জবা মুখ তুলে চাইলে। শান্ত দৃষ্টি। কোনো অভিযোগ, কোনো অনুযোগ, এমন কি কোনো প্রশ্নও নেই সে-দৃষ্টিতে। যেন চোখ চাওয়া ভদ্রতা, তাই চোখ মেলেছে আর কিছু নয়।
ভূতনাথ বললে—আজকে তোমাকে খাইয়ে তবে আমি যাবো, যত রাত্তিরই হোক। আমার সামনে তুমি খেতে বসবে আজ।
জবা তবু কোনো কথা বলে না।
ভূতনাথ বললে—তুমি কি ভেবেছে, এমন করে থাকলে বাবার আত্মা শান্তি পাবে তোমরা পরজন্ম মানো কিনা জানি না, কিন্তু আমি ঠিক বলতে পারি, যিনি সর্বজ্ঞ তার এতে কষ্ট হয়। স্বর্গে গিয়েও তিনি কষ্ট পাচ্ছেন তোমার জন্যে।
জবা খানিক পরে বললে—আমি আর ভাবতে পারিনে ভূতনাথবাবু—বলে আস্তে-আস্তে উঠে সোজা গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো।
রোজ এমনিই হয়। একটা কথা উঠে যখন চরম জবাবদিহির সময় আসে, তখন জবা নিজের ঘরে গিয়ে খিল বন্ধ করে দেয়।
সেদিন কিন্তু ব্যতিক্রম হলো। রোজকার মতো ভূতনাথ অন্ধকার গলিটাতে ঢুকে জবাদের বাড়ি ঢুকতে যাবে, হঠাৎ মনে হলো পাশ দিয়ে যেন কে টুপ করে চলে গেল। চেনা-চেনা মুখ। কিন্তু গ্যাসের আলোটার তলায় আসতেই, এক ঝলক আলো মুখের ওপর পড়েছে। এবার স্পষ্ট দেখা গেল-সুপবিত্র! সুপবিত্র হনহন করে চলে যাচ্ছে। ভূতনাথও অবাক হয়েছে খুব। একবার চিৎকার করে সুপবিত্রকে ডাকতে যাচ্ছিলো। কিন্তু থমকে দাঁড়ালো তখনই। সুপবিত্র কি জবার বাড়ি থেকেই বেরুলো! কিন্তু জবার বাড়িতেই বা এমন সময়ে কেন এসেছিল!
ঠিক একই জায়গায় জবা চুপ করে বসে ছিল সেদিনও।
ভূতনাথ গিয়েই জিজ্ঞেস করলে—সুপবিত্র এসেছিল নাকি এখানে?
সুপবিত্রর নাম শুনে জবা যেন একটু বিচলিত হলো।
ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে—সুপবিত্রকে দেখলাম, এসেছিল বুঝি তোমার কাছে?
করে বললে-না। তবে এই গলিতেই যেন দেখলাম, ভাবলাম তোমার কাছে এসেছিল বুঝি!
জবা তেমনি মুখ নিচু করে বললেও তো রোজই আসে।
রোজই আসে? তোমার কাছে?
—আমার কাছে নয়, আমার কাছে ও আসবে না কিন্তু এ-রাস্তায় সুপবিত্র আসে।
-এ-রাস্তায় কী করতে আসে?
জবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে—আমি জানতুম ও থাকতে পারবে না, কিন্তু ভেতরে তো আসতে পারে না, তাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে, রাস্তা থেকে জানালার দিকে চেয়ে দেখে।
ভূতনাথ বললে–তুমি দেখেছো?
জবা বললে—দু’তিন দিন দেখেছিলুম, কিন্তু এখন আর দেখি, ও জানালাটা তাই আর খুলি না, বন্ধ করে রেখে দিয়েছি।
ভূতনাথ দেখলে রাস্তার ধারের জানালাটা বন্ধই রয়েছে। বললেবার-বার তোমায় জিজ্ঞেস করেও অবশ্য উত্তর পাইনি, তবু জিজ্ঞেস করছি, এ দুর্ভোগ কেন তোমার, বলতে পারে?
