এ এক আশ্চর্য রাত। ঘুমও ঠিক নয় আবার জাগরণও নয়। ঘুম আর জাগরণের মধ্যেই মনে হলো যেন বদরিকাবাবুর আত্মা বাড়িময় ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে। যেন বদরিকাবাবু ঘুরে-ঘুরে আজ প্রত্যেক ঘরে দেখতে এসেছে নিজে। সব ঘড়িগুলো পুড়েছে তো শেষ পর্যন্ত! পনেরোটা ঘড়ি। ওয়াল ক্লক। এতকাল সঠিক সময় দিয়ে এসেছে কালের সঙ্গে দুলে-দুলে। ভূমিপতি চৌধুরীর আমল থেকে প্রত্যেক পদে-পদে তারা কেল্লার তোপের সঙ্গে ঘণ্টা বাজিয়েছে। বার্তা শুনিয়েছে জয় ঘোষণার। কাহিনী শুনিয়েছে বিজয়-গৌরবের। তাই আজ যেন বদরিকাবাবু হঠাৎ ধমক দিয়ে বললেন—থাম, থাম মিথ্যেবাদীর দল।
বংশী বলেছে—মেজবাবু খুব বকুনি দিয়েছিল যে আজ্ঞে।
-কেন?
—দেখতে পায় তো সবাই, কোনো কাজ করে না, চুপ-চাপ শুধু শুয়ে থাকে চিৎপাত হয়ে। মেজবাবু শুধু বলেছিল—ঘড়িগুলোতে ধুলা জমেছে, কালি জমেছে, দেখতে পাও না?
বদরিকাবাবু বলেছিল—ও ধুলো নয় স্যার পাপ, পাপ জমেছে সব।
-পাপ? কিসের পাপ? মেজবাবু হেয়ালি বুঝতে পারেনি।
বদরিকাবাবু বলেছিল—সব রকমের পাপ স্যার, অত্যাচার, অন্যায়, অপব্যয়ের পাপ, কুঁড়েমির পাপ পাপের কি আর শেষ আছে এ-বাড়িতে?…
মেজবাবু তবু বুঝতে পারে নি। বিধু সরকারকে গিয়ে বলেছিল —ঘড়িবাবু কি পাগল হয়ে গিয়েছে নাকি বিধু?
বিধু সরকারের তো রাগ ছিলই বহুদিনের। সেই যেদিন মোটর এসেছিল বাড়িতে ইব্রাহিমের ছেলেটা থুতু দিয়েছিল মুখে। সব মনে ছিল তার। বললেও তো বরাবরই পাগল মেজবাবু, আপনি তো দেখেন না কোনো দিকে, কেবল খাবার কুমীর, রোজ চার সের চালের ভাত খায় একলা, অথচ কী-ই বা কাজ, আমি নিজেই দম দিতে পারি ঘড়িতে, ও আবার একটা কাজ নাকি!
মেজবাবু বলেছিল—তা হলে দাও ওকে তাড়িয়ে।
তা সেই তাড়িয়ে দেবার কথা শুনেই এই কাণ্ড! কখন যে সব ঘড়িগুলো দেয়াল থেকে নামিয়েছে, কখন জড়ো করেছে ঘরে, কখন আগুন জ্বালিয়েছে কেউ টের পায়নি। আর তা ছাড়া কে-ই বা ও-ঘরের দিকে যায়!
