জবা জিজ্ঞেস করে—আমাকে আপনি একটা কথা বুঝিয়ে দিন—যা আমার ভালো লাগে তা সঞ্চয় আর ভোগ করার মধ্যে কোনো কিছু অন্যায় আছে কি?
ধর্মদাসবাবু বলেন—খারাপ তো কিছু নেই মা, যে জিনিষ আমাদের স্পর্শ-দৃষ্টি-শ্রুতি-বোধকে তৃপ্ত করে, তাদের মধ্যে তো নিন্দে করবার কিছু নেই মা, খারাপটা রয়েছে আমারই মধ্যে যে—যখন আমি সব ত্যাগ করে আমাকেই ভরণ করি, তখনই সেটা অশুচিকর হয়ে ওঠে মা-এই স্বার্থপরতার দিকটাই অসত্য, তাই সেটা অপবিত্র। অন্নকে যদি গায়ে মাখি, তবে সেটা অপবিত্র, কিন্তু যদি খাই, তাতে তো অশুচিতা নেই, কারণ গায়ে মাখাটা যে অন্নের সত্য ব্যবহার নয়।
জবা আবার জিজ্ঞেস করে—আর একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করি—অতীতটা সত্য, না বর্তমান সত্য, আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন?
ধর্মদাসবাবু বললেন—এ-কথার উত্তর তত কঠিন নয় মা, যখন তুমি শোক থেকে শোকের উধ্বে উঠবে, তখন বুঝতে পারবে সত্য চিরকালের—সত্যের তো অতীত বর্তমান নেই মা।
জবা বলে—কিন্তু যে-সত্য ঘটে গিয়েছে আমার অজ্ঞাতে, আমার জ্ঞানের অগোচরে, ধরুন আমার যখন বয়েস দু’মাস-সে সত্যকেও কি পরম-সত্য বলে মনে করতে হবে?
ধর্মদাসবাবু বললেন—ওই একই কথা হলো মা, যতদিন আগেই ঘটুক, আর যে বয়েসেই ঘটুক, আমার দিকটা যখন একান্ত হয় তখনই সে অসত্য হয়—এইজন্যেই সে অপবিত্র হয়ে ওঠে, কেননা কেবলমাত্র আমার মধ্যে তো আমি সত্য নই। সেইজন্যে যখন কেবল আমার দিকেই আমি সমস্ত মনটাকে দিই, তখনই আত্মা অসতী হয়ে ওটে, সে শুচিতা হারায়। খানিক থেমে নিয়ে ধর্মদাসবাবু আবার বললেন—আত্মা পতিব্রতা স্ত্রীর মতে—তার সমস্ত দেহ-মন-প্রাণ আপনার স্বামীকে নিয়ে সত্য হয়, তার স্বামীই তার প্রিয় আত্মা, তার সত্য আত্মা, তার পরম আত্মা—তার সেই স্বামী সম্বন্ধেই উপনিষদ বলেছেন-’এষাস্য পরমাগতিঃ, এষাস্য পরমা সম্পৎ, এবোহস্য পরমো লোকঃ, এমোহস্য পরম আনন্দঃইনিই তার পরম গতি, ইনিই তার পরম সম্পদ, ইনিই তার পরম আশ্রয়, ইনিই তার পরম আনন্দ।
ধর্মদাসবাবু চলে যাবার পরই হঠাৎ জবা উঠলো। উঠে কোনো কথা না বলে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজায় খিল বন্ধ করে দিলে।
ভূতনাথ একবার শুধু বললে—কিছু খাবে না জবা?
সে-কথার উত্তরও দিলে না জবা। কিন্তু যেটুকু দেখা গেল, তাতে মনে হলো শরীরের সমস্ত রক্ত যেন তখন জবার মুখে এসে আশ্রয় নিয়েছে। বিছানায় গিয়ে যেন এখনি সে উপুড় হয়ে কাঁদতেই শুরু করবে!
