দেউড়িতে আর কেউ ঘণ্টা বাজায় না আগেকার মতো। ঘণ্টাটা তো ঝুলছে কিন্তু বাজাবে কে! ঘড়িগুলো তো সব বদরিকাবাবু আগুনে পুড়িয়েছে কিন্তু সময় কি থেমেছে সে-জন্যে। সময় জানবার অবশ্য দরকার হয় না আর কারো। কেউ ইস্কুলেও যায় না, কেউ আপিসেও যায় না। সময় বেঁধে ঘুম থেকে উঠে রান্না চড়াবার দরকার নেই আর। দারোয়ান নেই যে ডিউটি বদল হবে ঘড়ি দেখে। ছুটুকবাবু নেই যে, পরীক্ষার পড়া করবে ঘড়ি দেখে, কিম্বা ঘড়ি দেখে রাগ-রাগিণী শুরু হবে আর গানের আসর জমবে। ঘড়ি দেখে ঘোড়ার ডলাই-মলাই আর দানা খাওয়ানোর দরকার নেই। এখন সূর্য মাথার ওপর উঠলে বুঝতে হয় বারোটা বেজেছে, সূর্য ড়ুবে গেলে বুঝতে হয় সন্ধ্যে হলো। ঘড়ি নেই কিন্তু তবু সময় কি থেমে থেকেছে? বদরিকাবাবু বড়বাড়ির সব ঘড়ি না হয় পুড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু সূর্য কি উঠেছে না?
ভূতনাথ বেশ বুঝতে পারে, বড়বাড়ির সূর্য যদিই বা ড়ুবেছে কিন্তু সূর্য উঠেছে আর এক জায়গায়, উদয় হচ্ছে আর এক পাড়ায়। সেখানে রূপচাঁদবাবুর বাড়ি উঠছে হাজারে-হাজারে। সেখানে আর এক মানুষের দল আর এক সভ্যতার পত্তন করছে। সেমানুষেরা হয় তো এত বড় নয়, এত অভিজাত নয়, তাদের বাড়িতে ঘরে-ঘরে হয় তো এত ঘোড়া, পাল্কি, মেয়েমানুষ, হাম, ল্যাণ্ডোলেট নেই, তাদের বউরা হয় তো হীরের নাকছাবি পরে না, পুতুলের বিয়েতে বারো হাজার টাকা ওড়ায় না, একটা চীনে-অর্কিড গাছের চারা তিন শ’ টাকার দরে নীলেমে কিনে বিলিয়ে দেয় না, পুরুষরা রাজাবাহাদুর খেতাব পায় না—তবু রাত্রে তারা বাড়িতে ঘুমোয়, ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে, পরের পরিশ্রমের আয়ের ওপর ভাগ বসায় না। তারা হেঁটে আপিসে যায়, বৃষ্টি হলে মাথায় ছাতা দেয়, তারা খেটে খায়। সবাই তারা ননীলালের মতো বড়লোক হয় তো নয় কিন্তু কেউ স্বল্পবিত্ত, মধ্যবিত্ত, কেউ বা উকিল, ব্যারিস্টার, আপিস-কেরানী, মুহুরী, ব্যাঙ্কার।
ভাবতে-ভাবতে ভাবনার তলায় তলিয়ে যায় ভূতনাথ। সে কোন ১৩৪৫ সালের কথা। কোন এক গির্জার ঘড়িতে প্রথম বুঝি বেজে উঠেছিল যন্ত্রযুগের আগমনী। কিন্তু কে জানতো একদিন সেই ঘড়িই মধ্যযুগের সেই মহাকালের কল্পনা-সৌধ ধূলিসাৎ করে দেবে? ঘণ্টা মিনিট আর সেকেণ্ডে মহাকালকে খণ্ড খণ্ড করে সময়ের ক্ষয়ের অক্ষয় ইতিহাস রচনা করবে? মহাকালকে টুকরোটুকরো করে কেটে অভিজাতের আভিজাত্য হরণ করবে? এই ঘড়িই বুঝি মহাকালের কল্পনা ধ্বংস করে প্রথম জানিয়ে দিলে গগনচুম্বী গির্জার গম্বুজ, মসজিদের মিনার আর মন্দিরের চূড়ো শাশ্বতও নয়, সনাতনও নয়। সে বললে—ধর্ম, দেবতা আর বামুনদের প্রভাব প্রতিপত্তি উপদেশ সমস্ত কল্পনা—সমস্ত ছলনা, সত্যি শুধু পায়ের তলার মাটি আর এই ভালোয় মন্দে মেশানো মানুষ। সবার উপরে মানুষ সত্য—একথা চণ্ডীদাসের বহু আগে বলে গিয়েছে ঘড়ি। বলে গিয়েছে মানুষই কেবল সত্যি নয়, তার চব্বিশটা ঘণ্টা সত্যি, চৌদ্দ শ’ চল্লিশ মিনিট সত্যি, ছিয়াশি হাজার চার শ’ সেকেণ্ডও সত্যি। আরো বলেছে—হিসেবের গণ্ডী দিয়ে সময়কে মেপে-মেপে চলতে হবে, আরো সব জিনিষের মতো সময়েরও মূল্য আছে, বৈদূর্যমণি, হিরণ্যমণি আর কৌস্তুভমণি চৌধুরীদের মতো সময়ের অপব্যয় করলে সে তার প্রতিশোধ নেবেই। ”
বদরিকাবাবুর কাছে শোনা কথাগুলো এই বড়বাড়ির অন্ধকার আবহাওয়ায় যেন মুখর হয়ে ওঠে আজকাল।
বদরিকাবাবু বলতো-Time is Money.
