তারপর একে-একে সবাই জিজ্ঞেস করে। সবাই অবাক হয়ে যায়। ছেলে যখন ব্রাহ্মজ্ঞানী, ছেলের সন্তানও ব্রাহ্ম। ছেলে যদি গো-মাংস খেয়ে থাকে, অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে থাকে, ভগবান না মানে, তার সন্তানেও সে-পাপ অর্সায়।
রামহরি বলেন—না রে, না—যত সব অর্বাচীন। বলেন—দু’মাস বয়েস পর্যন্ত শিশু নিস্পাপ-সর্বস্পর্শদোষমুক্ত। ওর এখন কোনো জাতই নেই—আমার কালীও যা ও-ও তাই—ওই বেটির মতোই শুদ্ধ, অপাপবিদ্ধ।
—কিন্তু যখন ও বড় হবে?
রামহরি ভট্টাচার্য বলেন—তার আগেই আমি ওর বিয়ে দিয়ে দেবো হিন্দুপাত্রের সঙ্গে।
দু’ মাস তখনও পূর্ণ হয়নি জবার। বোশেখ মাস। সন্ধ্যে থেকেই কাল-বোশেখীর ঝড়-ঝাপটা আরম্ভ হয়েছে। রাত হবার আগেই গৃহিণী দরজা-জানালা বন্ধ করে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়েছেন। নিজের বিছানায় দু’ মাসের নাতনীকে নিয়ে শুয়ে আছেন। মাঝ রাত্রে কর্তার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। গৃহিণী দেখলেন—ঘরে প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কর্তা। বাইরে যেন চণ্ডীমণ্ডপের কাছে গলার আওয়াজ পেলেন অনেক লোকের। বললেন—কী হলো? কখন এলে তুমি? ও শব্দ কীসের?
রামহরি বললেন—লোকজন এসে গিয়েছে—জবাকে দাও।
–কেন? জবাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
রামহরির এক হাতে আলো। আর একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন—দেরি হয়ে যাচ্ছে, লগ্ন বয়ে যাবে।
গৃহিণী কাঁদতে লাগলেন—কীসের লগ্ন গো? লগ্ন কীসের?
রামহরি ভট্টাচার্যের তখন সময় নেই। গৃহিণীর কোল থেকে ছিনিয়ে নিলেন জবাকে। বললেন—জবার বিয়ে।
–হ্যাঁ গো জবার বিয়ে, তা ওর বাপকে একবার খবর দিলে —তার মেয়ে আর তাকেই…
রামহরি ভট্টাচার্য চলেই যাচ্ছিলেন। যেতে-যেতে বললেনআমার গুপী মরে গিয়েছে মনে করে।
একটা অজ্ঞাত আতঙ্কে আঁতকে উঠলেন গৃহিণী। বললেনকার সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছো?
–সে তোমাকে ভাবতে হবে না, জাত, কুল, বংশ দেখে তবে কাজ করছি।
…পাত্রকে দেখেছো তো ভালো করে? আমার যে ভয় করছে গো?
বাইরে যেন তখন হঠাৎ ঝড়ের গর্জন আবার দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু হলো। রামহরি ভট্টাচার্য সেই ঝড় উপেক্ষা করেই বেরিয়ে গেলেন। বাইরে শখের শব্দ হলো। ঘণ্টা বাজলো। মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ এল। মহা আশঙ্কার মধ্যে ব্রাহ্মণী রাত কাটালেন। শেষ রাত্রের দিকে ফিরে এলেন রামহরি ভট্টাচার্য। জবাকে কোলে ফিরিয়ে দিলেন। তখন তার সিঁথিতে সিঁদুর। কিন্তু আশ্চর্য, মেয়ে এতটুকু কঁদেনি। মেয়ে চুপ করে সমস্ত অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে ছিল রামহরির কোলে।
তারপর দিন কোথায় গেল পাত্র! আর কোনো সংবাদ নেই কারো।
রামহরি বলতেন—আমি আমার কর্তব্য করেছি—আমার নাতনীকে তো আমি বেহ্মর হাতে তুলে দিতে পারিনে। গল্প শুনতে শুনতে ভূতনাথ অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। বললে–তারপর?
