একদিন বংশীকে ভূতনাথ জিজ্ঞেস করেছিল—ও লোকটা কে বংশী, দাঁড়িয়ে থাকে আর রোজ আমার পেছন-পেছন ঘোরে?
বংশী খানিকক্ষণ দেখলে ভালো করে। তারপর বললে—কে আর, এমনি রাস্তার লোক হবে।
—রাস্তার লোক তা আমার পেছন-পেছন যায় কেন?
যেখানে গিয়েছে ভূতনাথ ক’দিন, সেখানেই সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরেছে। তারপর যখন ছুটুকবাবু, মেজবাবু সবাই বড়বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে, ফাঁকা বাড়ি খাঁ-খাঁ করছে উঠোন, গেট-এ কেউ পাহারায় নেই—তখনও মনে হয় যেন চট করে কে যেন তাকে দেখে সরে গেল সামনে থেকে। উঠোনের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিন আবার ভূতনাথ বললে-ওই যে বংশী, সেই লোকটা!
বংশী বললে—কই, কোনদিকে? বংশী হাঁ করে অন্ধকার গেট-এর দিকে চেয়ে দেখতে থাকে।
আজকাল কিন্তু সন্ধ্যে হবার সঙ্গে-সঙ্গে বংশী গেট-এ তালা বন্ধ করে দেয়। আর তো কেউ যাবার-আসবার নেই। সন্ধ্যেবেলাই বড়বাড়ি নিঝুম হয়ে যায়। আলোগুলো নিবিয়ে রাখে বংশী। মিছিমিছি আলো জ্বললেই তো পয়সা খরচ। আর ছোটবাবুও তো বাইরে যায় না। কে আর রাত ভোর করে বাড়ি ফিরবে। ভূতনাথের যখন দেরি হয় ফিরতে, তার কাছে চাবি থাকে আলাদা। একলা চাবি খুলে ঢোকে, তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে চোরকুঠুরিতে গিয়ে শোয়। চোরকুঠুরিতে যদি অসুবিধে হয়, অন্য অনেক ঘর পড়ে আছে, যেখানে খুশি গিয়ে শোও। বৈঠকখানাটা সেইদিন থেকে বন্ধই থাকে। সেই বদরিকাবাবুর আত্মহত্যা করবার পরদিন থেকে। ও-ঘরে কেউ ঢোকে না। ঢোকবার প্রয়োজনও হয় না কারো। বদরিকাবাবু হাসপাতালে যাবার পথেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছে। তবু মনে হয়, এখানের এই ঘরটার মধ্যেই যেন তার আত্মা কোথাও লুকিয়ে আছে! কোথাও কোনো অভিসন্ধি নিয়ে ঘুরে-ফিরে বেড়ায় এখানে। ভয় করে সকলের।
সেদিন কিন্তু বনমালী সরকার লেন-এর ওপর তেমনি আর একজন কে এসে দাঁড়ালো।
ভূতনাথ বলে—ওই দেখ বংশী—ওই—
–কই? কে?
-ওই, ওই যে—
কিন্তু এবার বংশী দেখতে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে তালা খুলে দেয়। বলে—এ যে ননীবাবুর ম্যানেজার আজ্ঞে।
বেশ বয়েস হয়েছে ম্যানেজারের। হাতে ক্যামবিশের পেটফোলা ব্যাগ। রোগা-রোগা চেহারা। ছু চলো একজোড়া গোঁফ মুখের দু’পাশে। অন্ধকারে যেন সেই আলোয়ান-গায়ে লোকটার মতোই দেখাচ্ছিলো। ভেতরে ঢুকে লোকটা বলে-মেজবাবু কোথায়—মেজবাবু?
বংশী বলে-মেজবাবু তো আর এ-বাড়িতে থাকে না।
–থাকে না? কোথায় থাকে তবে? দেখো দিকিনি কী গেরো!
—গরাণহাটায়।
লোকটা যেন একটু ভাবলে!
বংশী বললে—আজ রাত্তিরবেলা কেন ম্যানেজারবাবু?
-আরে বেরিয়েছি সেই সকালবেলায়, সারা কলকাতা চষছি, চষতে-চষতে এই এখন এলাম বৌবাজার, তারপর এখন আবার যাবো পটলডাঙা, সেখান থেকে হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে তবে ঘর—তা এখেনে আজকাল থাকে কে?