ভূতনাথের মনে হলো—সময় যেন সব একসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। বদরিকাবাবু চলে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে বড়বাড়িতে যেন আর চলছে না কিছু। অচল হয়ে গিয়েছে সব। সব। যেন কালের চাকা ভেঙে গিয়েছে। খুড়িয়ে-খুড়িয়ে যদিই বা একটু চলছে তা-ও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার জন্যেই। দম আটকে আসছে সংসারের। তিনটে সংসারের তিন-চারে বারোটা দেয়ালের মধ্যে বড়বাড়ির আত্মা যেন অসাড় মুমূষু। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। ব্রিজ সিং আজো দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় বটে। মেজবাবুর গাড়ি কচিৎ কদাচিৎ যখন বেরোয় তখন চিৎকার করে—হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার হো–কিন্তু গলাটা যেন ভাঙা-ভাঙা। গাড়ি বেরিয়ে গেলেই সামনের ফেরিওলাকে ডেকে বসে-বসে গল্প জোড়ে। খইনি খায়। আগের মতন তেমন খাতির করে না কেউ আর। আবার সব দিন পাগড়ি পরতেও মনে থাকে না। গেট-এর গা দিয়ে একটা অশ্বত্থ গাছের চারা গজিয়েছিল বহুদিন আগে, সেটা এখন ডাল-পালায় ছেয়ে ফেলেছে মাথাটা। তারই ছায়ায় দাঁড়িয়ে ব্রিজ সিং বলে—এ ভুখন ভাই, কা খবর মুলুক কা
ভুখন আসে। দু’ দণ্ড গল্প করে। খইনি দেয়। আবার চলেও যায়। নিজের কাজে।
উঠোনের মাঝখান দিয়ে যে-পাঁচিলটা উঠেছিল, তার মাথাতে শ্যাওলা জমেছে। শীতকালের দুপুরবেলা একদল কাক এসে বসে তার ওপর। এটো ভাত তরকারি নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। কাড়াকাড়িতে সে-ভাত-তরকারি উঠোনময় ছড়াছড়ি। দাসু জমাদার আগে দু’বার করে ঝাঁট দিতে উঠোন। এখন সেই এটো তিন দিন ধরে শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে যায়। শুধু হাঁটা পথটা মানুষের পায়ে-পায়ে পরিষ্কার থাকে। সৌদামিনী বাঁ হাতে ঘোমটা টানতে-টানতে বাইরে উঠোনের দরজায় আসে। তারপর উঁকি মেরে এদিক-ওদিক দেখে ভাতের এটো মাছের কাটাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় পাঁচিল ডিঙিয়ে।
যদি হঠাৎ সদুর-মা দেখতে পায়, বলে—তোর আক্কেলখানা কী লা—মাছের আঁশ যে বাড়িময় করলি—এখন কি নোংরা ছুঁয়ে চান করবো এই বারবেলায়।
বিধু সরকার আসে একবার সকালবেলা। ক্যাশ বাক্সয় ধুনট গঙ্গাজল দিয়ে লেখাপড়া করে কিছুক্ষণ। দু’একজন যদি আসে তো বলে—আজ হবে না হে, আজ বিষুবার, বিষ্যৎবারের বারবেলা, কলিকাল বলে কি ধম্মকম্মও উল্টে গেল নাকি সব?
তারপর দুপুরবেলা খাজাঞ্চীখানায় তালাচাবি লাগিয়ে বেরিয়ে যায় আদালতে মামলা-মকদমার তদ্বির-তদারক করতে হয়। অনেকগুলো মামলা একসঙ্গে থাকে। নথিপত্র নিয়ে সারাদিন ঘুরে বড়বাড়িতে যখন এসে পৌঁছিয় তখন সন্ধ্যে। তখন মেজবাবুর সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে পরামর্শ হয়।
বিধু সরকার বলে—আজ আবার দিন পড়লো হুজুর।
মেজবাবুর তখনও তামাক ভালো করে ধরেনি। বেণী ককেতে ফুঁ দিচ্ছিলো পাশে বসে! বলে—নটে নত্ত কী বললে বিধু?
বিধু সরকার বলে—বড়বাবুর অংশ তো শোধ হয়ে গিয়েছে। এখন আপনার আর ছোটবাবুর অংশটা পেলে তবে মামলা তুলে নেবে বলেছে।
মেজবাবু বলে—তুমি একবার ননীবাবুর পটলডাঙার বাড়িতে যাও তো বিধু।
—আজ্ঞে, ননীবাবু তো বিলেতে।
—তা হোক, তার সম্বন্ধীরা আছে, শাশুড়ী আছে—সবাই আছে। বলে এসো, এ-মাসের বাকিটা একসঙ্গে ও-মাসেই দিয়ে দেবোনইলে কবে আবার মামলা করে বসবে।
বিধু সরকার ধুলো-পায়েই আবার বেরিয়ে পড়ে। মেজবাবু বসে-বসে তামাক টানতে-টানতে একবার বেণীকে ডাকে। বেণী তখন সংসারের অন্য কাজ করছে। রান্নাবাড়ির উঠোন থেকে শুনতে পাওয়া যায় না মেজবাবুর ডাক। উঠোন ঝাঁট দেয় আর বলে—কালই আমি দেশে চলে যাবো গিরি।
