ভূতনাথ বললে—রাগ করো না বৌঠান, আমি ছিলাম না এখানে, আজ এসেছি—রাত্তির ছাড়া তো তোমার কাছে আসা যায় না।
বৌঠান বললে—যেখানে ছিলি সেইখানেই থাকলে পারতিস, আর আসা কেন-কী দেখতে এসেছিস?
ভূতনাথ ভালো করে চেয়ে দেখলে। বৌঠানের গায়ের গয়নাগুলো যেন কম-কম। নাকের নাকছাবিটা কোথায় গেল? হীরের সে কানফুলটাও নেই। অন্য একটা সোনার দুল রয়েছে সেখানে।
ভূতনাথ বললে—তুমি সেই বরানগরে যাবে বলেছিলে সেদিন, তাই জন্যে এসেছি বলতে—যাবে বৌঠান একদিন?
–আমাকে সত্যিই নিয়ে যাবি তুই ভূতনাথ? বৌঠান যেন এক নিমেষে আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললে—ছোটকর্তার কী দশা হয়েছে ভূতনাথ—চোখে দেখা যায় না মানুষটাকে, দিন-দিন আরো বাড়ছে। আর সারবে না বোধহয়—শশী ডাক্তার দেখছে, টাকাও নিয়ে যাচ্ছে মুঠো-মুঠো—আমি শুধু বলবে গিয়ে—ছোটকর্তা যেন ভালো হয়ে ওঠে—আর আমার কোনো মান নেই।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—তুমি মদ খাওয়া ছেড়েছে। বৌঠান?
—ছাড়তে আর পারলুম কই রে ভূতনাথ, লুকিয়ে-লুকিয়ে এখনও আনাই, বংশীও আজকাল আর কথা শোনে না আমার কেউ কথা শোনে না—তবু না খেয়েও পারি না—অথচ ছোটকর্তা কেমন করে না খেয়ে থাকে কে জানে—বৌঠান তাকিয়ায় হেলান দিলে এবার।
ভূতনাথ বললে—আমিও তোমার জন্যে মান করবে বৌঠান, তুমি যেন ভালো হয়ে যাও—আমারও পাঁচ পণ পান-সুপুরি যোগাড় করে রেখে দিও।
—তা হলে কবে যাবি? বৌঠান জিজ্ঞেস করলো।
ভুতনাথ উত্তর দিতে যাচ্ছিলো, কিন্তু হঠাৎ বাইরে যেন কিসের গোলমাল শুরু হলো। সঙ্গে-সঙ্গে ঝড়ের মতন বংশী ঘরে ঢুকেছে!
—শালাবাবু, সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে—চলে আসুন।
—কী হলো রে বংশী? বৌঠানের কথার জবাব দিলে না বংশী। শুধু বললে—তুমি বেরিও না ছোটমা—আমি আসছি।
বাইরে এসে বংশী বললে—আপনি চোরকুঠুরিতে ঢুকে পড়ন আজ্ঞে—ওদিকে বৈঠকখানায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
আগুন? ভূতনাথ অবাক হয়ে গিয়েছে। বললে—কে?
বংশী বললে—আপনি ঘর থেকে বেরোবেন না যেন আজ্ঞে। সবাই জড়ো হয়েছে উঠোনে, মেজবাবুকে ডাকতে গিয়েছে বেণী।
—কে আগুন দিলে বংশী?
বংশী চলতে-চলতে বললে–বদরিকাবাব।
–বদরিকাবাবু? কেন?
ভূতনাথের যেন বিস্ময়ের আর অন্ত নেই। বদরিকাবাবু এত জিনিষ থাকতে শেষে কিনা আগুন জ্বালালে?
বংশী বললে—এদানি ওর মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিনা।
—মাথা খারাপ হলে আবার কবে?
—আজ্ঞে, মেজবাবু সেদিন বকেছিল যে ওকে খুব, বাড়িতে পনেরোটা ঘড়ি, একটাও ঠিক সময় দেয় না-দিনরাত কেবল চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকে। তাই মেজবাবু তাড়িয়ে দেবে ভয় দেখিয়েছিল। বিধু সরকার মশাই বলেছিল—আর দরকার নেই লোকের—ঘড়ির দম নিজেমাই দিয়ে নেবে। একটা লোকের খেতে কি কম খরচ!
