চলে আসবার দিন জবাকে জিজ্ঞেস করেছিল ভূতনাথ–সুপবিত্রকে তো তাড়িয়ে দিলে জবা—আমাকেও কি আসতে বারণ করছে?
সমস্ত বাড়িতে যেন বৈধব্যের মতো এক অকরুণ নিঃসঙ্গতা। জবার সে খর্য যেন হারিয়ে গিয়েছে। সেই কর্মব্যস্ততা, সেই উন্মুখর চাঞ্চল্য নেই চলায়-বলায়। সুবিনয়বাবুর অনুপস্থিতি যেন প্রত্যেক পদপাতে প্রখর হয়ে উঠছে।
জবা এতক্ষণ একটা কথারও জবাব দেয়নি! আপন মনেই বসে ছিল। অত সেলাই-এর আয়োজন, অত প্রতীক্ষা সব যেন তার নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। অতিথি ঘরে আসবার আগেই নিবে-যাওয়া প্রদীপের মতো অপার শূন্যতা যেন ছেয়ে ফেলেছে জবাকে। অথচ জবার এ-ব্যবহার যেমন আকস্মিক তেমনি যুক্তিহীন। এই ফাঁকা বাড়িতে কে দেখবে জবাকে! কার সঙ্গে কথা বলে সময় কাটাবে। কার সেবা করে দিনযাপন করবে সে। সে-প্রশ্নের উত্তর যেন আবার দেবার কথা নয়।
ভূতনাথ নিজেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে শেষ পর্যন্ত। ঝিকে ডেকে বলেছে—যতদিন না কিছু ব্যবস্থা হয়, ততদিন তোমায় বাছা দিদিমণির কাছে দিনরাত থাকতে হবে।
রাজী হয়েছে ঝি। বলেছে—দিদিমণির বিয়ের সময় আমাকে নতুন কাপড় একটা দিতে হবে কিন্তু।
ভূতনাথ আরো বলেছে—সে যখন হবে, তখন হবে, এখন একটু সাবধানে থাকবে, দরজা যেন খোল পড়ে না থাকে—দেখছে। তো বাড়িতে কোনো পুরুষমানুষ নেই, নিজের সংসার মনে করে থাকবে, কাজ করবে, দিদিমণির কেউ নেই জানো তো।
জবা এ-ব্যবস্থায় সম্মতিও দেয়নি, প্রতিবাদও করেনি। চুপ করে বোবার মতো সমস্ত শুনেছে কেবল।
সমাজের আচার্য ধর্মদাসবাবু এসেছিলেন। বলে গেলেন—মা, যখনি তোমার কোনো প্রয়োজন হবে, আমাকে খবর দিও, আমি তোমার পিতার মতন—দ্বিধা করে না।
উপদেশ দিয়ে গেলেন—মা, তুমি তো সবই জানো, তোমাকে আর কী বোঝাবো, জীবনের তত্ত্বই হচ্ছে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নতুনকে প্রকাশ করা—সংসারের সঞ্চয় তাই তো প্রতিদিন কেবল ক্ষয় হয়ে যায়। এ-সংসারের শুরু শিশুকে নিয়ে, তারপর সেই সংসারই তাকে একদিন বৃদ্ধ করে ছেড়ে দেয়। তাই উপনিষদের মৈত্রেয়ী বলেছিলেন—যে নাহং অমৃতস্যা কিমহম্ তেন কুৰ্যাম—
রূপচাঁদবাবুও এসেছিলেন। বললেন—আমার মেয়েরা তোমারই বয়সি মা, যদি মনে করে। এখানে কষ্ট হবে, আমার বাড়িতে যেতে পারে। দুটো বাড়িই তোমার রইল, এখন যা ইচ্ছে হয় তোমার।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু জবা, সুপবিত্রকে তো তাড়িয়েই দিলে–জীবনটাকে কি এমনি করেই কাটাবে ভেবেছো?
