কেন যে এত ব্যস্ততা বংশীর, ভূতনাথ বুঝতে পারলে না। বললে-কী হলো-বলে এদিক-ওদিক চাইতে লাগলো ভূতনাথ।
–বিধু সরকার মশাই আসছে, সরে আসুন আজ্ঞে এখান থেকে।
–কেন? বিধু সরকার কি করবে আমার?
—চলে আসুন আগে, বলছি—লোক তো ভালো নয় আজ্ঞে। চোরকুঠুরির ধারে এসে বংশী বললে—আপনি কাজে যাবেন তো আজ? আপনার খাবার চাল নিতে বলি তাহলে?
–না, আমার তো ছুটি এখন ক’দিন—বেলায় যাবে কিন্তু বিধু সরকার কি খাতা থেকে নাম কেটে দিয়েছে নাকি আমার?
বংশী বললে—আপনি তত আমাদের তরফে আজ্ঞে, বিধু সরকার কী করতে পারে, কিন্তু লোকটা তো ভালো নয়, পরের নামে মিথ্যে করে রটিয়ে বেড়ায়, আপনার কথা তো সব মেজবাবুকে বলেছে কি না।
–কী বলছে, কী?
—যত সব মিথ্যে কথা হুজুর, সেদিন আপনি বৌঠানের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, মেজবাবু দেখেছে, কিন্তু চিনতে পারে নি আজ্ঞে, আমাকে জিজ্ঞেস করলে কে রে ওখানে? আমি বললাম–আমি। তখন মেজবাবু জিজ্ঞেস করলে-বারান্দা অন্ধকার কেন, —আলো জ্বালা থাকবে সব সময়। তা সে-ব্যাপারের তত সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিধু সরকার মেজবাবুকে আপনার নাম বলে দিয়েছে আজ্ঞে। বলেছে-ওই লোকটা ছোটবউ-এর কাছে রোজ রাত্রে যায়, বাড়ির বউ-এর সঙ্গে মেশে, গাড়িতে তুলে নিয়ে বাইরে যায়। সেই যে আপনি ছোটমা’র সঙ্গে একদিন বাইরে গিয়েছিলেন না?
–তারপর?
—তারপর সেই নিয়ে হুলুস্থুল, মেজবাবু বলে—কোথায় সে। তা ভাগ্যিস আপনি তখন বাড়িতে আসেন নি! মেজমাও তত কম নয়, গিরি বললো, আমি দেখেছি। ছোটমা তখন বললেসে আমার গুরুভাই, আসে আমার কাছে, তাতে হবে কি? বড়মাও টিপ্পনি কাটলো—সে আমি বলতে পারবো না সব হুজুর, মেজমা বড়মা মিলে ছোটমাকে না-হোক কথা শোনালে। কী ঝগড়া ক’দিন, সে-সব কথা শুনলে কানে আঙুল দিতে হয় হুজুর–তা আপনি এখানে বসুন, আমি একটু বাজার ঘুরে আসছি।
সব শুনে ভূতনাথের কেমন যেন ভয় হতে লাগলো। বললেবংশী, এর পর কি আমার এ-বাড়িতে থাকা ভালো হবে রে?
বংশী চলে যাচ্ছিলো। কথা শুনে পেছন ফিরে দাঁড়ালো। বললে–সে কি শালাবাবু, সে-ব্যাপার তো মিটে গিয়েছে—এখন তো আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছি।
–কিন্তু ছোটবাবু সব শুনেছে তো?
-ছোটবাবু কি আর মানুষ আছে আজ্ঞে, শুয়ে পড়ে আছেন, ধরে খাইয়ে দিতে হয়, আবার ধরে শুইয়ে দিতে হয়, সাতেও নেই পাঁচেও নেই কারো। দুটো হাত আর দুটো পা একেবারে পড়ে গিয়েছে, অসাড়, সে আর মানুষ নামের যুগ্যি নয়, কিন্তু ছোটমা না বললে আমি তো আপনাকে চলে যেতে দিতে পারিনে।
–আজকে একবার ছোটমা’র সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারে। বংশী, একটিবার শুধু।
—তাহলে অনেক রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, তখন।
–আমাকে তুমি ডেকে নিয়ে যাবে, আমি জেগে থাকবে, কেমন?
