কেমন যেন ইচ্ছে হলো ভূতনাথের তবলা বাজাতে। কিন্তু ভয় হলে যদি কেউ আপত্তি করে। কোথায় পরের বাড়িতে থাকা। ব্ৰজরাখালের নিজের বাড়ি তো আর নয়। তবলাটায় হাত বুলিয়ে সামনের তর্জনীটা দিয়ে দুই একটা টোকা মেরে আবার রেখে দিলে। ঘাটগুলো বাধা নেই। কেমন যেন মরা আওয়াজ বেরুলো। সামনের রাস্তা দিয়ে ফেরিওয়ালার ডাক কানে আসে–বাসন চাই—পেতল কাঁসার বাসন—
কাঁসি ঘণ্টা বাজিয়ে কাঁসার বাসন বেচতে চলেছে। সামনের আস্তাবল বাড়ির কার্নিসের ওপর একটা চিল চুপ করে বসে ছিল, এবার হঠাৎ অকারণে চিঃ হিঃ ইঃ শব্দ করে তীর বেগে উড়ে পালালো। আর একজন ফেরিওয়ালা কী একটা অদ্ভুত চিৎকার করতে করতে চলেছে। প্রথমটা কিছু বোঝা যায় না। অনেকক্ষণ। শোনার পর বোঝা গেল। বলছে—কুয়োর—ঘটি তো-লা-আ–আ–
ভূতনাথের আজও মনে আছে সে কলকাতার সেই প্রথম দিনের দুপুরটা যেমন রোমাঞ্চময় লেগেছিল, জীবনে আর কোনও দিন তেমন লাগেনি। সেই তার স্বপ্নে দেখা কলকাতার সঙ্গে চোখের সামনের কলকাতাকে মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিল সে। শুধু বাড়ি—আর বাড়ি। এত বড় বড় বাড়ি। মল্লিকদের তারাপদ’র দেখা কলকাতার সঙ্গে কি তা মিলেছে? পিসীমা যদি বেঁচে থাকতো তো ভয়ে হয় তো তার ঘুমই হতো না। তার ভূতনাথ এত বড় কলকাতায় কোথায় হয় তো হারিয়ে যাবে, হয় তো গাড়ি চাপা পড়বে—সেই ভয়।
বিকেল হতে তো অনেক দেরি আছে। ভূতনাথ ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে আস্তে আস্তে রাস্তায় বেরুলো।
ব্রিজ সিং বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলো গেট-এ। কিছু বললে না।
খোয়ার রাস্তা। এবড়ো খেবড়ো। বনমালী সরকার লেন-এ তখনও পিচ বাঁধানো হয় নি। দুপুরের নির্জন রাস্তা। রাস্তা পেরিয়ে মমাড়ের মাথায় আসতেই মনে পড়লো সেই নরহরির কথা। বুড়ো অশথ গাছটার তলায় চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। কেউ নেই কোথাও। দেব-দেবীর সব সাজানো পড়ে আছে। ফুল বেলপাতা শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছে। নৈবিদ্যির চাল দু’একটা ছড়ানো এদিক ওদিক। কিন্তু নরহরি নেই। এবার হঠাৎ যেন ভক্তি ভরে ভূতনাথ —কোন্ দেবতাকে লক্ষ্য করে কে জানে-প্রণাম করলে। বেদীর কাছে গিয়ে দুই হাত জোড় করে প্রণাম করলে। ফতেপুরের বারোয়ারিতলার মণ্ডলচণ্ডীর কাছে যেমন প্রণাম করে কামনা করতে ভূতনাথ, তেমনি মনে মনে প্রার্থনা করলে—মঙ্গল করে মা, মঙ্গল করো। ভূতনাথের আর কোনও প্রার্থনা মনে এল না। কার মঙ্গল, কী মঙ্গল, সে প্রশ্ন নয়। সমস্ত মঙ্গল হোক। তার নিজের মঙ্গল, ব্রজরাখালের মঙ্গল—তারপদ, ভূষণ কাকা—ননী, রাধার আত্মার মঙ্গল। বিশ্ব সংসারে সকলের মঙ্গল। ওই বংশী, ওর বোন চিন্তা, ওর ছোটমা, ছোটবাবু, মধুসূদন সকলের মঙ্গল।
