বংশী বললেন মেজবাবু, আমি ডেকে দিচ্ছি—বসুন।
বংশী ছোটবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ডাকতে লাগলো —ছোটবাবু, ও ছোটবাবু–
ছোটবাবুর পালঙটাও হাতির দাঁতের কাজ করা। তার ওপর মিনে করিয়ে নিয়েছিল ছোটবাবু পরে। কাপড় চোপড়গুলো সামলে দিলে বংশী। ক’দিন দাড়ি কামাতে আসেনি বুঝি নাপিত। মেঝের ওপর একটা পিকদানি। মালিশের শিশি। পাথরের খল।
ছোটবাবু হঠাৎ চোখ মেললে। সামনে চোখ চেয়েই দেখলে–মেজদাদামণি! কেমন যেন ভাসা-ভাসা চাউনি ছোটবাবুর।
মেজবাবু কী বলবে বুঝতে না পেরে ছড়িটা একবার ঘুরিয়ে বললে-চললুম রে মিঠু!
এতদিন পরে নিজের ডাক নামটা শুনে ছোটবাবুর কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল সব। কিন্তু ভালো করে দৃষ্টি দিতেই দেখলে মেজদাদামণি তখন চলে গিয়েছে।
খিড়কির দরজা দিয়ে নামবে মেজগিন্নী। জিনিষপত্র সবই চলে গিয়েছে। বাঘবন্দির ছককাটা জায়গাটার ওপর দাঁড়িয়েছিল মেজগিন্নী। গিরি বললে—চলে মেজমা, বেণী ডাকছে ওদিকে—
মেজগিন্নী পায়ে-পায়ে গিয়ে দেয়ালের দরজাটা খুলে ডাকলে— ছুটি, কী করছিস?
চিন্তা দেখতে পেয়ে বললে—ছোটমা, বাইরে এসে তো একবার!
ছোটমা ঘুমোচ্ছিলো বুঝি। চোখ মুছতে-মুছতে মাথায় ঘোমটা দিয়ে এসে দাঁড়ালো।
মেজগিন্নী ছোটমা’র চিবুকে হাত দিলে—সাবধানে থাকিস ছুটি—কী আর বলবো তোকে।
—চললে মেজদি?
—কী আর করি বল, বড়দিই রইলেন না, বাড়ি যেন খাঁ-খাঁ করছে—আর থাকা যায় এখানে?
—আমি কিন্তু থাকবে মেজদি, আমি আর কোন্ চুলোয় যাবোবলে খিল-খিল করে হেসে উঠলো ছোটমা।
মেজগিন্নী বললে—তোর মেজভাসুরেরও তো অসুখের শরীর, তাই বাবা আর ছাড়লে। তারপর চিন্তার দিকে চেয়ে বললেদেখিস তোর ছোটমাকে—কী আর বলবো–চলি।
চিন্তা হঠাৎ গলায় আঁচল দিয়ে দু’হাত দূরে মাটিতে ঢিপ করে একটা প্রণাম করলে।
তারপর খিড়কির দরজা দিয়ে বেরুলো মেজগিন্নীর গাড়ি আর সদর-গেট দিয়ে বেরুলো মেজবাবুর। একে-একে বেণীও গেল। রাঙাঠাকমাও গেল। সৌদামিনীও গেল।
বংশী বললে—এবার?
ফাঁকা উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন কান্না পেতে লাগলো ভূতনাথের। ভাঙনের পালা যখন শুরু হয়েছে, তখন এর শেষ কেমন করে হবে কে বলতে পারে। একবার মনে হলো পালিয়েই যাবে সে। কাউকে বলবে না! বংশীকেও না, বৌঠানকেও না। কেউ জানবে না। কাকেও তার ঠিকানা জানাবে না। একেবারে এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাবে। শুধু জবার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলেই তার যেন সমস্ত দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ভবানীপুরেই সে একটা বাসা করবে। ওখানে গেলে আর এসব কথা মনে পড়বে না। নতুন করে শুরু করবে তার শহর-বাস। আজো মনে পড়ে—সেদিন বড়বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কেমন যেন বড় মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল—সব মিথ্যে। স্নেহ, ভালোবাসা, প্রেম, আত্মীয়তা, স্বার্থত্যাগ, সব মিথ্যে। কোনো কিছুর মূল্য নেই মানুষের সংসারে। এত বড় বাড়ির ভেতরে তেতলার এককোণে কেবল একটি প্রাণী, আর দোতলার একটি ঘরে শুধু আর একটি মুমূর্য। এখানে কেমন করে বাস করবে সে!
