তোমারি রাগিণী জীবন-কুঞ্জে
বাজে যেন সদা বাজে গো।
তোমারি আসন হৃদয়-পদ্মে
রাজে যেন সদা রাজে গো।
তব নন্দন-গন্ধ-নন্দিত ফিরি সুন্দর ভুবনে
তবু পদরেণু মাখি লয়ে তনু
সাজে যেন সদা সাজে গো—
জবার মেয়েও ঠিক জবার মতোই গান শিখেছে। আর সুপবিত্র? কিন্তু সে-কথা এখন থাক।
সেদিন বড়বাড়িতে ফিরে সেখানেও আর এক পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল ভূতনাথ। এ-বাড়িতেও রাজমিস্ত্রী এসেছে দলে দলে। ইটের পাহাড় জমেছে উঠোনের ওপর। চুন সুরকি চালা রয়েছে আস্তাবল বাড়ির সামনে। নোংরা চারদিকে। বালকবাবু বেরিয়ে গেল নাচঘর থেকে নথিপত্র নিয়ে। আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মতন ক’দিনেই বড়বাড়ি এক অভাবনীয় পরিণতি পেয়েছে।
বংশী এসে দাঁড়ালো—শালাবাবু—কোথায় ছিলেন ক’দিন?
উঠোনের মাঝখান দিয়ে লম্বালম্বি পাঁচিল উঠছে। ওধারে এধারে সুতো পড়েছে। পনেরো ইঞ্চি মোটা দেয়াল। মাঝখানে একটা ছ’ ফুট উচু দরজা। ইটের ওপর বালির কাজ হবে। আর দামু জমাদারের ঘরের দিকটাতেও লম্বা সীমানা টানা হয়েছে। মাঝখানে দেয়াল উঠছে সেখানেও। চারদিকে হৈ-চৈ হট্টগোল।
বংশী বললে—বাবুরা আলাদা হচ্ছে শালাবাবু, হাঁড়িও আলাদা হয়ে গিয়েছে।
ক’দিনের মধ্যে এত পরিবর্তন হয়ে গেল। কুলিরা মাথায় ইটের বোঝা নিয়ে চিৎকার করে—খবরদার—আর সঙ্গে-সঙ্গে কাঠের ভারার ওপর ঝপাং করে শব্দ হয়। ওদিক থেকে একজন মিস্ত্রী সুতো ধরে, আর এ-সীমানায় সে-সুতোর শেষ দিকটা আর একজন টান করে ধরে থাকে। ওলোন ঝুলিয়ে-ঝুলিয়ে পরীক্ষা করে বার-বার। বাঁকা-চোরা না হয়। খাড়াই ইটের পাঁচিল মাথা ছাড়িয়ে উঠবে। ও-বাড়ির লোককে এ-বাড়ির লোক দেখতে না পায়। আস্তাবল বাড়িটাও তিন ভাগ হয়েছে। এক ভাগ হিরণ্যমণির, এক ভাগ কৌস্তুভমণির আর এক ভাগ চূড়ামণির।
বংশী বলে—সব পাল্টে গেল হুজুর—বড়বাড়িতে আর মন টেকে না আমার।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করে—ছোটমা কেমন আছে বংশী?
–ভালো নেই শালাবাবু।
—একবার দেখা করতাম, অনেকদিন দেখা হয়নি। বংশীর মুখে-চোখে যেন কেমন এক রকমের দ্বিধা ফুটে উঠলো।
ভূতনাথ বললে—আজকে সন্ধ্যেবেলা যাবো’খন, খবর দিয়ে রাখিস বৌঠানকে।
বংশী বললে—কিন্তু দেখা আপনি না-ই করলেন শালাবাবু!
–কেন, শরীর খারাপ?
বংশী বললে—শরীর তো বৌঠানের ক’দিন থেকেই খারাপ চলছে, কাল একেবারে অজ্ঞান হয়ে যায়-যায় অবস্থা হয়ে উঠেছিল।
–কেন? ভূতনাথ কেমন যেন শিউরে উঠলো।
—আজ্ঞে, ক’দিন থেকে কিছু খাচ্ছেন না দাচ্ছেন না, তার ওপর খালি-পেটে ওইগুলো গেলা, ছাইভস্মগুলো পেটে গেলে আর কত সইতে পারে মানুষ, রাত্তিরে চিন্তা আমাকে ডাকতে এসেছে, আমি আবার যাই, বরফ ছিল না বাড়িতে, মেজবাবুর বাড়ি থেকে বেণীর কাছে ধার করে বরফ এনে আবার মাথায় দিই, কিন্তু সে কি থামে, শেষে সেবার যা করেছিলাম, খানিকটা তেঁতুল-গোলা জল গিলিয়ে দিলাম জোর করে, তখন ঘুমোলেন, নইলে সে কি ছটফটানি। হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে গেল, চোখ উল্টে গিয়েছিলো একেবারে।
—তুমি কেন আর ওসব দাও বৌঠানকে?
