বৌবাজারের কাছে আসতেই শেয়ালদ’র মোড়। এখানটায় আললা, লোকজনের চলাচল বেশি। প্রথম যেদিন কলকাতায় এসেছিল ভূতনাথ, এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। তখন হ্যারিসন রোড হয়নি, এ রাস্তাটায় ভিড় ছিল বেশি। কলকাতা শহরের মধ্যেই কত পুকুর ছিল চারদিকে। সব একে-একে বুজিয়ে ফেলছে এখন। যত সব জঞ্জাল এনে ফেলে পুকুরের জলে। আর গন্ধে চলা দায় তার ধার-কাছ দিয়ে। মাছিগুলো টানাপাখার দড়িতে এসে বসে। একেবারে মাছিতে ঢেকে যায় সব। কালো হয়ে যায়। তারপর চো-বোশেখের ঝড়ে সেই ময়লা-ধুলো উড়ে এসে ঘরময় ছড়িয়ে যায়।
বার-শিমলের রাস্তায় পড়ে ভূতনাথ সাইকেল থেকে নামলো। এ-রাস্তাটায় এখনো আলো হয়নি। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। তবু কিছু দূরে হেঁটে গিয়েই মনে হলো যেন কয়েকটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে জবাদের বাড়ির সামনে। খবর পেয়ে সবাই বুঝি এসেছে।
দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে একটা থমথমে ভাব। অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই নাকে যেন ওষুধের গন্ধ পাওয়া গেল। তীব্র একটা গন্ধ। বড়বাড়িতে ছোটবাবুর ঘরের কাছে গেলেও এই রকম গন্ধ বেরোয় আজকাল। উপাসনা-ঘরের ভেতর ফরাশের ওপর অনেক ভদ্রলোক বসে আছেন। সবার মুখেই দাড়ি। সবাই বেশি বয়েসের লোক। চুপি-চুপি গলা নিচু করে কথা বলছেন। রূপচাঁদবাবুকেও দেখা গেল—একজন ডাক্তারের সঙ্গে কী যেন কথা বলছেন।
আর সুবিনয়বাবুর ঘরে…
ভূতনাথ একবার সুবিনয়বাবুর শোবার ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখলে।
জবা বসে আছে সুবিনয়বাবুর বিছানার পাশে। মাথার দিকে। তার পাশেই সুপবিত্র। সে-ও যেন আজ উদ্বিগ্ন। আর একজন ডাক্তার সুবিনয়বাবুর নাড়ী পরীক্ষা করছেন। সুবিনয়বাবু চিত হয়ে শুয়ে আছেন বিছানার ওপর। চোখ দুটি বোজানো।
টিপি-টিপি পায় ভূতনাথ ঘরের এককোণে গিয়ে দাঁড়ালো।
জবা যেন তার দিকে একবার চাইলে। সুপবিত্ৰও চাইলে একবার। কিন্তু কথা বেরুলো না কারোর মুখ দিয়ে।
মৃত্যু!
মৃত্যুর সঙ্গে মুখখামুখি পরিচয় ভূতনাথের আছে। কঠিন, সাদা, স্পষ্ট মৃত্যু। এত স্পষ্ট করে ভূতনাথ মৃত্যুকে দেখেছে যে একবার দেখলে আর চিনতে ভুল হয় না তার। চেনা যায় তার পুরোনো রূপ। পুরোনো পদধ্বনি। অন্ধকারের অস্পষ্ট আবহাওয়ায় কোথায় যেন আলোড়ন শুরু হয় প্রথমে। তারপর ঘন হয়ে আসে অন্ধকার। সেই ঘন অন্ধকারে তখন স্পষ্ট প্রত্যক্ষ হয়ে আসে তার চেহারা। ধীরে-ধীরে শ্বাপদ-সতর্ক পায়ে সে নামে এখানে। এখানের এই অবসাদগ্রস্ত ঘরে। তারপর চারিদিকে চেয়েচেয়ে দেখে নেয়। সেবার মানুষের মস্তিষ্কের কোষে-কোষে সে বিষ, ঢুকিয়ে দেয় অজ্ঞাতে। অন্ধ করে দেয় দৃষ্টি। সুস্থ মস্তিষ্ক করে তোলে অসুস্থ! কান্নায় কাতর হয়ে যখন সকলের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে, সকলের চিন্তাশক্তি যখন