বংশী বললে—ছোটমা’র একটা ব্যবস্থা হলে আমিও চিন্তাকে নিয়ে দেশে চলে যাবো হুজুর।
ভূতনাথ বললে—আর ছোটবাবু—ছোটবাবুকে কে দেখবে?
—ওই মুখেই শুধু বলি শালাবাবু, সত্যি কি আর যেতে পারব শেষ পর্যন্ত!
ভূতনাথেরও যেন সেই একই সমস্যা। বদরিকাবাবু প্রথমেই সাবধান করে দিয়েছিল। তখনই কোথাও চলে গেলে ভালো হতো। কিন্তু কোথায়ই বা সে যেতো! তখন একটা মাত্র উপায় ছিল নিবারণদের আড্ডা। ওদের সঙ্গে মিশে গেলে হয় তো জীবনটা অন্য দিকে মোড় ঘুরে যেতো। যে-কলকাতার আদি ইতিহাস শুনেছে সে বদরিকাবাবুর কাছে, সে-কলকাতা আবার নতুন করে দেখতে পেতো। যে-কলকাতার দেওয়ান ছিল গোবিলরাম মিত্র সেই কলকাতা এখন ভারতবর্ষের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সে-দৃশ্য দেখেছে ভূতনাথ। একদিন কিংসফোর্ড সাহেব রাস্তা দিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে। সঙ্গে আছে দুজন বডিগার্ড।
পেছন থেকে কারা যেন বলে উঠলো-বন্দে মাতরম—
কিংসফোর্ড সাহেব থেমে দাঁড়ায়।—কৌন্ হ্যায়—কৌন্ হ্যায়—
কিন্তু যারা চেঁচিয়েছিল, তারা তখন পালিয়েছে। সাহেব রাগে বিড়বিড় করে গালাগালি দেয়—শালা নেটিভ রাসকেল—
হঠাৎ ওপাশ থেকে দুজন ছোট-ছোট ছেলে আবার চেঁচিয়ে ওঠে—বন্দে মাতরম্–
সাহেব এতক্ষণে দেখতে পেয়েছে। বলে-পাকড়ো–পাকডো রাসকেল লোগকো কিন্তু ধরতে পারা যায় না কাউকেই।
সঙ্গের একজন বডিগার্ড বলে–সাহেব ঘর চলিয়ে।
সাহেব চিৎকার করে ওঠে—চোপরাও–
এমন সময় একজন ছেলে সামনে এসে বলে–-সাহেব সেলাম।
সাহেব পকেট থেকে চকলেট বার করে বলে–গুড বয়।
চকলেটটা নিয়েই ছেলেটি কিন্তু আবার বলে ওঠে—বন্ডেমাটরম্–
সাহেব ছড়ি নিয়ে মারতে ছোটে—রাসকেল—ইল্প…ছেলেটা তখন দৌড়ে পালিয়েছে। সাহেব বলে—This horrible Bandemataram will make me mad…
নিবারণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল একদিন। বড় ব্যস্ত ভাব। বললে—ভূতনাথবাবু না?
ভূতনাথ তখন সাইকেল-এ চড়ে আপিস থেকে ফিরছিল। নেমে পড়লো। বললে-কী খবর তোমাদের নিবারণ?
নিবারণ বললে—আমাদের কাজ তো আরম্ভ হয়ে গিয়েছে, দেখেন নি?
দেখেছে বৈ-কি ভূতনাথ। খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে ভূতনাথের। বড়-বড় অক্ষরে কোনো দিন লেখা থাকে— “ঢাকার ম্যাজিস্টেট এ্যালেন সাহেবের উপর গুলী।” কখনও থাকে—“বাংলা দেশে স্বদেশী ডাকাতের উৎপাত”। আবার কখনও থাকে–“ছোটলাট সাহেবের ট্রেনে বোমা”।