বংশী বললে—আমি কেন দিতে যাবো শালাবাবু, আমাকে আনতে বললে আমি ‘না’ বলে দেই, কত বকুনি তাই জন্যে আমার ওপর, বলে—তুই আজকাল আমাকে অমান্য করিস, টাকা না থাকলে হাতের সোনার চুড়ি, কানের গয়না খুলে দিতে আসে আজ্ঞে। একে-একে এমনি করে কত দিকে যে কত টাকা-পয়সা ছোটমা খোয়ালে কী বলবো—কোত্থেকে এ-সব আসে বলুন তো শালাবাবু!
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে–ছোটবাবু কিছু বলে না?
—আজ্ঞে ছোটবাবু তো নিজে ও-সব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু পইপই করে বারণ করেছে-মদ যেন কেউ না দেয় ছোটমাকে, ছোটমাও যখন ভালো থাকে, বলে–আমি খেতে চাইলেও দিবিনে আমাকে, কিন্তু এক-এক সময় যা করে ধরে, হাত দুটো ধরে বলে— নিয়ে আয় একটা বোতল, এই শেষবার, আর খাবো না কখখনো। জ্ঞান থাকলে অত ভালো মানুষ, আবার যখন অবুঝ হয় তখন হাতে-পায়ে ধরতে আসে, দেখে কী কষ্ট যে, হয় মনে—খানিক থেমে বংশী আবার বলে—এই তো সেদিন—সেজখুড়ি তো এখন ছোটবাবুর ভাগে, ওই যে রান্না করতে আগে বড়বাড়িতে, তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে মদ আনিয়েছে।
—কে আনলে?
—আজ্ঞে বেণী, এখন তো বেণী মেজবাবুর তরফে, সে কেন আমাদের হয়ে টানবে, পরই তো হলো ওরা। সেই খেয়েই সেদিন ওই কাণ্ড, হাত-পা খিচতে লাগলো, চোখ উল্টে গেল, গায়ে কী শক্তি শালাবাবু, আমি আর চিন্তা দুহাতে ধরে ঠাণ্ডা করতে পারিনে। মুখ দিয়ে গেঁজলা উঠে প্রাণ বেরিয়ে যায় আর কি—তা বেণীকে আমি বললাম খুব, খুব শুনিয়ে দিলাম আজ্ঞে—বললাম, আজ না হয় তোরা আলাদা, কিন্তু নুন তো খেয়েছিস ছোটবাবুর, ছোটবাবু আর মেজবাবু কি আলাদা? এক ভাই-ই তো, মায়ের পেটেরই তো ভাই।
কথা বলতে-বলতে হঠাৎ বংশী বললে—ওই যাঃ—
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কী?
বংশী বললে—কত কাজ আমার পড়ে আছে আর এদিকে আপনার সঙ্গে গল্প করছি আমি। ছোটবাবু সাবু খাবে আজ, বাজারে যেতে হবে এখুনি।
ভূতনাথ বললে—বাজারে কি আজকাল তুমিই যাও নাকি?
—শুধু কি বাজার? এই এক হাতে সব করতে হয় হুজুর। বাজার করা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, কেউ-ই তো নেই আজ্ঞে, মধুসূদনকাকা সেই যে দেশে গেল আর তো ফিরলো না, আর লোচন তো জানেন পান-বিড়ির দোকান করেছে। বেণী আর শ্যামসুন্দর গিয়েছে ওদের তরফে, আর ছুটুকবাবু সব চাকর তাড়িয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোক রেখেছে–শুধু পুরোনোদের মধ্যে আছে বড়মা’র সিন্ধু। আমাদের রান্না করে সেজখুড়ি, তা রান্নার কাজ ছাড়া সব করতে হয় আমাকে কথা বলতে-বলতে হঠাৎ হাত ধরে টান দিয়ে বংশী বললে চলে আসুন শালাবাবু, শীগগির চলে আসুন।