অগোছালো, তখন, সেই সুযোগে সে এসে কাছে বসে। অতি সন্তর্পণে হাত বুলিয়ে দেয় মুমূর গায়ে। ঠাণ্ডা বরফ-শীতল সে-স্পর্শ। আস্তে-আস্তে হিম হয়ে আসে দেহ। কণ্ঠরোধ হয়ে আসে ধীরে ধীরে। কথা বলতে চেষ্টা করে সে। চোখ মেলতে চেষ্টা করে সে। দু’হাত বাড়িয়ে জাপটে ধরতে চেষ্টা করে সে। চেষ্টার অবধি থাকে না তার। চোখ দুটো বার-বার লক্ষ্যহীন হয়ে আসে। অনুভূতির তীব্র আবেগে সে চিৎকার করতে চেষ্টাও করে। কিন্তু সব চেষ্টা তখন, নিষ্ফল। সব চেতনা তখন নিস্তেজ।
প্রথম মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তার সেই পোষা বেজিটার কাছে।
অবলা জানোয়ার। কিন্তু শেষকালে সে-ও যেন কথা বলতে চেষ্টা করেছিল। স্পষ্ট ভাষায় যেন জানাতে চেয়েছিল তার বেদনার কথা। দাত দিয়ে কামড়ে দিয়ে জানাতে চেয়েছিল তার শেষ ভালোবাসা। কিন্তু নিস্তেজ হয়ে এল ক্রমে। মানুষের কাছে তার নিবেদন ব্যর্থ হলো একটু শক্তির অভাবে।
আর তারপর তার পিসীমা।
প্রথম দিনটি থেকে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর পদক্ষেপ সে শুনেছে। প্রতি মুহূর্তের নিঃশ্বাস পতনে মৃত্যুর পরোক্ষ স্পর্শ সে পেয়েছে। কেমন করে শিথিল হয়ে আসে শিরা-উপশিরা, কেমন করে আলো নিবে আসে চোখের, কেমন করে এ জগতের সমস্ত চেতনা সমস্ত অনুভূতি একে-একে লুপ্ত হয়ে যায়, তার হিসেব ভূতনাথের মুখস্ত! বেজিটার মতন পিসীমা’র দেহও তার হাতের ওপর একদিন ঠাণ্ডা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই হাতের স্পর্শে এখনও সে-অনুভূতি খুঁজলে পাওয়া যাবে বুঝি। মানুষের সমস্ত চেষ্টা, সমস্ত আবেদন-নিবেদন, মানুষের সমস্ত ভালোবাসা এক সময়ে কেমন করে মূল্যহীন হয়ে যায় ভূতনাথের তা কণ্ঠস্থ!
তা ছাড়া আর একটা অভিজ্ঞতাও আছে। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা নয়, অনুভূতি!
সে রাধার মৃত্যু! মৃত্যু নয়, মৃত্যুর সংবাদ। মৃত্যুর সংবাদ এমন করে যে অসাড় করে দিতে পারে মনকে, সে-ও এক বিচিত্র অনুভূতি! সেদিন মনে হয়েছিল সমস্ত বুকটা যেন খালি ঠেকছে, সমস্ত আবেগ যেন নিথর হয়ে গিয়েছে, সমস্ত জীবন যেন নিঃশেষ!
আজ সুবিনয়বাবুর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে লোকজন, ডাক্তার, বরফ, ওষুধের তীব্র গন্ধের মধ্যেও যেন সেই পুরোনো স্মৃতি ফিরে পেলে ভূতনাথ। সেই কঠিন, সাদা, স্পষ্ট আর নিষ্ঠুর মৃত্যু! অভিযোগহীন, প্রতিকারহীন, অবধারিত এক দুর্ঘটনা!
ক্রমে রাত অনেক হলো। একে-একে কখন সবাই চলে গিয়েছেন। ডাক্তারও নিজের কর্তব্যের শেষটুকু সমাধা করে খানিকক্ষণের জন্যে বিদায় নিয়েছেন। সুপবিত্র আর জব পাথরের মূর্তির মতো ওপাশে বসে আছে। ভূতনাথ একমনে সুবিনয়বাবুর মাথায় বরফ দিচ্ছিলো। হাতে কাজ করে চলেছে ভূতনাথ, কিন্তু কোথায় যেন রাত্রের অন্ধকারে এক অশরীরী মূর্তির আবির্ভাবের আশঙ্কায় কম্পমান। একটু অসতর্ক হলেই যেন সে আসবে। সমস্ত চেষ্টাকে শিথিল করে দিয়ে চলে যাবে এক মুহূর্তে!
