জবা তখনও একমনে বসে আছে উপাসনা ঘরের ভেতর। যেমনভাবে বসেছিল বিকেল থেকে, ঠিক তেমনি ভাবেই। এতটুকু নড়েনি। যে-মানুষের সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে কাটে, কাজের মধ্যে ড়ুবে থাকে যে, এ-ঘর থেকে ও-ঘর করে বেড়ায়, কথায় গানে মেতে থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত, তার এই রূপান্তর সত্যিই চোখে ঠেকে। দেয়ালের গায়ে সুবিনয়বাবুর ফটোটা রাজা-রাণীর ছবির নিচে ঝুলছে। সেদিকেও দৃষ্টি নেই জবার। ভূতনাথকে দেখেও যেন দেখতে পায়নি।
ভূতনাথ বললে—সারাদিন কিছু খাওনি জবা, কিছু খেলে হতো।
জবা বললে—আপনি বরং কিছু খান—বলে জবা সত্যিই উঠতে চ্ছিলো।
ভূতনাথ বাধা দিলে। বললে–থাক, তোমায় আর উঠতে হবে না। আমার খাওয়ার বন্দোবস্ত আমি নিজেই করতে পারবো কিন্তু একটা কথা তার আগে তোমায় আমি জিজ্ঞেস করববা জবা?
জবা মুখ তুলে ভূতনাথের চোখে চোখ রাখলো। তবু ভূতনাথের মুখ থেকে কোনো প্রশ্ন না আসাতে বললে–বলুন।
ভূতনাথ বললে—বাবার শেষ ইচ্ছে ছিল তোমার ভার সুপবিত্রই নেবে—কিন্তু তাকে তো তুমি শেষ পর্যন্ত তাড়িয়েই দিলে!
জবা মুখ নিচু করে বললে—সুপবিত্র জানে কেন তাকে আমি… আর বলতে পারলে না জবা।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু সুপবিত্রকে জানালেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? তোমার নিজের ভবিষ্যৎ, সুপবিত্রর ভবিষ্যৎ কিছুই কি ভাববে না তুমি?
জবা চুপ করে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বললে—সুপবিত্রকে আসতে বারণ করে আমিই কি খুব সুখে আছি বলতে চান?
—তুমিও যদি সুখে না থাকো, সুপবিত্রও যদি দুঃখ পায়, তা হলে কেন এ দুর্ভোগ?
জবা বললে—তা কি আমি জানি না ভূতনাথবাবু, জানি, সুপবিত্র বাড়ি যাবার পথে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরবে অনেকক্ষণ, এ–ক’দিন হয় তো ঘুমোয়ই নি মোটে, শুধু কি তাই—আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দেবে হয় তো চিরকাল-তবু ওকে আমি এখানে আসতে বলতে পারি না ভূতনাথবাবু—এখানে আসা ওর উচিত নয়।
–কিন্তু কেন?
জবা কাঁদতে লাগলো। সুবিনয়বাবুর মৃত্যুতে যে কঠিন পাথরের মতো শক্ত হতে পেরেছিল, তার এই শৈথিল্যে কেমন যেন অবাক লাগার কথা।
অনেকক্ষণ পরে ভূতনাথ বললে—আমারই হয়েছে মুশকিল, তোমাকে এই অবস্থায় ফেলে আমিই কি চলে যেতে পারি?
জবা থেমে বললে—আপনি কিছু ভাববেন না ভূতনাথবাবু, আমি আমার নিজের পথ বেছে নেবে।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু পথ বেছে নেওয়ার আগে পর্যন্ত যে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারছিনে।
জবা আবার মুখ তুললো। কান্নায় ভারী হয়ে গিয়েছে চোখের পাতা। বললে-ভূতনাথবাবু, আপনার ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারবো না।
-ঋণ শোধের কথা না-ই বা তুললে জবা, সংসারে কার ঋণ কে শশাধ করতে পারে, এত বড় অহঙ্কার করবার ক্ষমতা কারই বা. আছে সংসারে।
-না, আজ মনে হয়, কত অন্যায়ই করেছি আপনার ওপর।
-ন্যায়-অন্যায়ের কথা আজ থাক জবা, তোমাকে তো বলেছিলাম একদিন এ-আমার নেশা নয়, কর্তব্য-কর্তব্যই শুধু নয়,. ব্রত। তোমার কোনো উপকার করতে পারলে আমি কৃতার্থ মনে করবো নিজেকে—আমি তো প্রতিদান চাইনি কখনও।
জবা মুখ নিচু করে বললে–কিন্তু ভাগ্য যার বিরূপ, তার কাছে প্রতিদান চাওয়া যে বিড়ম্বনা ভূতনাথবাবু!