জবা বললে—তারপর আর নেই। বাবা বললেন—এ ঘটনার কথা ঠাকুমা বাবাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন কিন্তু বাবার তখন আর কিছু করবার নেই। বাবা বললেন—সে-বিবাহ অসিদ্ধ বলেই আমি মনে করি, তোমার অনুমতি গ্রহণ না করে যে-বিবাহ, তা কখনও সিদ্ধ হতে পারে না।
ভূতনাথ বললে—তারপর?
বার-শিমলের রাস্তায় তখন আরো অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। শেয়ালদ’ স্টেশনের দিকে একটা মালগাড়ি বুঝি ছুটে চলেছে উধ্ব শ্বাসে। তারস্বরে হুইশল দিচ্ছে বার-বার। সমস্ত পটভূমিকার শুচিতা বুঝি খান-খান করে টুকরো-টুকরো করে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে চায়। ভূতনাথের মনে হলো—লক্ষ যোজন দূরের একটি ঘুমহারা তীর যেন রুদ্ধনিঃশ্বাসে ছুটে আসছে বর্তমানকে লক্ষ্য করে। জবার সমস্ত শান্তি নষ্ট করবে সে। কোন অলক্ষ্য তীরন্দাজের অব্যর্থ লক্ষ্য বুঝি আজ আর ব্যর্থ হবে না। ভূতনাথের সমস্ত শক্তিকে অগ্রাহ্য করে সে সর্বনাশের শেষ পর্যায়ে নামিয়ে দেবে জবাকে।
জবা বললে-বাবা আরো বললেন—আজ যাবার দিন আর গোপন করে রাখতে পারলাম না মা, আমার সত্য-বিশ্বাস-বোধে অনেকদিন এ-কথা বেধেছে, তাই কাউকেই বলিনি—কারোর কাছেই প্রকাশ করিনি—তোমার মাকেও না, তিনি তত বললেও বুঝতে পারতেন না—কিন্তু তোমাকে শেষ পর্যন্ত না বলে পারলাম, তোমার বয়েস হয়েছে, তুমি নিজের বুদ্ধি দিয়েই বুঝবে মা যে, এ মিথ্যা—এ অসিদ্ধ।
জবা আবার বলতে লাগলো-শুনে আমি চুপ করে রইলাম।
বাবা বললেন–তুমি সুপবিত্রকেই গ্রহণ কোরো মা–আমি আশীর্বাদ করছি।
আমি তবু কোনো কথা বললাম না। বাবার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে এল। তিনি অনেকক্ষণ কথা বলে ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে রইলেন। আমি তার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। তিনি স্তিমিত হয়ে এলেন খানিকক্ষণের জন্যে। রাত শেষ হয়ে আসছিল। তারপর একবার আবার চোখ তুললেন। বললেন–পবিত্ৰকে তুমি গ্রহণ করবে তো মা?
বললাম-না।
বাবার চোখ দিয়ে তখন জল পড়ছে। আমার উত্তর শুনে হঠাৎ কিছু মুখ দিয়ে বেরোলো না তার। তারপর বললেন—কিন্তু আমাকে তো তুমি ক্ষমা করবে মা?
আমি আর থাকতে পারলাম না। তার বুকের ওপর মুখ রেখে চোখ মুছে নিলাম অজ্ঞাতে। আমার সেই তখনকার অবস্থার কথা আমি আজ আর বলতে পারবো না ভূতনাথবাবু, মনে হয়েছিল মাথার ওপর সারা আকাশটা ভেঙে পড়লেও সে-যন্ত্রণা বুঝি এমন নয়। কিন্তু তখন আমি সে-কথা কাকে বলবো, কে আমাকে বুঝবে? মনে হলো—সুপবিত্রকে আর আমার বাড়িডে আসতে দেওয়া উচিত নয়, যাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছি, তাকেই আজ দূর করে দিতে হবে—এ যে কী কষ্টের, কেমন করে বোঝাবে আপনাকে। বাবার বুকের মধ্যে মুখ গুজে রইলাম। বাবা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন। তিনিও আর কিছু বললেন না আমাকে। খানিক পরে তার বুকের মধ্যে যেন এক অস্বাভাবিক আলোড়ন শুরু হলো। বাবা ধীরে-ধীরে তখন বলছেন-অসতো মা সদগময়ঃ, তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ, মৃত্যোর্মামৃতম গময়ঃ—ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ–হরি ওঁ…