বড় রাস্তার ওপর যেতে ভয় করলো ভূতনাথের। টগবগ করে সেই কালকের মতো ট্রাম গাড়ি চলেছে। ঘোড়ার গাড়িওয়ালা ঘোড়াকে ছিপটি মারতে মারতে চলেছে হু হু করে। মুখে এক অদ্ভুত শব্দ করছে—উ-উ-উ-উ আবার কেউ বলছেটি-টি-টি-টি–
একটু ও-পাশে একটা বাড়িতে ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজলো। ছেলেদের স্কুল। ভূতনাথ পড়লে। বেঙ্গল সেমিনারি। স্কুলের সামনে গোটাকতক কাবুলিওয়ালা অদ্ভুত ভেলভেটের কুর্তা আর ঢিলে-ঢালা সাদা পাঞ্জাবী পরে বসে আছে। বসে বসে ফল বেচছে। একটা কাপড়ের ওপর আঙুর—বেদানাবাদাম—ছড়ানো।
গঞ্জের স্কুলের কথা মনে পড়লো। সে ছিল প্রকাণ্ড খড়ের আটচালা ঘর। এমন দোতলা পাকা দালান নয়। সামনের দিকে এগিয়ে গেল ভূতনাথ। তাদের ফাস্ট ক্লাশে সংস্কৃত বই ছিল হিতোপদেশ। পড়াতেন শরৎ পণ্ডিত। লম্বা করে নস্যি নিতেন। সর্বদাই বোয়াল মাছের মতো লাল-লাল গোল চোখ। টিকিতে ফুল বাঁধা থাকতো তার। ভূতনাথ ভারি ভয় করতে তাকে। ধাতুরূপ মুখস্ত বলতে না পারলে মাথায় গাট্টা মারতে মারতে ঢিপ করে কিল বসিয়ে দিতেন পিঠে! রাগ হলে চিৎকার করে বলতেন—এই গর্ধভ—
শরৎ পণ্ডিতের অস্ত্র ছিল শুধু হাতের গাঁট্টা।
অঙ্কের মাস্টার হরনাথবাবুর অস্ত্র ছিল খাকের কলম। দুই আঙুলের মধ্যে খাকের কলমটি দিয়ে জোরে এমন টিপে ধরতেন যে মনে হতো বুঝি বিছে কামড়িয়েছে।
আর হেডমাস্টার অবনীবাবুর বেত। দারোয়ান সত্যনারায়ণ ছিল বেতের ভাড়ারি। বড়, মাঝারি, ছোট, নানা মাপের বেত সাজানো থাকতো লম্বা লম্বা বাঁশের নলের মধ্যে। চিৎকার করে অবনীবাবু ডাকতেন—আমার কেন্–
কেন মানে বেত।
অবনীবাবু বাঙলা ভাষায় বেত বলতেন না। শাস্তির গুরুত্ব বোঝাবার জন্যে বোধ হয় ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ যেন বেতের আঘাত কম, আর কেন-এর আঘাত প্রচণ্ড। সত্যনারায়ণ সব বেত গুলো এনে হাজির করতে হেডমাস্টারের সামনে।
অপরাধীর অপরাধের তারতম্য হিসেবে বেতের আকারেরও তারতম্য হতো। অর্থাৎ পরীক্ষার খাতায় বই থেকে নকল করলে বড় বেত। পেছনের বেঞ্চে বসে ব্যাঙের ডাকের নকল করলে মাঝারি বেত। আর সত্যনারায়ণের কাছ থেকে ধারে জিভে-গজা খেয়ে ধার শোধ না করলে-ছোট বেত।
পঞ্চাননের ভাগ্যে তিন রকম বেতই জুটতত।
সেই পঞ্চানন! ভূতনাথের এতদিন পরে আবার পঞ্চাননকে মনে পড়লো। একদিন হঠাৎ পুলিশে ধরে নিয়ে গেল সেই পঞ্চাননকে। ম্যাজিস্ট্রেটের বাগান থেকে ফুল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। বিচারে জেল হয়ে গেল পঞ্চাননের তিন মাস। তারপর জেল থেকে বেরিয়ে পঞ্চানন আর গ্রামে আসেনি। কোথায় যে উধাও হয়ে গেল কেউ জানতে পারলে না।
স্কুলের সামনে যেতেই কেমন একটা হৈ-চৈ গণ্ডগোল শোনা গেল। ওদিক থেকে ছেলেরা চিৎকার করছে—আর এদিক থেকে কাবুলিওয়ালারও চিৎকার করে। কী বিকট ভাষা এদের। গোটাকতক শব্দ কেবল—কিছু মানে বোঝা যায় না। ওদিক থেকে ঢিল ছুড়তে লাগলো ছেলেরা—আর এরা কিছু না পেয়ে বড় বড় বেদানা ছুড়তে লাগলো ছেলেদের লক্ষ্য করে।