-তুমিও শেষে ভাগ্যের কথা তুললে জবা?
-ভাগ্যের বিড়ম্বনা যাকে সইতে হয়েছে সে-ই ভাগ্যের কথা তোলে।
ভূতনাথ বললে-ভেবেছিলাম দুর্ভাগ্যটা বুঝি আমারই একচেটে—কিন্তু সে-কথা থাক, নিজের পথটা তুমি তাড়াতাড়ি বেছে নিলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।
জবা বললে—আমাকে আর একটু সময় দিন, আমি দু-একদিনের মধ্যেই ঠিক করে ফেলবো।
-সঙ্কল্পটা আমাকে জানাতে তোমার কোনো বাধা আছে?
জবা বললে—আমি হাসপাতালে কাজ করবো।
-কোথায়?
-বাবা যে-হাসপাতাল করে দিয়েছেন বাগবাজারে আমাদের বাড়িতে, সেখানেই ঠিক করে ফেলেছি। শুধু একটু ভেবে দেখছি আর কটা দিন সময় দিন আপনি আমাকে।
ভূতনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে—কিন্তু। একটা কথা জিজ্ঞেস করবে তোমাকে স্পষ্ট করে তার উত্তর দেবে তুমি?
-বলুন।
—সুপবিত্রর সঙ্গে বিয়েতে তোমার বাধাটা কোথায়? জবা মুখ তুললো এবার। বড় অসহায়ের মত চাইলো। তারপর আবার মুখ নিচু করে বললে—জানি না, আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা, কিন্তু অনেক সময় মানুষের জীবনে যা ঘটে তাতে তার নিজের কোনো হাত থাকে না, বাবার মৃত্যুর দিনের কথা মনে আছে? আপনারা সবাই ও-ঘরে চলে গেলেন, আমি বাবার কাছে রইলাম–বলে জবা থামলো।
ভূতনাথ বললে—তারপর?
-তারপর কী ঘটলো, সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়—সে-স্বপ্ন বলরামপুরের। ক’বছরই বা কাটিয়েছি সেখানে, ঠাকুরদা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বাবার মুখ দেখবেন না, হিন্দু হয়ে বাবার ব্রাহ্ম হওয়া তিনি ক্ষমা করেননি-মৃত্যুর শেষ দিনটি পর্যন্ত ক্ষমা করেন নি—কিন্তু তখন আমার নাকি মাত্র দু’মাস বয়েস সেই সময়ে…
ঝি হঠাৎ ঘরে ঢুকলো। বললে—একজন বাবু, এসেছেন দিদিমণি।
ভূতনাথ বললে—কে বাবু?
—তা জানিনে।
ভূতনাথ নিচে গিয়ে দেখলে—ধর্মদাসবাবু। ভূতনাথ বললে— আসুন—ওপরে আসুন।
ধর্মদাসবাবু জিজ্ঞেস করেন—আমার জবা-মা কেমন আছে বাবা?
ধর্মদাসবাবু একবার করে রোজই আসেন, সুবিনয়বাবুর পুরোনো বন্ধু। যখন আসেন অনেক উপদেশ দিয়ে যান। ধর্মদাসবাবু বলেন—পিতা-মাতা সকলের চিরদিন থাকে না মা—কিন্তু পরমআত্মীয়ের মৃত্যুতেই আমরা যথার্থ উপলব্ধি করি যে, যাকেই পিতা বলে ডাকি না কেন, তিনিই আমাদের একমাত্র পিতা—তাই উপনিষদে আছে “পিতা নোহসি’—পিতার মধ্যে পিতারূপে যে-সত্য সেও সেই তিনি—সেই নিরাকার পরম পিতা। মাতার মধ্যে মাতারূপে যে-সত্য সেও সেই তিনি, সেই পরম পিতা। ধর্মদাসবাবু আরো বলেন—সেই পরম পিতাকে উপলব্ধি করো মাসেই পরম সত্যকে গ্রহণ করতে চেষ্টা করো—সেই পরম শুচিকে আপন চিত্তের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করো।