জবা চুপ করে রইল।
ভূতনাথ বললে-দোহাই তোমার জবা, আজো যেন উত্তর এডাবার জন্যে ঘরে গিয়ে দরজায় খিল দিও না। আমি তোমার ভালোর জন্যেই বলছি।
জবা মুখ তুললো এতক্ষণে। বললে—আমার ভালোর চেষ্টা করার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ ভূতনাথবাবু—কিন্তু কষ্ট কি আমারই হয় না-সুপবিত্রকে কষ্ট দিয়ে আমিই কি সুখে আছি বলতে চান? বলতে বলতে জবার চোখ সজল হয়ে এল।
ভূতনাথ চুপ করে রইল।
জবা খানিক পরে বললে—আপনি যদি আমার ভালো চান, তো একটা উপকার করবেন?
–বলো।
—আপনি ওর বাড়িতে গিয়ে ওকে বলে আসবেন ও যেন এমন করে আমার বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা না করে—তাতে আমি কষ্ট পাই।
ভূতনাথ বললে—তা যেন বললুম-কিন্তু তোমার এ অকারণ জেদ-এর পক্ষে যদি ও কোনো যুক্তি চায় তখন কী জবাব দেবো?
জবা বললে—সুপবিত্র তা জানে, ওকে আমি বলেছি সব কথা।
ভূতনাথ বললে–আমার কি তা জানতে নেই?
জবা করুণভাবে আর একবার ভূতনাথের দিকে চেয়ে চোখ নামালে। তারপর বললে—আপনিও তো সব জানেন, সেদিন তো ধর্মদাসবাবু আপনার সামনে সবই বলে গেলেন, পতিব্রতা স্ত্রীর কর্তব্যই হচ্ছে একনিষ্ঠতা, এষাস্থ্য পরমা গতি, এষাস্থ্য পরম আনন্দ, এষাস্য পরম সম্পদ।
ভূতনাথ তবুও কিছু বুঝতে পারলে না যেন। বললে— পতিব্রতা স্ত্রীর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক জবা?
জবা চোখ নামিয়ে বললে—আমারও বিয়ে হয়ে গিয়েছে ভূতনাথবাবু!
ভূতনাথ বললে—সে কি?
জবা তেমনি মুখ নিচু করেই বললো, কিন্তু আমাকে আপনি আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।
ভূতনাথ অভিভূতের মতন আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলো। এতদিনের আয়োজন, এত প্রতীক্ষা সবই কি তবে ব্যর্থ! যদি বিয়েই হয়েছে, তবে এতদিন পরে সে-কথা কে জানাতে এল জবাকে! দু’ মাস বয়সে যে-বিয়ে তার কথা এতদিন পর্যন্ত গোপন ছিল কেন? জবার দিকে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। জবাকে যেন হঠাৎ তপস্বিনীর মতো মনে হলো। মুখ নিচু করে তেমনি নির্বিকার বসে আছে তার প্রতিদিনের নির্দিষ্ট জায়গাটিতে। ভূতনাথের আরো মনে হলো—জবার শরীর মন যেন এক আশ্চর্য অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, যে-অনুভূতির মধ্যে দিয়ে সূর্য পৃথিবীকে টানছে, যে-অনুভূতির মধ্যে দিয়ে আলোক-তরঙ্গ লোক থেকে লোকান্তরে তরঙ্গায়িত হয়ে চলেছে। শশাকের আকস্মিক আঘাত সামলে নিয়ে যেন সে শশাকের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে। ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কিন্তু কার কাছে শুনলে এ-কথা এতদিন পরে?
জবা বললে-বাবার কাছে।
ভূতনাথ আরো স্তম্ভিত হয়ে গেল। বললে—তা-ই যদি সত্যি হয় তত সুপবিত্রকে তিনি আশীর্বাদ করে গেলেন কেমন করে? তিনি কি তোমার এ-বিয়েতে অমত করেছিলেন?
-না।
ভূতনাথ তবু বুঝতে পারলে না। বললে—তাঁর কি মত ছিল তবে?
-বাবার মত ছিল ভূতনাথবাবু—কিন্তু আমার মত নেই। এক নারীর স্বামী থাকতে দ্বিতীয়বার আর বিয়ে হতে নেই।
