ম্যানেজার হঠাৎ ডাক শুনে এদিক-ওদিক চাইতে লাগলো। –কে ডাকলে আমাকে? কে গো?
ভূতনাথ বললে—আজ্ঞে আমি, বড়বাড়িতে থাকি।
যেন চিনতে পারলে ম্যানেজার। বললে—তা ভালোই হলো, দেখা হয়ে গেল, আজই তো কোর্টে দরখাস্ত করে দিলাম, জানোনা বোধ হয়। এবার কোর্টে গিয়েই বাবুরা জবাব দিক-বাড়িও ছাড়বো না, টাকাও মিটোবো না—এ তত বড় আব্দার কম নয়!
ভূতনাথ বললে–ছোটবাবু যে মরে মরো-বাড়ি ছাড়ে কেমন করে!
—তা হলে টাকা ফেলে রাখে কেন চৌধুরীবাবুরা? বলে হনহন করে চলেই যাচ্ছিলো ম্যানেজার।
ভূতনাথ বললে—শুনুন, শুনুন, শুনে যান, অত ব্যস্ত কেন?
ফিরে দাঁড়ালো ম্যানেজার।—বলুন, ঝপ করে বলুন, আমার অনেক কাজ।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলেননীবাবু কবে ফিরবে বলতে পারেন?
–সাহেবের তত ফেরবার কথা ছিল, তা-ও ছ’মাস হয়ে গেল। করে ফিরবে কে জানে—কিন্তু সাহেবের খোঁজ কেন শুনি?
-না, এমনি জিজ্ঞেস করছি।
—ও সাহেবকে ধরলে কিছুই হবে না বলে রাখছি তোমাকে, সাহেবের কাছে হাতে-পায়ে ধরলেও একটি পয়সা মাফ নেই। সাহেব তো সাহেব ননীসাহেব, সাহেবের এক কথা, দান খয়রাৎ করবে দরকার হলে, কিন্তু সুদ ছাড়বে না একটি আধলা, সাহেবের আশা ছেড়ে দাও ভাই-—তারা ব্ৰহ্মময়ী
ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে–সাহেবের ঠিকানাটা একবার দিতে পারেন?
—কোথাকার ঠিকানা!
—বিলেতের।
–ওরে বাবাঃ-বলে দশ হাত পেছিয়ে গেল ম্যানেজার। বললে—চাকরিটা আমার খেতে চাও তোমরা পাঁচজনে। তার চেয়ে এক কাজ করোনা, গলাটা বাড়িয়ে দিচ্ছি, একটা কোপ বসিয়ে দাও না কাটারির।
ম্যানেজার চলে গেল লম্বা-লম্বা পা ফেলে। ভূতনাথ একদৃষ্টে চেয়ে রইল সেদিকে। সারাদিন ঘুরে-ঘুরে কত দিকে তাগাদা তদ্বির করে বেড়ায়। আশ্চর্য, অথচ ননীলাল একদিন নিজেই টাকার চেষ্টায় ধারের আশায় ওমনি করে ঘুরে বেড়িয়েছে। ওমনি করে কত ফিকিরে সারা কলকাতা চষেছে। কোথাও যখন মেলেনি, ” তখন ছুটুকবাবুর কাছে এসে হাত পেতেছে। আর আজ তার “ অবস্থা দেখো! যে-লোকটা ভগবানে পর্যন্ত বিশ্বাস করতো না, ” তারই ওপর ভগবানের আশীর্বাদের বহরটা দেখো!
কোথায় বৌবাজার আর কোথায় বার-শিমলে। রোজ-রোজ এই যাওয়া-আসা আর পোষায় না। ক’দিন পরে ছুটি ফুরিয়ে গেলে তখন কি আর এই দেখাশোনা করা যাবে। শেষ যখন হয়েই গিয়েছে, তখন সেই শেষের জেরটুকু যেন আর কাটতে চায় না। কিন্তু ‘ভূতনাথের মনে হয়–নিজের মনের গোপন ইচ্ছেটা সংসারের কাছে যেন বরাবর গোপনই থাকে। সে-কথা কাউকে জানাবার নয়, বলবারও নয়। লোকে হাসবে তা শুনে!
জবা অনেক আগে একদিন বলেছিল—আচ্ছা, আপনি যে এতদূর রোজ আসেন-কীসের আশায় আসেন বলতে পারেন? একঘেয়ে লাগে না?
