বেশি-বেশি রান্নার হাত, অল্প রান্নায় মন বসে না সেজখুড়ির। বেশি নুন উঠে আসে হাতে! বেশি মশলা, বেশি চিনি, বেশি বাটনা।
ছোটবাবুকে খাইয়ে দিতে হয়। তবু মুখের স্বাদ আছে। বলে-থুঃ-থুঃ— মুখে যেন লাগে না আর আগেকার মতো। ছোটবাবু যখন খেতে বসতে আগে, চারপাশে সার-সার বাটি পড়তে গোল হয়ে। খেতে যে খুব তা নয়। সব জিনিষ একটু করে চেখে দেখতে বটে! তারিফ করতে রান্নার। রসিক মানুষ, কদর বুঝতো! কিন্তু আজকাল কিছুই ভালো লাগে না।
সেজখুড়ি বলে—এ কী রে বংশী—নুনে পুড়ে গিয়েছে যে?
এই সব দেখে শুনে হাবুল দত্ত মেয়েকে বলে—এখানে থাকলে তোরও শরীর খারাপ হয়ে যাবে মা, পাথুরেঘাটাতেই চল সবাই মিলে।
মেয়ে বললে—আমার শাশুড়ীর কী হবে, তার যে ছুঁচিবাই।
ছুটুকবাবু সেবারও ফেল করেছে পরীক্ষায়। বার-বার পরীক্ষা দিয়ে আর ফেল করে ছুটুকবাবু যেন কেমন বিমর্ষ হয়ে গিয়েছে। আগেকার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন সবাই যেন বিচ্ছিন্ন। কোলিয়ারিতে লোকশান হওয়াতে যেন ঘা খেয়েছে আরো বেশি। তারই আগ্রহ ছিল সব চেয়ে বেশি। কাকাদের সে-ই বলে-কয়ে নামিয়েছিল। এখন যেন লজ্জা করে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতে কথা বলতে লজ্জা। কোথাও যেন আশা নেই। চারিদিকেই শুধু দুঃসংবাদ। বাইরের লোকের সঙ্গে দেখা করাও ছেড়ে দিয়েছে। পুরোনো বন্ধু-মোসায়েবরা প্রথম-প্রথম চেষ্টা করেছিল। সন্ধ্যের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে এসে দাঁড়াতে উঠোনে। বলে ‘পাঠাতে—খবর দাও তো–বিশ্বম্ভর এসেছে।
ওপর থেকে খবর পাঠাতে ছুটুকবাবু—এখন নামবো না আমি–বল গে যা ওদের।
এমনি করে চলেছিল। কিন্তু নান্নেবাঈ-এর নাচ গানের দিন যেদিন পেটে হঠাৎ একটা ব্যথা উঠলে মেজবাবুর, সেদিন রাজি। হয়ে গেল ছুটুকবাবু।
পরদিন সকাল বেলাই চার পাঁচখানা ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়ালো বড়বাড়ির উঠোনে। মাল-পত্তোর উঠলে গাড়িতে! জুটুকবাবু উঠলো। ছুটুকবাবুর বউ উঠলো। আর উঠলো বড়মা। সিন্ধুর হাত ধরে কাঁদতে-কাঁদতে বড়মা উঠলো গিয়ে গাড়িতে। কিন্তু কাঁদতে-কাঁদতেও বললে—গাড়ি যেন রাস্তার মধ্যিখান দিয়ে যায়, বলে দিস ছুটুক-নইলে অপথ-কুপথ দিয়ে যাবে ওরা, অবেলায় চান করে মরতে হবে।
বেনারসীর থানের আঁচলে চোখ মুছতে-মুছতে বিদায় নিলে এ-বাড়ির গৃহলক্ষ্মী। এ-বাড়ির বড়বউ। পাড়ার লোকজন, বউ ঝি সবাই জানালার খড়খড়ি তুলে অবাক হয়ে দেখতে লাগলো।
মেজবাবু নাচঘরে তাকিয়া হেলান দিয়ে শুয়েছিল।
বেণী গিয়ে বললে—বড়মা চলে যাচ্ছেন আজকে।
তামাক খেতে লাগলো একমনে মেজবাবু। যেন শুনতেই পায়নি কথাটা। বেণী আর একবার বলতে যাচ্ছিলো কথাটা।
মেজবাবু চিৎকার করে ধমক দিয়ে উঠলো—চোপরাও হারামজাদ–
এ-সব ঘটনাও বংশীর কাছে শোনা। এ-রকম যে হবে তা যেন ভূতনাথের জানা ছিল। কিছুই যেন অবিশ্বাস্য নয়। অপ্রত্যাশিত নয়। ভূতনাথ যেন প্রতীক্ষার আশঙ্কায় জর্জরিত হয়ে গিয়েছে। ওই উঠোনের ইটের ফাঁক দিয়ে ঘাস গজাতে শুরু করেছে। আস্তাবলবাড়ির দেয়ালে ঝুল জমেছে। মিয়াজান নেই, ইয়াসিন নেই, আব্বাসও নেই। ইব্রাহিম টিমটিম করে টিকে আছে বটে কিন্তু তাই বা আর ক’দিন!
