—তোমার স্বামী আছে?
জবা বললে—আছে।
—কিন্তু এ কেমন করে ঘটলে জবা? তাহলে সুপবিত্রকেই বা এতদিন তিনি প্রশ্রয় দিলেন কেন?
জবা মুখ তুললো এবার। বললে-বাবা তো একে সংস্কার বলতেন ভূতনাথবাবু, তাঁর তো এতে বিশ্বাস ছিল না। এতদিন ঠাকুর্দার কৃতকর্মের জন্যে তিনি অনুতাপ করেছেন, শুধু প্রকাশ করেন নি কিছু।
ভূতনাথ বললে—তিনি কি জানতেন সব?
জবা বললো, জানতেন তিনি, কিন্তু স্বীকার করেন নি।
—স্বীকার করেন নি তিনি? তা হলে কেন তিনি প্রকাশ করে। গেলেন শেষকালে?
জবা বললে—স্বীকার তিনি করতেন না, কিন্তু মৃত্যুর আগের দিন তিনি যখন প্রকাশ করলেন আমাকে সব ঘটনা, তখন বললেন–তুমি ধর্মান্তর গ্রহণ করেছে মা, তোমার সে-বিবাহ মিথ্যে—আমি তোমাকে সম্মতি দিচ্ছি-তোমার কোনো সঙ্কোচ করার প্রয়োজন নেই। তারপর আমাকে তিনি চিঠি দেখালেন।
—চিঠি?
জবা বললো, ঠাকুমা যে-চিঠি লিখেছিলেন বাবাকে।
জবা আবার বললে-বাবা বললেন—তোমাকে এতদিন বলিনি মা, সংসারে কাউকেই আমি বলি নি কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করো এখন কেন বলছি, তার উত্তরে বলবো-জীবনে কোনো দিন জ্ঞানত কোনো মিথ্যাচার করিনি আমি, এতদিন অনেক দ্বিধা ছিল মনে, অনেক সঙ্কোচ ছিল, ভেবেছিলাম, তুমি মনে খুব আঘাত পাবে, কিন্তু তবু তা জেনেও আজ প্রকাশ না করে পারছি না মা, আমার ঈশ্বর বলেছেন—এ মিথ্যাচার, এ অন্যায়, না বললে মুক্তি পাবো না আমি…আর তা ছাড়া তোমার সে-বিয়েতে আমার সমর্থন ছিল না, বাল্যবিবাহে আমার সমর্থন নেই তা তো তুমি জানো, কিন্তু এ শৈশব-বিবাহ—তোমার জ্ঞানোদয় হবার আগেই ঘটেছে।
ভূতনাথের মনে পড়লে সে-রাত্রের কথা। বোধহয় মাঝরাত হবে। হঠাৎ সুবিনয়বাবু যেন একবার চোখ খুললেন। তারপর ডাকলেন—মা-
ভূতনাথ সুপবিত্রকে নিয়ে ওদিকে পাশের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করেছে। আর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে বহুকালের সঞ্চিত গোপনীয়তা জবার কাছে প্রকাশ করে দিয়েছেন সুবিনয়বাবু। জব একে-একে সমস্ত ঘটনা বলে গেল সেদিনকার!
সুবিনয়বাবু বলেছিলেন—মা, আমার জন্ম ঝড়ের লগ্নে, সে এক চরম দুর্যোগ সেদিন সারা জীবনটা সেই ঝড়ের মতোই কেটে গেল, কিন্তু ভেবেছিলাম তোমাকে আমি ঝড়-ঝাপটা থেকে দূরেই রাখবো–কিন্তু জন্মের একমাস পরেই তোমাকে হারিয়েছিলাম। ফিরে যখন পেলাম তার আগেই চরম দুর্দৈব ঘটে গিয়েছে তোমার জীবনে।
জবার কাছে শোনা সেদিনকার ঘটনাগুলো আজো সমস্ত মনে পড়ে। সে কত বছর আগের ঘটনা। রামহরি ভট্টাচার্য সেদিন সবে জবাকে নিয়ে গিয়ে উঠেছেন বলরামপুরে।
গৃহিণী বললেন—একে যে মা’র কোল ছাড়া করে নিয়ে এলে— মানুষ করবে কী করে?
