—আজ্ঞে, আমাকে ডাকছিলেন?
রূপচাঁদবাবু থমকে দাঁড়ালেন—এই তো, আপনাকে খুঁজছিলুম, শুনেছেন সুবিনয়বাবুর অসুখ!!
–সুবিনয়বাবুর অসুখ? আমি তো কালকেও গিয়েছিলাম, কোনো খারাপ কিছু দেখিনি তো তখন।
-হ্যাঁ, এইমাত্র খবর পেলাম, অবস্থা বড় খারাপ, আমাদের সমাজের সবাই গিয়েছেন, আমি যাচ্ছি এখন, আপনি যাবেন নাকি?
সুবিনয়বাবুর অসুখের খবর শোনার সঙ্গে-সঙ্গে জবার কথাটা মনে পড়লো ভূতনাথের। বললে—আমার তো একটু দেরি হবে, একটু বাকি আছে, ভাউচারগুলো বুঝিয়ে দিয়েই যাচ্ছি।
–তবে আমি যাই, আপনি আসুন।
৩৮. রূপচাঁদবাবু চলে গেলেন
রূপচাঁদবাবু চলে গেলেন। ভূতনাথের কেমন ভয় করতে লাগলো। আর মাত্র ক’দিন বাকি ছিল জবার বিয়ের। প্রায় সব তোড়-জোড় হয়ে গিয়েছে। বিয়ের নিমন্ত্রণের চিঠি পর্যন্ত তৈরি। ঠিক এই সময়ে সুবিনয়বাবুর অসুখ! ভাউচার মিলিয়ে হিসেব বুঝিয়ে দিতেও দেরি হলে অনেক। টাকা-কড়ির ব্যাপার, অত তাড়াহুড়ো করলে চলে না।
সরকারবাবু বলে—আপনাদের কী মশাই, আপিস থেকে বেরিয়ে গিয়েই খালাস,কিন্তু আমার এখনও বসে-বসে সব মিলিয়ে তবে ছুটি। রাত্রে বাড়ি গিয়েও এক-একদিন ভালো ঘুম হয় না।
ভূতনাথের তখন অত কথা ভাববার সময় নেই। জবার কথাই বার-বার মনে পড়ছিল। যদি ভালোয়-ভালোয় এখন অসুখটা সেরে যায় শীগগির, তবেই বিয়েটা নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হবে। জবার বিয়েতে ভূতনাথেরই কি কম দায়িত্ব! বাইরের কাজগুলো তো সব ভূতনাথকেই করতে হবে।
সুবিনয়বাবু বলেছিলেন—তোমাকেই সব ভার নিতে হবে ভূতনাথবাবু।
জবা বলেছিল—ছুটির জন্যে আপনি ভাববেন না, বাবা রূপচাঁদবাবুকে বলে দেবেন।
তা সত্যি কথা। ছুটির জন্যে বিশেষ ভাবনা তারও ছিল না। সুবিনয়বাবুর কথাতেই মাত্র তার মাইনে বারো টাকা। আর সব বিল ক্লার্ক তো সাত টাকা করেই পায়।
সুবিনয়বাবুর বাড়িতে এই প্রথম বিয়ে। তার অনেক দিনের সাধ। উৎসব অনেকবার সুবিনয়বাবু করেছেন। প্রত্যেক বছরেই মাঘোৎসব হয়। সেদিন জবাই সমস্ত করে। সমাজের প্রত্যেকটি লোকই সেদিন আসে। অত লোকের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন, আপ্যায়ন আর উপাসনা। কতদিন ভূতনাথ সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কাটিয়েছে জবাদের বাড়ি। দলে-দলে ছেলেরা আসে, মেয়েরা আসে। কুড়ি বাইশ বছরের মেয়েরা ঘোমটা না দিয়ে আসে। কোথাও আড়ষ্টতা নেই। ভূতনাথেরই বরং লজ্জা করে তাদের দিকে চোখ তুলে কথা বলতে। দামী দামী শাড়ি পরা, ব্লাউজ পরা। মাথায় সিঁদুর নেই। সেদিন ফুল দেবদারু পাতা দিয়ে সাজানো হতো বড় হ-ঘরটা। ফলাহারী পাঠক তখন ছিল। ‘মোহিনী-সিঁদুর’-আপিস সেদিনটা বন্ধ থাকতো। চাকর দাবোয়ানদের নিয়ে ভূতনাথ বাড়ি সাজাবার ভারটা নিতে। ঢালোয়া খিচুড়ি রান্না হতো সকলের জন্যে। গান হতে কত রকমের। একবার একটা গান হয়েছিল। সবটা বেশ মুখস্ত আছে এখনও।
ভুবন হইতে ভুবনবাসী এসে আপন হৃদয়ে।
হৃদয়মাঝে হৃদয়-নাথ, আছে নিত্য সাথ-সাথ,
কোথা ফিরিছ দিবারাত, হের তাঁহারে অভয়ে।
হেথা চির আনন্দধাম, হেথা বাজিছে অভয় নাম।
হেথা পূরিবে সকল কাম, নিভৃত অমৃত-আলয়ে। সুরটাও বেশ চমৎকার। জবা সামনে বসে সকলের সঙ্গে গাইছিল।
ভূতনাথ পরে জিজ্ঞেস করেছিল—এটা কী সুর জবা, শুনতে বেশ চমৎকার তো!
