নিবারণের গায়ে দেশি কাপড় জামা। বিলিতি কাপড় কেনা বয়কট করেছে অনেকে। সেদিন রাস্তা দিয়ে যেতে-যেতে ভূতনাথ গান শুনেছিল—’বলিহারি পাড়ের বাহার স্বদেশী শাড়ি। নিবারণ বললে—বরিশালে কনফারেন্স হয়েছিল—জানেন?
–শুনেছি।
—রসুল সাহেব প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, কেম্প সাহেবকে জব্দ করা হয়েছে খুব।
-কেম্প সাহেব কে?
—পুলিশের কর্তা–আর এমার্সন সাহেব ওখানকার ম্যাজিস্ট্রেট।
—বলেছিল—কেউ ‘বন্দে মাতরম্’ বলতে পারবে না। সুরেন বাড়জ্জে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন—’বন্দে মাতরম্’–সে সব অনেক কাণ্ড, খবরের কাগজে সব তত বেরোয়নি, আমি নিজের চোখে যে-সব দেখে এসেছিলাম—আর তাই নিয়ে গান বেঁধেছেন কাব্যবিশারদ, শোনেননি?
—কোন্ গানটা?
নিবারণ বললে—গান তো অনেক বেঁধেছেন—কিন্তু এই গানটাই সব চেয়ে ভালো—
আজ বরিশাল পুণ্যে বিশাল হলো লাঠির ঘায়
ওই যে মায়ের জয় গেয়ে যায়।
রক্ত বইছে শতধার
নাইকো শক্তি চলিবার
এরা, মার খেয়ে কেউ মা ভোলে না,
সহে অত্যাচার!
এত পড়ছে লাঠি ঝরছে রুধির
তবু হাত তোলে না কারু গায়।
সেদিন বেশি সময় ছিল না। নিবারণও বুঝি কাজে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু বড়বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে নিবারণের কথাটাও মনে পড়লো ভূতনাথের। সামান্য পুজি, সামান্য কামনা, কোনোদিন বড় কিছুর স্বপ্ন দেখেনি সে। কেমন যেন ভয় করে। মৃত্যুর ভয় নয়। কিন্তু সে কি পারবে,? ব্রজরাখাল তো তাকে বলেনি ও-পথে যেতে। তার নিজেরও তো অন্য পথ! তবে কোনটা সঠিক পথ, কে বলে দেবে।
একবার নিবারণকে ওরই ফাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল ভূতনাথ— ব্ৰজরাখালবাবুর খবর কিছু জানো নিবারণ?
-না।
—কিন্তু আমার এক-একবার মনে হয় তোমাদের দলে ঢুকি।
নিবারণ বললে একদিন তো বলেছিলাম আপনাকে আসতে —সেদিন এলেন না।
—আজ কিন্তু আমি বদলে গিয়েছি—বিবেকানন্দের পথ আমার বড় শক্ত লাগে, কিন্তু তোমাদের কাজ আমি পারবো।
নিবারণ বললে–স্বামী বিবেকানন্দ তো উল্টো কিছু বলেননি— আপনি অরবিন্দ ঘোষের লেখা পড়ছেন?
ভূতনাথ বললে—ওই ‘বন্দে মাতরম্’ কাগজে যা লেখেন পড়েছি—কিন্তু..
–পড়ে দেখবেন, অরবিন্দ ঘোষ যা বলেন স্বামী বিবেকানন্দ সেই কথাই বলেছিলেন চার-পাঁচ বছর আগে–পড়ে দেখবেন আপনি, আমি আপনাকে বই দেবো।
কিন্তু ভূতনাথ রূপচাঁদবাবুর লাইব্রেরীতে খোঁজ করে সে-বই পড়েছিল। তখন খুব পড়ার নেশা ছিল ভূতনাথের। বড়বাড়ির লাইব্রেরী-ঘরে কতদিন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বই মুখে দিয়েই কেটে গিয়েছে তার। রূপচাঁদবাবুর লাইব্রেরীতেও কজ দামী-দামী বই ছিল। অরবিন্দ ঘোষ লিখেছিলেন—
Vivekananda was a very lion among men. We perceive his influence still working gigantically. We know not well how, we know not where, in something not yet formed, something leonine, grand intuitive ‘upheaving that has entered the soul of India and we say-Behold! Vivekananda still lives, in the soul of the mother and in the souls of the children.
