গিরি মেজমা’র জন্যে পান সাজতে এসেছিল। বলে—যাস, যাস —ভয় দেখাচ্ছিস কাকে শুনি—ওই তো ওদের বংশী একবচ্ছর মাইনে পায়নি—কাজ করছে না? কাজ করতে ভয় করি নাকি আমি? যা না তুই চলে, তা বলে গেরস্তবাড়ির কাজ বন্ধ থাকবে ভেবেছিস?
তা কাজ কি আর বন্ধ থাকে? কোথা থেকে সব জিনিষপত্তার আসে কে জানে! মেজবাবুর জন্যে সময় মতো তামাকও আসে। মদও আসে। আর আসে হাসিনী, বড়মাঠাকরুণ, মেজমাঠাকরুণ। নাচঘরে বসে সবাই আজকাল। মাঝে-মাঝে ঘুঙুরের শব্দও শোনা যায় ভেতর থেকে। গানের শব্দ ভেসে আসে। ঘণ্টায়ঘণ্টায় তামাক দিয়ে আসে বেণী। কোনো-কোনো দিন রাত বারোটা বাজে। কোনোও দিন বা একটা।
আবার আর একদিন মুন্নালাল এল। পায়ে নাগরা, মাথায় মুরেঠা। বললে—কোথায়, সরকার সাহেব কোথায়?
বিধু সরকারের তালাচাবি লাগানো খাজাঞ্চীখানা। মুন্নালালও যেন অবাক হয়ে গিয়েছে সব দেখে-শুনে। এই উঠোনেই কতবার এসে দাঁড়িয়েছে সে। কতবার বিধু সরকারের ঘরে গিয়ে বসেছে। কিন্তু এ-যেন অন্য চেহারা। উঠোনের মধ্যে এবার একটা পাঁচিলের ব্যবধান দেখে কেমন যেন সন্দেহ হলো তার।
বেণী যাচ্ছিলো। বললে—কী সাহেব, কী খবর? নান্নেবাঈ এসেছে নাকি?
-বাবু সাহেব কোথায়?
মেজবাবুকে খবর দিলে বেণী।
মেজবাবু বললে–নিয়ে আয় তাকে এখানে।
নাচঘরে ঢুকে আভূমি নিচু হয়ে মুন্নালাল সেলাম করে বললে— হজৌর খোদাবন্দ,
—কী রে মুয়ালাল, বেটা এসেছিস–নাবো কোথায়?
—একদিন গান-বাজনা হবে না হুজুর?
–জরুর হবে, আলবাৎ হবে—কে বললে হবে না, কোন্ আহাম্মক বলেছে? মেজবাবুর মেজাজ রঙিন ছিল তখন।
মুন্নালালের কথায় যেন নবাবী মেজাজে হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল। বললে-লে আও নাগ্নে বাঈকো–
—যো হুকুম খোদাবন্দ,–
তা এল নাম্নেবাঈ। বড়বাড়ি যেন বহুদিন পরে আবার হেসে উঠলো। আবার ঝাড়-লণ্ঠন জ্বলে উঠলো নাচঘরে। আবার মোহর পড়লো রূপোর থালায়। সারেঙ্গীওয়ালা মাথা হেলিয়ে বাজায় আর নাম্নেবাঈ-এর ঘাগরা ওড়ে। আতরদান থেকে আতরের ফোয়ারা ছোটে। ভৈরববাবু আজ নেই, তারকবাবু, মতিবাবু কেউ-ই নেই, তবু তাতে মেজবাবুর কিছু আসে যায় না। মেজবাবু একাই এক শ’। পায়ের পামশু কোথায় খুলে পড়ে গেল তার। পরনের কাপড় গেল খসে। অনেকদিনের পর আবার জমে উঠেছে নাচঘর। রূপের আর রূপের বাহার খুলেছে বহুদিন বাদে।
মেজবাবু চিৎকার করে উঠলো—কেয়াবাৎ—কেয়াবাৎ–
নান্নেবাঈ তখন মেজবাবুর চোখে চোখ রেখে গাইছে—
নয়না না মেরে রাজা
ঘুঘুট ঘটপট খোলে—
হঠাৎ যেন সারেঙ্গীর তার ছিঁড়ে গেল।
মেজবাবু হঠাৎ একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে তাকিয়ার ওপর উপুড় হয়ে পড়েছে। নান্নেবাঈ ভয় পেয়ে গান থামিয়ে দিয়েছে। সারেঙ্গীওয়ালা থামিয়ে দিয়েছে হাতের ছড়ি।
বেণী কাছে গিয়ে চিৎকার করে ডাকলো—বাবু, মেজবাবু, ও মেজবাবু–
ভূতনাথের এ-সব শোনা ঘটনা। রোজ ভোরবেলা বেরিয়ে যায় ভূতনাথ। আর আসে সেই রাত্রে। মেজবাবুর দৃষ্টিকে এড়িয়ে চলতে হয়। শুধু কি মেজবাবু। বিধু সরকারই কি কম! দুজনেই যেন যমের মতন খর-দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকে। একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে গেলে বড়বাড়ি ছেড়ে দেবে ভূতনাথ। কিন্তু মনে হয়—এই সময়ে বৌঠানকে ছেড়ে চলে যাওয়াই কি উচিত হবে!
