তেমনি করে। তারপর ধীরে ধীরে-বললে—আপনার ঋণ জীবনে শোধ হবে না ভূতনাথবাবু।
ভূতনাথ বললে—সে কথা থাক, আমাকে তাদের ঠিকানাটা দিতে পারে?
জবা বললে—সে অনেক দূর ভূতনাথবাবু। কলকাতার বাইরে, কোন্ এক গ্রামে।
ভূতনাথ বললে—যতদূরেই হোক, আমি নিজে গিয়ে খবর নিয়ে আসবোকিন্তু তারা কি আর কোনো দিন তোমার খবর নেননি?
জবা বললে—বাবা বলেছিলেন, পাত্র পক্ষের অমতে ঠাকুর্দা আমার বিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর বোধহয় শুনেছিলেন আমরা ব্রাহ্ম হয়ে গিয়েছি, তখন আর খবর রাখবার প্রয়োজন মনে করেননি।
ভূতনাথ বললে—তবে কেন তুমি এত বিচলিত হয়েছে, এমন তো হতে পারে তারাই তোমাকে গ্রহ করবেন না—তুমি বিধর্মী বলে।
জবা বললে—তবু তিনিই আমার স্বামী যে—স্বামী স্ত্রীকে গ্রহণ করলেও স্ত্রীর যে অন্য কোনো গতি নেই।
