আর সুবিনয়বাবু! সুবিনয়বাবুর স্তিমিত চোখ যেন এ-পৃথিবীর উধ্বে অন্য এক লোকে নিবদ্ধ হয়ে আছে। সেখানে জীবন নেই, মৃত্যু নেই, অবাঙমানসগোচর এক অলৌকিক স্বাদ! সুবিনয়বাবুর মুখে যেন সূক্ষ্ম একটা হাসির ক্ষীণ রেখা।
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভূতনাথের অনেক কথা মনে পড়তে লাগলো।
একদিন সুবিনয়বাবু বলেছিলেন–আত্মার মধ্যে পরমাত্মাকে, জগতের মধ্যে জগদীশ্বরকে দেখতে হবে, এটা খুব সহজ কথা ভূতনাথবাবু, কিন্তু এর চেয়ে শক্ত কথাও আর কিছু নেই। যেমন দেখো একটা অতি সহজ কথা—স্বার্থত্যাগ করে সর্বভূতে দয়া বিস্তার করে অন্তর থেকে বাসনাকে ক্ষয় করে ফেললেই মানুষের মুক্তি হয়—এই সামান্য সহজ কথাটার জন্যেই একটি রাজপুত্রকে রাজ্য ত্যাগ করে পথে-পথে ফিরতে হয়েছে।
আর একদিন মাঘোৎসবের শেষে বলেছিলেন—নদী যখন চলে তখন দুই কূলে কেবল পেতে-পেতেই চলে, পাওয়াই তার সাধনা, কিন্তু যখন সমুদ্রে গিয়ে পেীছোয় তখন তার দেবার পালা-দেওয়াই হয় তার ধ্যান! কিন্তু আপনার সমস্তকে দিতে-দিতে সেই যে অন্তহীন দান, সেই তত পরিপূর্ণ পাওয়া, তখন রিক্ত হয়েও আর লোকসান হয় না—আপনাকে ক্ষয় করে করেই সে অক্ষয়কে উপলব্ধি করতে পারে। এইজন্যেই সংসারে ক্ষয় আছে। মৃত্যু আছে বলেই অমৃতকে জানতে পারি, ক্ষয় আছে বলেই অক্ষয়কে বুঝতে পারি।
আজ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও যেন তাই সুবিনয়বাবুর মুখ থেকে হাসি মুছে যায়নি।
ভূতনাথ জবার দিকে চেয়ে দেখলে। জবাকে যেন একফালি চাঁদের মতো দেখাচ্ছে। তেজ নেই। কিন্তু তেমনি স্নিগ্ধ, তেমনি ছায়া-শীতল। সারা রাত জেগেছে। চেহারায় যেন একরাশ বিষণ্ণতা। ঠিক ওমনি করে ওই জায়গায় সারারাত বসে বসে কাটিয়েছে সে। কাছে গিয়ে ভূতনাথ বললে-তুমি একটু শোও গিয়ে জবা, আমি তো আছি।
কোনো উত্তর দিলে না জবা।
বাইরে আস্তে-আস্তে পুব আকাশটা ফর্সা হয়ে আসছে। ভূতনাথ দোতলার বারান্দাতেই খানিকক্ষণ দাঁড়ালো। আজ জবার সংসার যেন সকাল থেকেই অলস হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কোনো শব্দের আড়ম্বর নেই। এখানে আজ মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। তাই সমস্ত পৃথিবী যেন মুহ্যমান। সমস্ত নিখিল বিশৃঙ্খল।
পাশের ঘরে সুপবিত্র তখনও ঘুমোচ্ছিলো।
ভূতনাথ কাছে গিয়ে ডাকতে লাগলো—সুপবিত্রবাবু, সুপবিত্রবাবু–
অসহায় শিশুর মতো সুপবিত্র অকাতরে ঘুমোচ্ছিলো। ঢাকাডাকিতে ধড়ফড় করে উঠে বসলো। চারদিকে চেয়ে দেখে নিয়ে অবস্থাটা মনে পড়লো যেন। চোখ মুছতে-মুছতে বললে—বাবা এখন কেমন আছেন?
ভূতনাথ বললে—ডাক্তারবাবু এসেছেন—তেমনিই অবস্থা এখনও।
যেন খানিকটা লজ্জিত হলো সুপবিত্র মনে-মনে। জামাটা পরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিছানার দিকে নজর পড়তেই বললে— আর—আর–
–জবার কথা বলছেন? সে-ও ওখানেই আছে।
–ক’টা বাজলো?
