হঠাৎ সুবিনয়বাবুর যে চেতনা হলো। বললেন—কে?
অতি ক্ষীণ শব্দ।
ভূতনাথ মুখের কাছে মুখ নামিয়ে বললে—আমি, ভূতনাথ।
–জবা, জবা কোথায়?
—বাবা! জবার গলা কান্নায় বড় করুণ শোনালো। ভূতনাথ ঠে দাঁড়ালো। সামনে এসে বসলে জবা।
–মা!
সুবিনয়বাবু যেন আর দুজনের দিকে চাইলেন একবার।
—কিছু বলবেন বাবা?
তবু যেন মুহূর্ষু-দৃষ্টিতে কেমন দ্বিধা প্রকাশ করলেন। একবার চোখ বুজলেন। আবার চোখ খুললেন। চাইলেন সুপবিত্রের দিকে। চোখ দিয়ে তার স্নেহ উথলে উঠলো যেন। কিছু কথা বলতে চেষ্টা করতে গিয়েও যেন থেমে গেলেন একবার।
জবা নিচু হয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলে—কিছু বলবেন আমাকে?
সুবিনয়বাবু যেন অপরাধীর মতো একবার চাইলেন জবার দিকে।
–মা!
–বড় কষ্ট হচ্ছে?
–না। সুবিনয়বাবুর চোখ দুটো জলে ভরে এল। এবারও যেন কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। চাইলেন একবার সুপবিত্রর দিকে।
সুপবিত্রও একবার নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করলো-কিছু বলবেন আমাকে?
সুবিনয়বাবু হাত নাড়লেন।—না।
ভূতনাথ ইঙ্গিতে সুপবিত্রকে ডাকলো এবার। জবাকে বললে —আমরা পাশের ঘরে আছি, দরকার হলে ডেকো জবা।
সুবিনয়বাবু এবার যেন খানিকটা স্বস্তি পেলেন। চোখের দৃষ্টি সামান্য সহজ হয়ে এল। চোখ দিয়ে ভূতনাথকে আর সুপবিত্রকে একদৃষ্টে অনুসরণ করতে লাগলেন।
জবা তখনও বাবার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
ভোর তখনও হয়নি ভালো করে। বার-শিমলের বসতি-বিরল পাড়ায় তখনও অন্ধকার জমাট। শুধু জানালা দিয়ে পুব আকাশের দিকে চাইলে দেখা যায় যেখানটায় আকাশ মাটি ছুঁয়েছে, ওখানে যেন অন্ধকার কিছু তরল হয়ে আসছে। ভূতনাথ আবার কান পেতে শুনতে লাগলো। পাশের সুবিনয়বাবুর ঘর থেকে কোনো শব্দ কোনো চেতনার আলোড়ন কানে আসে কিনা।
জবার ঘরের প্রত্যেকটি জিনিষ লক্ষ্য করতে লাগলো ভূতনাথ। জবার টেবিলের ওপর সুপবিত্রের একটা ছবি। প্রত্যেকটি বই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি করে সাজানো। দেয়ালের আলনায় জবার শাড়িগুলো পর্যন্ত কুঁচিয়ে রাখা। কোথাও এতটুকু অপব্যয় নেই। সমস্ত রাত বসে-বসে ভূতনাথের যেন ক্লান্তি এসেছে। ভূতনাথ সুপবিত্রর দিকে চেয়ে দেখলে একবার। জবার বিছানার ওপর জবার বালিশেই মাথা রেখে সুপবিত্র অকাতরে ঘুমোচ্ছ তখন থেকে। ঘুমোলে সুপবিত্রকে জেগে থাকার মতোই কেমন অসহায় দেখায়। কেমন নিশ্চিন্ত মানুষ সুপবিত্র। এই অবস্থার মধ্যেও ঘুমোতে পারলো!
ঘড়িতে একটার পর একটা বেজে চলেছে। ভূতনাথের মনে হলো কতক্ষণে রাত শেষ হবে কে জানে! প্রতীক্ষার আলস্যে যেন অস্থির হয়ে উঠেছে ভূতনাথ।
ভোরের দিকে হঠাৎ জবা এল।
দরজা খোলাই ছিল। চেহারা দেখে ভূতনাথ যেন চমকে উঠেছে। এ-জবাকে যেন চেনা যায় না আর। সমস্ত রাতের জাগরণের পর জবার যেন হঠাৎ দশ বছর বয়স বেড়ে গিয়েছে।
ভূতনাথ অধীর আগ্রহে জিজ্ঞেস করলে—বাবা এখন কেমন আছেন জবা?