জবা বলেছে—ভূতনাথবাবু, আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে একটু একলা থাকতে দিন।
ভূতনাথ জবার ধৈর্য দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে। সুবিনয়বাবুকে যখন ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে তখনও এক ফোটা চোখের জল পড়েনি। কথা বলেনি একটাও। কান্না দূরে থাক, নিজেকে এতখানি সংযম দিয়ে বাঁধতে পারবে একথা ভাবাও যায়নি।
সুপবিত্র তবু একবার এসেছিল। শেষকৃত্যের সময় সুপবিত্র সর্বক্ষণ উপস্থিত ছিল একান্তে। কিছু করেনি সে, কিন্তু কোথায় যেন একটা সঙ্কোচ একটা অপরাধ-বোধ ছিল মুখে-চোখে। যখন একে-একে সবাই চলে গিয়েছে, সুপবিত্রও চলে যাচ্ছিলো। যেন আর তার করণীয় কিছুই নেই।
ভূতনাথের কেমন যেন দুঃখ হলো। বললে—আপনিও যাচ্ছেন?
–হ্যাঁ—বলে ততক্ষণে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে সুপবিত্র।
ভূতনাথ সঙ্গে-সঙ্গে গিয়ে ধরলো। বললে-এ-সময় আপনিও যেন অবুঝ হবেন না। এখন থেকে জবাকে দেখবার লোক কেউ নেই, সেটা ভুলে যাবেন না সুপবিত্রবাবু!
সুপবিত্র একবার থমকে দাঁড়ালো। তারপর আবার চলতে লাগলো পায়ে-পায়ে।
ভূতনাথ আবার বললে–অভিমান করে জবা কি বলেছে, তাই শুনে যদি আপনিও অভিমান করেন, তাহলে কেমন করে চলে বলুন তো?
তখন চারিদিকে বেশ সন্ধ্যে। একে-একে গলির গ্যাসগুলোতে আলো জ্বলা হচ্ছে। সুপবিত্রর মুখ, স্পষ্ট দেখা যায় না। শুধু বললে–এর পরেও আমাকে আসতে বলেন?
ভূতনাথ সান্ত্বনার সুরে বললে—আপনাকে আর কি এমন বলেছে! জবাকে আমি এইটুকু বেলা থেকে জানি, ওর কথায় রাগ করবেন না, ওর স্বভাবই ওইরকম, কী বলে তা নিজেও জানে না। মায়ের ভালোবাসা পায়নি, তার ওপর আট-ন’ বছর পর্যন্ত পাড়াগাঁয়ে মানুষ। আমাকে কতদিন কত কী বলেছে, আমি কি না এসে পেরেছি, না রাগ করেছি।
–রাগ? সুপবিত্র যেন হাসলে একটু। ঠিক হাসি, না অভিমান অন্ধকারে ভালো বোঝা গেল না।—না, রাগ তো করিনি, রাগ করতে যাবে কেন মিছিমিছি ভূতনাথবাবু? অনেকখানি কথা এক সঙ্গে বলে সুপবিত্র যেন হাঁপিয়ে উঠলো।
ভূতনাথ বললে—তা হলে কাল আসছেন তো?
সুপবিত্র বললে—আমার তো আসা নিষেধ।
-এই দেখুন, আপনি নিশ্চয় রাগ করেছেন?
সুপবিত্র বললে—বিশ্বাস করুন ভূতনাথবাবু, আমি রাগ করিনি, সত্যি আমার আসা নিষেধ।
ভূতনাথ বললে—রাগের বশে কী বলেছে জবা, সেইটেই বড় করে দেখছেন কেন সুপবিত্রবাবু। এখনও যে অনেক কিছুর আয়োজন করতে হবে।
সুপবিত্র আবার থমকে দাঁড়ালো। যেন কিছু বলতে গেল। কিন্তু…
-–ও কিন্তু-টিন্তু নয় আর, ওসব ওজর শুনছিনে, আপনি আসুন কাল, আমি সব বিবাদ মিটিয়ে দেবো।
সুপবিত্ৰর চোখ দুটো তখন যেন জ্বলছে। একটা গ্যাসের আলোর তলায় ভূতনাথ তার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলে। সুপবিত্র মুখ নিচু করলে। তারপর বললে—আপনি হয় তো শোনেননি, কিন্তু জবার কাছে যে আর যাবার আমার পথও নেই।
—সে কি? সঙ্গে-সঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ভূতনাথের মনে এল। কিন্তু সুপবিত্র তখন হনহন করে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। বজ্রাহতের মতন ভূতনাথ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। ভূতে পাওয়া মানুষের মনকেমন যেন বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইল সুপবিত্রর দিকে। তারপর আবার ফিরে এল জবাদের বাড়িতে।