বংশী বললে—আর ছুটুকবাবুও চলে গেল পাথুরেঘাটায়, থাকে এক ছোটবাবু, তা ছোটবাবু তো রোগে ভুগছে—উঠতেই পারে না বিছানা ছেড়ে।
ম্যানেজার বলে—তা হলে টাকা দেবে কে? তিন মাস যে বাকি পড়লো সেটা কে দেখবে—হুজ্জতে ফেললে দেখছি গো।
তারপর পেটফোলা ব্যাগটা খুলে কী যেন খুজতে লাগলো ম্যানেজার। বললে—আলোটা জ্বালো দিকিনি, খুঁজে পাচ্ছিনে কাগজটা। আলোর তলায় এসে একখানা ভাঁজ করা কাগজ তুলে ম্যানেজার দিলে বংশীর হাতে।
—কীসের কাগজ ম্যানেজারবাবু?
—এ কাগজটা দিও দিকি তোমার ছোটবাবুকে, বাবু পড়লেই বুঝতে পারবেন, সাপও নেই, ব্যাঙও নেই, সোজা করে লেখা আছে।
বংশী বললে—কী আছে খুলেই বলুন না?
ম্যানেজার যেন বিরক্ত হলো। বললে—আরে বাবা, নোটিশ, নোটিশ! বাড়ি ছাড়ার নোটিশ! সব জিনিষ চাকর মানুষের জানা কী দরকার! যাই আবার সেই পটলডাঙায়, না মলে আর পাপ ঘুচবে না। তারা ব্ৰহ্মময়ী–
ম্যানেজার চলে গেল।
বংশী বললে—দেখুন তো শালাবাবু, কী লিখেছে?
ভূতনাথ কাগজটা নিয়ে পড়তে লাগলো। এতদ্বারা জানানো হইতেছে যে.. ইত্যাদি, ইত্যাদি। বন্ধকী সম্পত্তির বাবদ একুনে এত টাকা পাওনা হইয়াছে, গত তিন মাস যাবৎ কোনো টাকা না পাওয়াতে বাড়ি ছাড়িয়া দিবার নোটিশ দেওয়া যাইতেছে, অন্যথা.. আদালতের সাহায্যে দখলীকারদের উৎখাত করা হইবেক।…
বংশী বললে—বাড়ি ছাড়তে হবে নাকি শালাবাবু?
—সেই রকমই তো লিখেছে।
—সে কী করে হবে শালাবাবু, বাড়ি ছেড়ে অমনি গেলেই হলো?
ভূতনাথও যেন কেমন হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে। সত্যি কি শেষ পর্যন্ত তাই হবে! ভূতনাথ বললে-ম্যানেজার কি চলে গেল।
–ডাকবো শালাবাবু?
—ডাক, ডাক তো একবার।
বংশী সেইখানে দাঁড়িয়েই চিৎকার করে ডাকতে লাগলেও ম্যানেজারবাবু, ম্যানেজারবাবু–
ম্যানেজার বোধ হয় ততক্ষণে অনেক দূর চলে গিয়েছে। বংশী দৌড়ে গেল পেছন-পেছন। বনমালী সরকার লেন-এ তখন বেশ অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। দু’-একটা দোকানে শুধু আলো জ্বালিয়েছে ওদিকে। বড়বাড়িতে উঠোনটা কিন্তু সকলের চেয়ে যেন বেশি নির্জন। বিমূঢ়ের মতন এখানে দাঁড়িয়ে একটু-একটু ভয় করে ভূতনাথের। মেজবাবুর পায়রার খোপগুলো খালি পড়ে ছিল কয়েকটা। তারই মধ্যে কয়েক জোড়া গোলা পায়রা এসে বাসা বেঁধেছে। অন্ধকার রাত্রে এক-এক সময়ে তারা বক্-ব-বকম্ করে ওঠে আচমকা। ঝটাপট শব্দ হয় হঠাৎ! তারপর আবার চুপ হয়ে যায় সব। ইব্রাহিমের ঘরের ছাদের সামনে বাক্সবাতিটা ঝুলে আছে তো ঝুলেই আছে। অন্ধকারে মনে হয় বুঝি একটা বাদুড়। বাদুড়ের মতই নিঃশব্দে ঝোলে আর বাতাস পেলেই দোলে। একটা ইদুর উঠোনের এ-কোণ থেকে ও-কোণে দৌড়ে যাবার সময় পায়ে শুকনো পাতা লাগলে খড়-খড় শব্দ ওঠে। শুধু ভূতনাথ নয় যেন ইদুরটাও চমকে ওঠে নিজে। রান্নাবাড়ির পেছনে যখন বংশী বসে-বসে হাতুড়ি দিয়ে কয়লা ভাঙে, সমস্ত বড়বাড়িতে সে-শব্দের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ফাঁকা-ফাঁকা ঘরগুলো গুম-গুম করে ওঠে। ঝনঝন করে লোহার শেকল আর কড়াগুলো বেজে ওঠে। ভূতনাথের মনে হয় বদরিকবাবু যেন বলে—কেমন, বলেছিলাম কিনা, কেমন।