জবা কিন্তু সে-প্রশ্নের জবাব দিলে না। বললে—ডাক্তারবাবু এসে গিয়েছেন—কিন্তু সুপবিত্র! সুপবিত্র কই?
–ঘুমোচ্ছন।
–আপনি এক কাজ করুন ভূতনাথবাবু—সুপবিত্ৰকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসুন।
–না-ই বা গেলেন, থাকুন না, এখন তো ঘুমোচ্ছেন, আর বাড়িতে ওঁর মাকে তো খবর দিয়েই এসেছি।
—না, তবু আপনি ওকে জাগান।
জবার গলার আওয়াজ শুনে ভূতনাথও যেন কেমন ভয় পেলো। হঠাৎ এমন সুরে তো কখনও কথা বলে না জবা! রাত্রে এমন কী ঘটনা ঘটলো! সুবিনয়বাবু একান্তে জবাকে কী বলতে চেয়েছিলেন।
ভূতনাথ আবার একবার অনুনয় করবার চেষ্টা করলে। বললে—কিন্তু জাগিয়ে লাভ কি জবা—ঘুমোচ্ছন ঘুমোনো নামিছিমিছি—
জবা যেন এবার কর্কশ-কঠিন হয়ে উঠলো। বললে—যা বলছি আপনি করবেন কিনা?
ভূতনাথ এবার অনুরোধের ভঙ্গীতে খাট থেকে নেমে দাঁড়ালো। বললে—সুপবিত্রবাবুর তত শরীর খারাপ হচ্ছে না, আর তা ছাড়া উনিও কি এই সময়ে তোমাকে একলা ছেড়ে যেতে চাইবেন!
জবা বললে—অত কথা বলবার আমার সময় নেই ভূতনাথবাবু —যেতে না চাইলেও ওকে যেতেই হবে!
—কেন? ও-কথা বলছো কেন জবা? ওঁরও তো একটা কর্তব্য আছে!
জবা এবার যেন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে চাইলো। কিন্তু কান্নার আবেগে গলাটা বুজে এল তার। বললে-না, না, না—ওর কোনো কর্তব্য নেই।
—সে কি?
জবা এবার বাবার ঘরের দিকে চলেই যাচ্ছিলো। কিন্তু একবার ফিরে দাঁড়ালো। বললে-ভূতনাথবাবু, আপনি আর এ-সময় তর্ক করবেন না। আমার সব গোলমাল লাগছে-ওর অার কোনো কর্তব্যই নেই আমাদের ওপর, আমারও আর ওর সঙ্গে মেলামেশা ঠিক নয়।
–কেন?
জবা যেন পাগলের মতো ছটফট করতে লাগলো। বললে–ভূতনাথবাবু, দয়া করে ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসুন। ওকে বলবেন—ও যেন আর কখনও এ-বাড়িতে না আসে—কখনও না আসে।
কথাটা শুনে ভূতনাথ যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।
ততক্ষণে জবা পাগলের মতোই আবার গিয়ে সুবিনয়বাবুর ঘরে ঢুকে পড়েছে।
ভূতনাথও পেছন-পেছন গেল। সমস্ত হিসেবটা যেন গোলমাল হয়ে গেল তার হঠাৎ। জবার মুখে যেন এক অস্বাভাবিক কাঠিন্য। অথচ চোখে যেন সেই আর্দ্রতা। নিজেকে যেন অনেক কষ্টে চেপে রেখেছে সে।
সুবিনয়বাবুর ঘরে তখন নিঃশব্দ ভয়াবহতা, ডাক্তার চুপ করে বসে আছেন সুবিনয়বাবুর দিকে মুখ করে। উদগ্রীব হয়ে আছেন চরমতম মুহূর্তের জন্যে। যেন এখনি শুরু হবে অবশ্যম্ভাবী পদসঞ্চার। ছায়া-ছায়া ভোর। নীলচে অন্ধকার। ভূতনাথ ডাক্তারের দিকে উন্মুখ আগ্রহে চেয়ে দেখলে। সে-মুখে কোথাও কোনো বিরক্তি নেই, ব্যতিক্রম নেই।