বংশী সেদিন হঠাৎ বললে—জানেন—শালাবাবু, কাল মেজবাবুও চলে যাচ্ছে।
-কোথায়?
—গরাণহাটায়। মেজবাবুর শ্বশুরের বাড়িতে।
পরদিন ভোর বেলা থেকেই ঠেলাগাড়ি এল অনেকগুলো। বিধু সরকার নিজে তদারক করছে।
—উহুঁ, হলো না, অমন করে তুললে, কাঠের জিনিষ, দাগ লাগবে যে।
আগাগোড়া হাতির দাঁতের কাজ করা পালঙ একখানা। আর তার সঙ্গে মিলিয়ে মশারি টাঙাবার ছরি! বড় দামী জিনিষ। সাবধানে নিতে হয়। বাক্স, প্যাটরা, সিন্ধুক, আলমারি, মেজগিন্নীর পুতুলের বাক্স, পায়রার খোপ, মেজবাবুর গরু-বাছুর, বিছানা-বালিশ, ভাঁড়ারের বাসন, কেঠো, কুলল, ডালা। সবই তত ভাগ হয়ে গিয়েছিল আগে। কত যে জিনিষ। জিনিষের আর শেষ নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ঠেলাগাড়ি আসছে, মাল তুলছে আর চলে যাচ্ছে। বিধু সরকারেরও সকাল থেকে নাওয়া নেই, খাওয়া। নেই। নাগাড়ে খেটে চলেছে।
বিকেল নাগাদ ইব্রাহিম গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়ালো গাড়িবারান্দার তলায়। আজ সে আবার উর্দি পরেছে, তকমা এঁটেছে গায়ে। ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দিলে একবার।
মেজবাবু মলমলের পাঞ্জাবী চড়ালে। কানে গায়ে আতর লাগিয়ে দিলে বেণী। পামশু বেরোলো। চুনোট করা চাদর। বেরোলো। তারপর মেজবাবু বললে—ছড়িটা দে আমার।
মেজবাবু ছড়ি নিয়ে গটগট করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে যেন কী ভেবে ঘুরে দাঁড়ান। তারপর দোতলার বারান্দা দিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ান ছোটকর্তার ঘরের সামনে। কত বছর পরে। আবার এ ঘরের সামনে এসে দাঁড়ান মেজবাবু মনেই পড়ে না। আগে যখন ছোটবেলায় একসঙ্গে খেলা করেছে দুজনে তখন যেন সত্যিকারের আপনার ছিল। বড় হবার পর, বিশেষ করে বিয়ে করার পর আর কখনও কথা বলার প্রয়োজন হয়নি। সুখচর থেকে খাজনা এসেছে, জমা হয়েছে খাঞ্জাঞ্চীখানার খাতায়, জমীদারির আয় পাহাড় হয়ে জমেছে সিন্দুকের ভেতর। যে-যার নিজের-নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কারো প্রতিবন্ধক হয়নি, কারোর জন্যে কারোর আটকায়ওনি কিছু, অনায়াস গতিতে সংসার চলে এসেছিল। কিন্তু আজ মেজবাবু অনেক কথা বলবার জন্যেই প্রস্তুত ছিল বুঝি।
বংশীই প্রথমে দেখতে পেয়েছে। বললে—ছোটবাবু ঘুমোচ্ছে আজ্ঞে।
ঘুমোচ্ছ! খানিক কী ভেবে নিয়ে মেজবাবু বললে—তবে থাক।