রামহরি বললেন—তুমি মানুষ করবে! একটা ছেলেকে মানুষ করেছিলে যেমন করে আবার তেমনি করে করবে।
–কিন্তু এ যে এখনও মায়ের দুধ ছাড়েনি।
—তা দুধের বন্দোবস্ত আমি করছি—বলে চাদরটা নিয়ে তখনই বেড়িয়ে পড়লেন। সারা গায়েই প্রভাব-প্রতিপত্তি তার। রামহরি পাঁজি দেখে বলে দিলে তবে জমিদারের বাড়িতে শুভ-কাজ শুরু হয়। রামহরির কথায় সন্ধিপূজোর ঢাক বেজে ওঠে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়, কনে-বউ শ্বশুরবাড়ি যাত্রা করে। একটা কথার শুধু তোয়াক্কা। রামহরি ভটচার্যিকে গাছের প্রথম ফলটা দিয়ে তকে। যজমানরা খায়। গাছের বেগুন, পুকুরের মাছ, গরুর দুধ এ-সব ভটচার্যি মশাই-এর আগে খাওয়া পাপ যেন।
সূর্যি পায়রাপোড়া সকাল থেকে বসে ছিল দাওয়ায়। ঠাকুর। গিয়েছেন বাগানে। তা বাগানে যাওয়া মানে, বাগান থেকে দশটা বাড়ি ঘুরে দশটা ভালো-মন্দ জিনিষ নিয়ে ফিরতে-ফিরতে বেলা হয়ে যায়। তারপর এসে তামাক খেয়ে দাওয়ায় বসে-বসে পুঁথি– গুলো খুলে এক-এক করে বিছিয়ে রদ্দরে শুকোতে দেওয়া। ধুনোগঙ্গাজল দিয়ে পূজোর ঘর পবিত্র করা। কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই বললেন—কে রে ওখানে বসে? সূর্যি না?
সূর্যি পায়রাপোড়া সেখান থেকেই মাটিতে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে। বলে এসেছিলাম ঠাকুর মশাই-এর কাছে—ছেলেটার জন্যে। পাঠশালায় ভর্তি করাবো মনে করছি—একটা দিন দেখে দ্যান যদি।
–তোরও গলায় দড়ি জোটে না সূর্যি—গয়লা মানুষ, দুধ বেচতে শেখাবি ছেলেকে, তা নয় লেখাপড়া। লেখাপড়া শিখিয়ে কি বেহ্ম করতে চাস ছেলেকে?
—আমরা মুখ্য মানুষ বলে কি ছেলেটাকেও মুগ্ধ করবে। ঠাকুরমশাই, আজকাল সবাই শিখছে, যে?
তবে তাই কর, আমার গুপী যেমন বেহ্ম হয়ে গো-মাংস খেতে শিখেছে—তোর ছেলেও তাই করুক, তখন তোর আমাকে দুষিস নে—কিন্তু দক্ষিণে কী দিবি?
—আজ্ঞে, আপনার আশীর্বাদেই সব হয়েছে, আপনি নেবেন সে আর বড় কথা কি?
পাঁজি-পুঁথি খুলে বসলেন রামহরি ভট্টাচার্য। বললেন—তোর একটা বিয়েন-গাই দিয়ে যাস দিকিনি—দুধ খেতে হবে।
—তা সের চারেক দুধই না হয় দিয়ে যাবো ঠাকুরের প্রেণামী বলে।
-না, না, ওতে হবে না, আমার কাজ ফুরিয়ে গেলে তোর গরু তোকেই ফিরিয়ে দেবো। নাতনী আমার দুধ খাবে বলে তাই নেওয়া।
-নাতনী? সুর্যি পায়রাপোড়াও অবাক হয়ে যায়।
—হ্যাঁ রে, নাতনী, আমার গুপীর মেয়ে।
পরদিনই দেখা হয়ে গেল নারাণ ময়রার সঙ্গে। প্রাতঃপ্রণাম সেরে নারাণ ময়রা বলে—আপনার নাতনীকে এনেছেন নাকি বাড়িতে—শুনলাম?
-হ্যাঁ, তা এনেছি, ছেলে না হয় বেহ্ম হয়েছে, নাতনী কী দোষ করলো। বয়েস তত এক মাস—আমারই তো রক্ত ওর নাড়িতে, বংশ তেলোপ হয়নি রে, খাঁটি ব্ৰহ্মতেজ এখনও আছে রক্তের মধ্যে–বলে পৈতে ধরে কটমট করে তাকান নারাণ ময়রার দিকে।