ছোটকর্তার তরফে এক-একদিন রান্না হতে দেরি হয়ে যায়। সেজখুড়ি সকালে উনুনে আগুন দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বাজার তখনও আসেনি। ছোটকর্তার বিছানা সাফ করে, তাকে ওষুধ খাইয়ে, তার মুখ ধুইয়ে ছুটি পেতে বেলা হয়ে যায় বংশীর। তখন বাজারে যায়।
এক-একদিন টাকার বদলে সোনার দুল নিয়েই বাজার করতে যেতে হয়। দুল ভাঙিয়ে বাজারও আসে, ছোটমার একটা বোতলও আসে। ওটা বৌঠানের চাই। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে না পেলে কেমন যেন মেজাজ খারাপ হয়ে যায় ছোটমা’র। হাই ওঠে। ঘুম ভেঙেও যেন গা ম্যাজম্যাজ করে।
ছোটমা বলে—এত দেরি কেন রে তোর বংশী?
বংশী বলে—শুনুন শালাবাবু, কথা শুনুন, একা মানুষ কত দিকে দেখি বলুন তো—হাত তো দুটো।
ছোটমা বলে—আগে বোতলটা এনে দিয়ে, তারপর বাজারে গেলে পারতিস।
এদিকে সেজখুড়ি ওদিকে রাঙাঠাকমা। রাঙাঠাকমা এতদিন ভাঁড়ারের কাজ করে এসেছে। বুড়ো বয়েসে রান্নার কাজ করতে অসুবিধে হয় বৈকি! ভাতের হাঁড়ি নামাতে গিয়ে একদিন হাতে পায়ে গরম ফ্যান পড়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে বড়-বড় ফোস্কা উঠলো। কিন্তু তাই নিয়েই কাজ করতে হয়। বলে—কাজের কথা আর বলো না মা, কাজ কি একটা? লোকই কমছে, কাজ তো আর তা বলে কমছে না—আমি যে কবে ছাড় পাবে এই জেলখানা থেকে, ভগমান জানে!
সৌদামিনী বলে—মুখে আগুন ভগমানের, ঝাঁটা মারি অমন ভগমানকে। ভোলার বাপ বলতে, ফুলবউ চোখ থাকতে-থাকতে তিভুবন চিনে নাও—তা সেই ভোলার বাপ থাকলে আজ আর আমার ভাবনা—ভগমানের কি আক্কেল-গম্যি আছে মা, নইলে আমি পিদিম দিচ্ছি কার-না-কার ভিটেয়, আর আমার সোয়ামীর ভিটে আজ অন্ধকার ঘুরঘুট্টি।
সদুরমা পাঁচিলের ওপাশ থেকে বলে–হ্যাঁ লা সদু, গেরণ কখন লাগছে না?
সৌদামিনী সলতে পাকাতে-পাকাতে বলে—তুই তো বাঁজা বিধবা, গেরণের খোঁজ তোর ক্যান লা! যখন একত্তোর ছিল বউমণির, তখন তোর হাতের জল তো খেতে না কেউ–এখন তুইও সতী হলি—কালে-কালে কতই দেখবো মা!
রাঙাঠাকমা ওদিক থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে—আজ কি ব্লাঁধলি সেজখুড়ি?
সেজখুড়ি বলে—দুটো তো মানুষ ভারী, তার আবার রান্না, তাও ছোটবাবু তো ভাত মুখে দেয় নাম মাত্তোর-—আর ছোটমা’র পালা-পাৰ্বণ লেগেই আছে সারা বছর।