জবার কাছেই শুনেছিল, সুরটা নাকি—বড়হংস সারঙ্গ।
আর একটা গান ছিল—আশা ভেঁরো—
তোমারি নামে নয়ন মেলিনু, পূণ্য প্রভাতে আজি;
তোমারি নামে খুলিল হৃদয়-শতদল-দলরাজি।
তোমারি নামে নিবিড় তিমিরে ফুটিল কনক-লেখা;
তোমারি নামে উঠিল গগনে কিরণ-বীণা বাজি।…
শেষটা আর মনে নেই ও-গানটার।
এবারেও মাঘোৎসব হবার কথা ছিল জবার বিয়ের পর। কিন্তু অসুখ হয়ে সব যেন গোলমাল হয়ে গেল। এখন কোথায় রইল জবার বিয়ে। সেবারও অসুখ হয়েছিল সুবিনয়বাবুর। সারতে কিছুদিন সময় লেগেছিল, এবারের অসুখটায় যদি তেমনি অতদিন সময় লাগে তো জবার বিয়ে নিশ্চয়ই পেছিয়ে যাবে।
কোথায় ভবানীপুর আর কোথায় বার-শিমলে।
সাইকেল করে যেতে-যেতে ভূতনাথের অনেক কথাই মনে পড়ে। এতক্ষণ রূপচাঁদবাবু নিশ্চয়ই পৌঁছে গিয়েছেন। সেবার সুপবিত্র ডাক্তার আনতে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূতনাথকেই করতে হয়েছিল সব এবারও করতে হবে নিশ্চয়ই। বাড়ির আত্মীয়স্বজন বলতে তো আর কেউ নেই কোথাও। এক সুপবিত্র আছে। তা সে-ও একটু নিরীহ প্রকৃতির। বেশি কথা বলে না। চুপচাপ শোনে সব। কাজ করবার আগ্রহও আছে তার, কিন্তু একটু লাজুক। এতদিনের প্রতীক্ষার পর তা-ও যদিই বা সমস্ত স্থির, এই সময়ে এমন বাধা।
গলি-ঘুঁজি দিয়ে চলতে চলতে এক-এক জায়গায় নেমে দাঁড়াতে হয়। দু’পাশে নর্দমা, রাস্তার মাঝখানে টিমটিমে আলো জ্বেলে একটা গরুর গাড়ি হয় তো দাঁড়িয়ে আছে। দোকানের সামনে মাল নামাচ্ছে। এ-পাশে একটা বয়া-তবলার দোকান, তার পাশে হরিণের চামড়া, বাঘের চামড়া, ভালুকের চামড়া ঝোলানো। রাস্তার ওপরেই লোহার উনুন জ্বেলে কেউ রান্না চড়িয়ে দিয়েছে। অত রাত্রেও রাস্তার কলের জলের সামনে ভিড় কমেনি। কোনো জায়গায় রাস্তার গ্যাসের আলোর তলায় বসে দাবা খেলা জুড়ে দিয়েছে বুড়োরা। আরো পঞ্চাশজন ঘিরে তাদের হার-জিত লক্ষ্য করছে। খেলার সমালোচনা করছে। দাঁড়িয়েছে রাস্তা জুড়ে, চলবারই উপায় রাখেনি।
সাইকেল-এর ঘণ্টা বাজিয়ে সাবধানে চলতে হয়।
কেল্লায় তোপ পড়লো একটা। তবে তো বেশি রাত হয়নি। কিন্তু এখনও যে অনেকদূর। সাইকেল চালাতে-চালাতে পা ব্যথা করে আসে ভূতনাথের। এই সাইকেলই যখন প্রথম উঠলোহ করে দেখতে লোকে। অবাকও হতো। দুটো চাকার ওপর দিয়ে চালানো, মনে হতো পড়ে তো যায় না। শাশা করে চলতো সব। সাইকেল দেখে ভয়ে দু’পাশে সরে যেতে লোক। ধাক্কা দিয়ে চাপা দিলে আর রক্ষে থাকবে না। ক্রিং-ক্রিং ঘণ্টার বাজনা। শব্দ শুনে বাড়ির ছেলে মেয়েরা কাজকর্ম ফেলে জানালায় এসে দাঁড়াতে একদিন। এখন বদলে গিয়েছে সব। এখন কেউ ফিরেও চায় না।