কিছুক্ষণ আগে বলা জবার কথাটা কেমন করে বলবে আর বলবে কি না, সেই কথাটাই ভাবতে গিয়ে ভূতনাথ কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। সুপবিত্র তখন নিজের জামা-কাপড় গুছিয়ে নিয়েছে। জবার চিরুণীটা নিয়ে চুলটা আঁচড়ে নিচ্ছিলো। এই ঘরে এই বাড়িতে একদিন স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে সুপবিত্র। এখনও যে পর, দু’দিন পরেই সে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠবে।
সুপবিত্র বললে—আমাকে আগে ডেকে দেননি কেন ভূতনাথবাবু?
ভূতনাথের জবাব দেবার আগেই জবা এসে ঘরে ঢুকলো।
ভূতনাথও যেন জবাকে দেখে ভালো করে চিনতে পারলে না। ঘুমোতে-ঘুমোতে কি হাঁটা যায়! মনে হলো জবার দীর্ঘ দেহটা এখনি অবশ হয়ে পড়বে। যেন ছায়া-শরীর। রক্ত-মাংস-হীন
স্পর্শ-গন্ধ-বর্ণহীন একরাশ বিবর্ণতা।
জবা বললে—ভূতনাথবাবু–
জবার গলার আওয়াজ পেয়ে সুপবিত্ৰও এবার পেছন ফিরেছে। বললে—বাবা এখন কেমন আছেন?
ছায়া-শরীর এবার যেন ঈষৎ স্পন্দিত হলো। বললে—সুপবিত্র, তুমি এখনও যাওনি। সুপবিত্র হঠাৎ এই প্রশ্নে যেন একটু বিচলিত হলো। কী উত্তর দেবে হঠাৎ বুঝতে পারলে না।
জবাই আবার বললে—তুমি এবার বাড়ি যাও সুপবিত্র।
–বাড়ি যাবো?
সুপবিত্ৰ বুঝি এ-প্রশ্নের জন্যে রীতিমতো প্রস্তুত ছিল না।
—হ্যাঁ বাড়ি যাবে।
—কিন্তু আমার তো কোনো কষ্ট হচ্ছে না।
–না হোক, তুমি বাড়ি যাও. সুপবিত্র—আর এ-বাড়িতে কখনও এসে না। যদি পারো তো আমার কথা ভুলতে চেষ্টা কোরো—আর ভূতনাথবাবু, আপনি এবার আসুন—বাবা নেই!
৩৯. আজো ভূতনাথের মনে আছে স্পষ্ট
আজো ভূতনাথের মনে আছে স্পষ্ট। মনে আছে বৈকি! বড়বাড়ির ধ্বংসস্তুপের সঙ্গে সে-কথাও কি ভোলবার! জীবনের সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছে, তাদের ভুললে নিজেকেও ভুলতে হয় যে। সেদিন সেই অল্প-অল্প ভোরের আবছায়াতে জবার সেই স্পষ্ট প্রত্যক্ষ উক্তি যেন আজো কানে শুনতে পাচ্ছে ভূতনাথ!
বাবা নেই!
অনেকেই আজ আর নেই সত্যি। সেদিনকার সে-মানুষগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই নেই আর আজ। কোথায় সব হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। কোথায় ননীলাল। কোথায় বংশী। কোথায় চিন্তা। কোথায় গেল ছুটুকবাবু! কোথায় গেল বিধু সরকার, ইব্রাহিম আর বদরিকাবাবু! আর কোথায়ই বা গেল পটেশ্বরী বৌঠান! বড়বাড়ির সঙ্গে ভূতনাথের জীবনে যে-পরিচ্ছেদের যতি পড়েছিল, সমাপ্তির ছেদ পড়েছিল যেন জবার সঙ্গে-সঙ্গে!
আজো সে-রাস্তাটা দিয়ে চলতে-চলতে ওপর দিকে চাইলে দেখা যায়। দেখা যায় অন্য এক চেহারা। সমস্ত বাড়িটা নতুন রূপ নিয়ে সঁড়িয়ে আছে দুটো রাস্তার ঠিক মোড়ের ওপর। ওপরে জানালা খোলা থাকে। আলো জ্বলে ভেতরে। মাঝে-মাঝে গানের সুর ভেসে আসে। ভেতরে অর্গান বাজিয়ে বুঝি জবারই মেয়ে গান খায়। ঠিক সেই রকমই গলার সুর। খানিক দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। শুনতে ইচ্ছে করে দু’দণ্ড! লোভ হয় ভেতরে ঢোকবার। চলতে-চলতে গানের কথাগুলো যেন তাকে অনুসরণ করে—