আর ননীলাল বলতো–God is Money.
সত্যিই সময় তো থেমে থাকেনি। বদরিকাবাবু ঘড়ি পুড়িয়ে দিয়ে কি তার নিজের ওপরই প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু সময় তো তার নিজের পথেই এগিয়ে গিয়েছে। কারোর মুখের দিকেই চায়নি সে। যেমন চায়নি চৌধুরীদের মুখ, তেমনি চায়নি লর্ড কার্জনের।
১৮৯৯ সালের ৬ই জানুয়ারী লর্ড কার্জন এল বড়লাট হয়ে। যে-কার্জনের পরিকল্পনায় বাঙলাদেশ দু’ভাগ হয়ে গেল, সেই কার্জনকেই আবার শেষ পর্যন্ত সময়ের ফেরে চাকরিতে ইস্তাফা দিয়ে চলে যেতে হলে নিজের দেশে। সে-তারিখটাও মনে আছে ভূতনাথের। ১২ই আগস্ট, ১৯০৫ সালে। কিন্তু সময় তা বলে চুপ করে বসে থাকেনি। গ্রামে-গ্রামে ‘অনুশীলন-সমিতি’ গড়ে উঠেছে তখন। নিবারণদের দল বিলিতি কাপড় পুড়িয়েছে, বোমা ফেলেছে, লাঠি খেলেছে। ভাবতে গিয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে গায়ে। সে দৃশ্য যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়ি। আধো-অন্ধকার ঘরের ভেতর ভালো করে সব নজরে পড়ে না। ঘরের মধ্যে এক সঙ্গে বসে আছেন তিনজন। অরবিন্দ ঘোষ, সুবোধ মল্লিক আর পি. মিত্তির। আর ঘরের চার পাশে বসে আছে আরো ক’জন। বারীন ঘোষ বসে আছে তাদের মধ্যে এক পাশে।
হঠাৎ বারীন উঠে বললে—কিংসফোর্ড সাহেবের অত্যাচারের মাত্রা দিন-দিন বেড়ে চলেছে—আপনারা বিচার করুন এর—এর বিহিত করুন।
পি. মিত্তির নড়ে উঠলেন—Yes, Kingsford must die!
অরবিন্দ ঘোষ বললেন—I concur.
রাজা সুবোধ মল্লিক বললেন—I concur.
ঘরের অন্ধকার হঠাৎ আরো যেন ঘনিষ্ঠ হয়ে এল।
এ-ঘটনার অনেক বছর পরে নিবারণের মুখেই এ সব শোনা। কিন্তু সে বোধ হয় ১৯১১ সালের পরের কথা। সেই বছরই দরবার হলো দিল্লীতে। বাংলাদেশ জোড়া লাগলে আবার। আর কলকাতা থেকে রাজধানী উঠে গেল দিল্লীতে। সেই ১২ই ডিসেম্বরের রাত্রেই রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল নিবারণের সঙ্গে। কিন্তু সে কথা এখন থাক।
৪১. ম্যানেজারের সঙ্গে আর একদিন দেখা
ম্যানেজারের সঙ্গে আর একদিন দেখা হয়ে গেল হঠাৎ। বার-শিমলেয় যাবার পথে ম্যানেজারও আসছিল ওদিক থেকে। হাতে সেই পেটফোলা ব্যাগ। রোগ-রোগা চেহারা। মুখের দু’পাশে ছুঁচলো গোফ। ভূতনাথ ডাকলে-ম্যানেজারবাবু–