বংশী চলে যেতেই চোরকুইরি থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে একান্তে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভূতনাথ দেখতে লাগলো। অন্ধকার উঠোনের সামনে আলোর লাল আভা ফুটে উঠেছে। সবাই জড়ো হয়ে ঘড় ঘড়া জল ঢালছে বৈঠকখানার দিকে। এ কেমন প্রতিশোধ নেওয়া! বংশীও সকলের সঙ্গে ঘড়ায় করে জল নিয়ে ঢালছে। জলে-জলে ভেসে গেল উঠোনটা। ধোঁয়ায় চারিদিক আচ্ছন্ন একটা চিমসে পোড়া গন্ধ সমস্ত বাতাসকে যেন কলুষিত করে দিয়েছে। নাকে কাপড় দিলে ভূতনাথ।
ততক্ষণে দেখা গেল যেন সবাই বৈঠকখানা ঘর থেকে কাকে টেনে বার করছে। অন্ধকারে লোকজনকে ছায়ামূর্তির মতো মনে হয়। কিছু স্পষ্ট চেনা যায় না। আকাশটা ঘোলাটে। কোথাও চাঁদের চিহ্নমাত্র নেই। ভয়ার্ত রাত যেন হঠাৎ আরো ভয়াল হয়ে উঠলো।
বংশী আবার এল। বললে—আপনি ঘরের ভেতরে গিয়ে ঢুকুন। আজ্ঞে। ওখানে মেজবাবু এসেছে—আপনাকে দেখতে পাবে।
ভূতনাথ বললে—কাকে ঘর থেকে যেন টেনে বার করলে বংশী?
—আজ্ঞে, বদরিকাবাবুকে, পুড়ে একেবারে বেগুনপোড়া হয়ে গিয়েছে শালাবাবু—এখনও একটু-একটু জ্ঞান আছে, চি-চি করছে।
—কী করে হলো?
বংশী বললে—বাড়িতে আর একটাও ঘড়ি নেই হুজুর, পনেরোটা বড়-বড় ঘড়ি, সব জড়ো করেছে বৈঠকখানায়, তার ওপর নিজের জামা-কাপড় চাপিয়ে, তার ভেতরে নিজে ঢুকে আগুন দিয়ে দিয়েছিল। কী সহি ক্ষেমতা বলুন—কখন যে সব বসে-বসে তোড়জোড় করেছে, কেউ টের পায় নি আজ্ঞে-বলেই বংশী আবার দৌড়ে ওদিকে চলে গেল।
এতক্ষণে দমকল এল বুঝি। ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজাতে-বাজাতে ঢুকে পড়লো বড়বাড়ির ভেতর। তার সঙ্গে পাড়ার লোকের চিৎকারে ছায়াচ্ছন্ন রাত কলমুখর হয়ে উঠলো। চারিদিকে বিশৃঙ্খলা। আশে-পাশের বাড়ির ছাদে লোকজন জড় হয়েছে। আগুনের শিখা নিবে যাবার পরেও ধোঁয়ায় আর চোখ মেলা যায় না। চোখ জ্বালা করতে লাগলো ভূতনাথের। দমকল এসে শা-শাঁ করে জল ছিটিয়ে সমস্ত বাড়িটা ভিজিয়ে একেবারে একসা করে দিলে। সমস্ত ঠাণ্ডা হলে যেন এতক্ষণে। ভূতনাথ চোরকুঠুরির ভেতরে ঢুকে দরজায় খিল বন্ধ করে দিলে আবার। দরকার কী! মেজবাবু হয় তো দেখে ফেলবে তাকে! কাল অনেক কাজ—ভোর রাত্রে উঠেই জবাদের বাড়িতে যেতে হবে। তারপর বিকেলবেলা বৌঠানকে নিয়ে আবার বেরোতে হবে বরানগরে। আজ আর রাত বুঝি বেশি নেই। একটু চোখ বুজবার চেষ্টা করলে ভূতনাথ।
কিন্তু তবু অন্ধকারের মধ্যেই যেন বদরিকাবাবুর চেহারাটা ভেসে ওঠে বিনিদ্র চোখের সামনে। কিন্তু ঘড়িগুলোর ওপর অত রাগ কেন বদরিকাবাবুর! যে লোক প্রতিদিন ঘণ্টায়-ঘণ্টায় ঘড়ি মিলিয়ে রাখতে, সময়ের পদধ্বনি শোনবার আশায় সঙ্গে টাকঘড়ি রাখতে দিনরাত, তার এ কী কাণ্ড! তবে কি বদরিকাবাবু সময়ের গলা টিপে মারতে চেয়েছিল? কিম্বা সময় বুঝি বদরিকাবাবুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে শেষ পর্যন্ত! কে জানে!