৪০. চোরকুঠুরির ভেতর শুয়ে
চোরকুঠুরির ভেতর শুয়ে-শুয়ে এই কথাগুলোই ভাবছিলে ভূতনাথ। রাত্রের নির্জনতা নেমে এসেছে বড়বাড়িতে। কিন্তু আগের চেয়েও যেন চারিদিক আরো নিস্তব্ধ। দক্ষিণের বাগানের দিক থেকে সেই শব্দগুলো আর আসে না। দাসু জমাদারের ছেলের বাঁশীতে—’ওঠা-নামা প্রেমের তুফানের সুর আজ আর শোনা গেল না। সেই অদৃশ্য পাখীটা আর ডেকে উঠলো না বাগানের আমলকি গাছটার ডাল থেকে। রাত অনেক হলো আস্তে-আস্তে। কিন্তু বংশী তো এখনও এল না।
বংশী বলে গিয়েছিল—খুব সাবধানে থাকবেন শালাবাবু, মেজবাবু খুব রেগে গিয়েছে সব শুনে বলেছে, বাড়ির বউ-এর সঙ্গে বাইরের পুরুষ দেখা করে, এ কেমন কথা!
ভূতনাথ বলেছিল—তবে আমার আর এখানে থাকা কেন বংশী—কালই চলে যাই এখান থেকে।
বংশী বলেছিল–ছোটমা যদ্দিন আছে, তদ্দিন থাকুন শালাবাবু, এখন তো হাঁড়ি আলাদা—তারপরে আমিও আর থাকছি না আজ্ঞে-কার জন্যেই বা থাকা।
সত্যিই তো! ভেবে দেখতে গেলে বড়বাড়ির ঐশ্বর্যের আকর্ষণ আর ভূতনাথের নেই। সে ছিল প্রথম-প্রথম। বড়বাড়িতে গাড়ি, ঘোড়া, চাকর-বাকর, বিয়ে, পূজো—সমস্তর সঙ্গে ভূতনাথ একদিন একাত্ম করে দিয়েছিল নিজেকে। সকলের সঙ্গে তারও জামা-জুতো-কাপড় আসতো। আর সকলের সঙ্গে ভূতনাথও নিজেকে এ-বাড়ির একজন বলে ভাবতো!!
বংশী বলেছিল-এবার বোধ হয় পূজোও বন্ধ হবে আজ্ঞে ভাগের পূজো, কে ভার নেবে বলুন তো?
তা সত্যিই তাই হলো। এতদিনকার পূজা, এত স্মৃতি জড়ানো! এতগুলো মানুষের কল্যাণকে জলাঞ্জলি দিয়ে পূর্বপুরুষের পূজো বন্ধ রইল—এ যেমন অভাবনীয় তেমনি মর্মান্তিক। কলকাতার সমাজে বদনাম হয়েছে এবার চৌধুরীবাবুদের। নটে দত্ত ছোটবাবুর চুনীদাসীকে নিয়ে আছে। গাড়ি নাকি কিনে দিয়েছে তাকে। বড়বাড়ির এত বড় পরাজয়কে চোখের সামনে দেখেও সম্বিত ফিরলো না কারো। আর ননীলাল! সেই ননীলালের কাছেই এখন এত বড় বাড়ি, অবশিষ্ট যা কিছু সব দাসখৎ লিখে দিতেও বাধলো না চৌধুরীদের আত্মমর্যাদায়। মাসেমাসে সুদ নিতে আসে ননীলালের বাড়ির লোক। এ কেমন করে রক্ষা পাবে। অনিবার্য ধ্বংসকে কেমন করে নিবারণ করবে এরা।
মাঝ রাত্রে দরজায় টোকা পড়লো।—শালাবাবু।
বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলে দিয়েছে ভূতনাথ। বললে-এসেছে বংশী? আমি তখন থেকে কেবল ভাবছি।
—চলুন, কিন্তু মেজবাবু আজকে মেজমা’র ঘরে শুয়েছে।
–বৌঠানকে খবর দিয়ে রেখেছো তো তুমি?
–দিয়েছি, কিন্তু খুব আস্তে-আস্তে যাবেন হুজুর, দেয়াল উঠে গিয়েছে বারান্দার মধ্যে, কিন্তু গলার শব্দ ও-পাশ থেকেও শোনা যায় কিনা।
টিপি-টিপি পায়ে আবার বৌঠানের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ভূতনাথ।
বৌঠান বোধ হয় ঘুমোচ্ছিলো। ভূতনাথের খবর পেয়ে উঠে বসেছে। কিন্তু তখনও ঘুম-জড়ানো চোখ। ভূতনাথকে দেখে গম্ভীর হয়ে গেল। বললে—কোথায় ছিলি এতদিন ভূতনাথ?