ভূতনাথ আর একটা প্রশ্ন করেছিল নিবারণকে।—আচ্ছা, বঙ্গভঙ্গ যে হলো—তা কি আর রদ হবে ভাবছো?
নিবারণ পায়ের জুতোটা মাটিতে ঠুকে বলেছিল—রদ করতেই হবে, স্বামিজী বলেছেন—সাধনা করলে সিদ্ধি লাভ অনিবার্য। আমাদের এও তো সাধনা-কদমদাকে শিবনাথকে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছে—কিন্তু আমরা তো দমিনি—আমাদের ‘যুবকসঙ্ঘের এখন কত মেম্বার জানেন–পাঁচ শ একত্রিশ জন-অথচ প্রথমে তো মোটে তিন-চার জনে মিলে আরম্ভ করেছিলাম।
ভূতনাথের মনে পড়লো—সেই বড়বাজারে চাকরির চেষ্টায় যখন ঘুরতে রোজ, সেই সময়েই প্রথম শুনেছিল। সেই দোকানপাট বন্ধ হওয়া, অরন্ধন, রাখী বেঁধে দেওয়া। অথচ মেজবাবু কিছুই মানেনি। গেট বন্ধ করে দিয়েছিল পাছে ভলান্টিয়াররা এসে বাড়ি চড়াও করে। সেই দিনভূতনাথেরও যেন মনে হয়েছিল—এ-সব করে কী হবে! বিলিতি কাপড় পোড়ানো! দিশি জিনিষ কেনা? সব মিছে। ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে—আচ্ছা, স্বামী বিবেকানন্দকে তা হলে তোমরা মানে?
—মানি মানে, স্বামী বিবেকানন্দই তো আমাদের গুরু, আমাদের সঘে কেউ মেম্বার হলে তাকে প্রথমে স্বামী বিবেকানন্দের বই-ই তো পড়তে দিই, ওঁকে মানবে না—কী যে বলেন আপনি।
–আচ্ছ, তা হলে ব্রজরাখালও তো বিবেকানন্দর ভক্ত, সে কেন তোমাদের কাজে যোগ দিলে না?
নিবারণ হাসলো। বললে—বড় শক্ত প্রশ্ন তুললেন আপনি ভূতনাথবাবু, কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি এর আলোচনা হয়? একদিন আসবেন আমাদের ওখানে-কেমন?
কিন্তু যেদিন প্রথম খবরের কাগজে বেরুলো সেই মুরারীপুকুরের খবর। মনে আছে, ৩২ নম্বর মুরারীপুকুর রোড। কি ভয়ানক কাণ্ড!
নিবারণের সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলার পর রাস্তায় আসতেআসতে হঠাৎ মনে হলো যেন আর একজন কে তার সঙ্গে-সঙ্গে আসছে। সে-ও সাইকেল-এ চড়ে আসছে। পেছনে ফিরে একবার চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। তখনও আসছে। তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে চলে আসবার চেষ্টা করলে ভূতনাথ। অনেক ঘোরা পথ দিয়ে বাড়ি এসে পে ছিলো যখন ভূতনাথ, তখন আর তাকে দেখা যায়নি।
কিন্তু পরদিন সন্ধ্যেবেলা বড়বাড়ির সামনেই গলির ওপর যেন সেই লোকটাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেল আবার। কমলালেবু রং-এর একটা আলোয়ান গায়ে। মুখে যেন বসন্তের দাগ। সেই স্পষ্ট সেদিনকার চেহারা।