ভূতনাথ কিছু উত্তর দিতে পারেনি চট করে।
জবা বলেছিল—আমারই লজ্জা করে যে এক-এক সময়ে।
ভূতনাথ শুধু বলেছিল—ওটা বোধ হয় আমার স্বভাবে দাঁড়িয়ে “গিয়েছে জবা। এখন তুমি আসতে বারণ না করা পর্যন্ত আর আমার আসা বন্ধ হবে না।
তারপর জবা বলেছিল—আপনি সত্যি যেন তা বলে আসা বন্ধ করবেন না ভূতনাথবাবু!
কিন্তু তবু ভূতনাথের ভয় হয়। ভয় হয় যদি কোনো কারণে একদিন তার এখানে আসা বন্ধ হয়ে যায় অনিবার্যভাবে। উপাসনা মরে যখন উপাসনা করতে বসে জবা, তখন এক-একদিন ভূতনাথও, যোগ দেয় তার সঙ্গে। যতক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকে ভূতনাথ, চোখের সামনে কেবল ভেসে ওঠে জবার মুখটা। ভূতনাথ জানে। নিজের অধিকারবোধের সীমা সম্বন্ধে সচেতন সে। কিন্তু মনে হয়, সেখানে যেন কেউ নেই আর। ফতেপুরের বারোয়ারিতলার মঙ্গলচণ্ডী, বাগবাজারের শীতলা, সমস্ত দেবতাকে স্মরণ করে সে যেন ভুলতে চেষ্টা করে। মুছে ফেলতে চেষ্টা করে জীবন থেকে। বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায় সব স্মৃতি। ভূতনাথ বোঝে-এ তার অনধিকারচর্চা। এখানে তার সম্পর্ক শুধু কর্তব্য আর পরোপকারের। তাদের সম্বন্ধ শুধু উপকারক আর উপকৃতের। দাতা আর গ্রহীতার। মনিব আর ভৃত্যের। বহুদিন আগে যেদিন জবার বিয়ের কথা প্রথম কানে, এসেছিল, সেদিন একটা অজ্ঞাত ব্যথা-বোধ সমস্ত চেতনাকে নিঃসাড় করে দিয়েছিল মনে আছে। মনে আছে, মনের কান মলে দিয়ে। বার-বার ভূতনাথ বলেছিল—এ অপরাধ, এ অপরাধ! যখনই সজ্ঞান মনে কথাটা উদয় হতো—ধমকে দিতে নিজেকে। আর নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাড়াবাড়ি দেখে নিজেরই লজ্জা হতো। কাউকে বলবার কথা দূরে থাক, নিজেই নিজের অপরাধে মনে মনে শাস্তি গ্রহণ করেছে কতবার।
কিন্তু তবু কি ভূতনাথ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারে, এ শুধু তার স্বভাবই, আর কিছু নয়!
সেদিন বার-শিমলের বাড়িতে ঢুকতেই ঝি বললে—আমি আর এখানে কাজ করতে পারবো না দাদাবাবু।
—কেন, কী হলো আবার তোমার?
ঝি কিছু উত্তর দিলে না।
-দিদিমণি তোমায় বলেছে কিছু?
ঝি বললে-না।
-তবে?
–রোজ-রোজ এ আর ভালো লাগে না আমার, রান্না করবো। আর ফেলা যাবে, তা হলে এ কার সংসার—কার জন্যে খেটে মরি!
ভূতনাথ অবাক হলো। বললে—কেন, দিদিমণি ভাত খায় না?
–কোথায় খায়! দুটিখানি দাতে চিবিয়ে যেমন ভাত তেমনি তত ফেলে রাখে। যদি তাই হয় তো কেন আমি রান্না করি, আমি তো বিধবা মানুষ, আমার খাওয়ার জন্যে অত ঘটা করে মাছ তরকারি বেঁধে লাভ কী!
ভূতনাথ বললে—আচ্ছা, আমি দিদিমণিকে বলবো’খন, তুমি দরজা বন্ধ করে দাও।
জবা সেদিনও তেমনি সুবিনয়বাবুর ছবির নিচে চুপ করে বসেছিল।
ভূতনাথ বলেছিল—আচ্ছা জবা, এসব তোমার কী শুনছি, তুমি নাকি উপোস করে কাটাচ্ছো?