—সে পরে যা হয় ঠিক করবো, আপনি বসুন, আমি আসছি। পালিয়ে যাবেন না আজ্ঞে—বলে বংশী দুম-দাম করে চলে গেল।
বিছানাটায় চিত হয়ে শুয়ে-শুয়ে ভূতনাথ আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলো অনেকক্ষণ। এ-বাড়ি থেকে তাকে চলে যেতে হবে ভাবলেই যেন কেমন কষ্ট হয়। এখানে শুধু কি তার আশ্রয়। শুধু কি আশ্রয়েরই লোভ! চারটে দেয়াল আর একটা নিরাপদ ছাদের প্রলোভন। আর খাওয়া! শুধুই কি তাই? আর কিছু নয়? সারাদিন ভূতের মতন পরিশ্রম করে এখানে এসে এই বিছানায় শুয়ে শান্তি পাওয়া যায় কেন? স্পষ্ট করে হয় তো যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না। কিন্তু যদি বৌঠানের আকর্ষণই একমাত্র কারণ হয়, তো বৌঠানই বা তার কে? কিসের সম্পর্ক! কি রকম সম্পর্ক! বৌঠানকে কতবার ভালো করবার চেষ্টা করেছে সে। বৌঠানও তাকে কতবার কত রকমভাবে যা তা বলেছে। বেইমান বলেছে। কিন্তু তবু যেন কোথায় একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল। বৌঠানকে সেদিন দু’হাত দিয়ে জাপটে ধরে কি সারা শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব করেনি! স্বপ্ন দেখেনি বৌঠানকে! জবা অবশ্য তার নাগালের বাইরে। কোনোদিন জবাকে পাওয়ার স্বপ্নও সে দেখতে সাহস করেনি। কিন্তু বৌঠানের বেলায় কি সেকথা বর্ণে-বর্ণে সত্যি! যাক, ভালোই হলো, সমস্ত প্রলোভন থেকে মুক্ত হয়ে, সমস্ত স্নেহভালোবাসার আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে অন্য কোথাও চলে যাবে। নতুন করে আবার শুরু হবে তার দিন। নতুন করে দিনযাপন। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে জবার গাওয়া গানটা মনে পড়লো। কোথাও যদি কখনও কোনো অন্যায় করে থাকি, আমায় ক্ষমা কোরো, তুমি আমার বিচার কোরে! তুমি নিজের হাতে আমার বিচার কোরো। সমস্ত নিখিল সংসারে যত লোকের সঙ্গে ভূতনাথ মিশেছে, যাদের ভালোবেসেছে, যারা ভালোবাসেনি, আজ সকলে তার চোখের সামনে ভিড় করে দাঁড়ালো। আন্না, রাধা, হরিদাসী, জবা, বৌঠান—কেউ বাদ গেল না। আমি সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম। হয় তো তোমাদের সঙ্গে জীবনে আর দেখা হবে না। কিন্তু আমার বিচার করো তোমরা। আমি যদি দোষ করে থাকি আমায় ক্ষমা করো না—আমায় শাস্তি দিও-সে-শাস্তি আমি মাথা পেতে নেবো।
মনে আছে—সেবার মাঘোৎসবে জবা গেয়েছিল–
আমার বিচার কর তুমি তব আপন করে,
দিনের কর্ম আনি তোমার বিচার-ঘরে।
যদি পূজা করি মিছা দেবতার
শিরে ধরি যদি মিথ্যা আচার
যদি পাপ মনে করি অবিচার কাহারো পরে,
আমার বিচার কর তুমি, তব আপন করে।
লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ
ভয়ে হয়ে থাকি ধর্ম-বিমুখ
পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ ক্ষণেক তরে,
আমার বিচার কর তুমি, তব আপন করে।
