—কে দত্তমশাই?
—নটেবাবু, এত বড় একটা কাণ্ড ঘটে গেল, চুনীর তো প্রাণ নিয়েই টানাটানি, হাজার-হাজার টাকার ওষুধ খরচাই হয়ে গেল, আমরা তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, ছোটবাবু তো একবার দেখতেও এল না।
বাধা দিয়ে চুনীদাসী হঠাৎ বললে—ছোটকর্তা এখন কেমন আছে ভালোমানুষবাবু?
হেলান দিয়ে বসেছিল চুনীদাসী। শান্তিপুরী শাড়ির জরির আঁচলটা বুকের ওপর লোটাচ্ছে। এতক্ষণে ভালো করে দেখে ভূতনাথের মনে হলো যেন একটু দুর্বলই দেখাচ্ছে চুনীদাসীকে! নাকের হীরের নাকছাবি, পাউডার আর গয়নার জৌলুশে এতক্ষণ বোঝ যায়নি ভালো করে। জিজ্ঞেস করলে–ডাক্তার কি বলে?
–বলে আর সারবে না।
—সে কি কথা ভালোমানুষবাবু, দেখে না বুঝি কেউ? ছোটবৌ কি সেবা-যত্ন করে না ভালো মতন?
চুনীদাসীর চোখ দুটো যেন করুণ হয়ে উঠলো। বললে— অন্যবার অসুখের সময় আমার কাছে এলেই সেরে উঠতো। তা আমি আর কী করবো ভালোমানুষবাবু—আমার এমন করে হাত-পা বাঁধা না থাকলে একবার গিয়ে নিয়ে আসতাম আমার বাড়িতে।
বৃন্দাবন ঝাঁজিয়ে উঠলে—তুমি আর বকো না চুনী, দত্তমশাই কি সাধ করে বলে—দত্তমশাই ছিল বলে এ-যাত্রা বেঁচেছে, মনে থাকে যেন।
সে-কথায় কান না দিয়ে চুনীদাসী বললে–রোগ শুধু ওষুণে সারে না ভালোমানুষবাবু, সেবা চাই, যত্ন চাই। বড়বাড়িতে সেবা যা হবে তা তো বুঝতেই পারছি, আমি তো ওখানে ছিলাম, সব জানি। দিনের বেলা বউদের দেখা করবার হুকুম নেই। যা করে সেই বদমাইশ বংশীটা-ওটাকে দেখতে পারি নে দু’চক্ষে।
বৃন্দাবন বললে—এই দেখুন না শালাবাবু, দত্তমশাই ছিল বলেই না আবার আমার চুনীর গাড়ি হয়েছে–গয়না হয়েছে, ছোটবাবুর ওপর ভরসা করে থাকলেই হয়েছিল আর কি! চলে, চুনী, দত্তমশাই বোধহয় এতক্ষণ এসে গিয়েছে।
চুনীদাসী বললে—একটা কাজ করবে ভালোমানুষবাবু!
—কী কাজ?
—ছোটবাবু যখন মদ খাবে, তখন একটা ওষুধ খেতে দেবো মদের সঙ্গে-বরাবর খেতে সেইটে ছোটকর্তা।
ভূতনাথ বললে-মদ তো আর খায় না ছোটকর্তা, ছেড়ে দিয়েছে।
–ছেড়ে দিয়েছে?
বৃন্দাবনও অবাক হয়ে গেল।—ছেড়ে দিয়েছে?
–হ্যাঁ, ছোটবাবু মদ ছোঁয় না পর্যন্ত—ডাক্তার বারণ করেছে, বলেছে মদ খেলে আর বাঁচবে না।
কথাটা শুনে দুজনেই যেন কিছুক্ষণের জন্যে কথা বলতে পারলে। যেন মনে হলো মর্মান্তিক আঘাত পেলে।
বৃন্দাবন বললে—শিবের বাবার সাধ্যি নেই এ-রোগ সারায়।
চুনীদাসী কিছুই বললে না।
বৃন্দাবন বললে—চলো, চলো, দত্তমশাই বোধহয় হা-পিত্যেশ করে বসে আছে এখন।
যাবার সময় চুনীদাসী একটা কথাও বললে না। যেন নির্বাক হয়ে গিয়েছে খবরটা শুনে। গাড়িটা হুশ করে চলে গেল ধোঁয়া উড়িয়ে। অথচ সেবারে দেখা হলে বারবার করে আসতে বলেছিল ভূতনাথকে। না-আসতে বলেছে ভালোই হয়েছে। সেদিনকার সেই নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় কী করে যে শেষ পর্যন্ত বড়বাড়িতে এসে পৌচেছিল ভূতনাথ, তাই একটা আশ্চর্য ঘটনা। সমস্ত কলকাতাময় যেন ঘুরে বেড়িয়েছে সে। সমস্ত ইতিহাসটা যেন প্রদক্ষিণ করেছে। শেষে মেছোবাজারের সেই গুণ্ডাপাড়ার কাছে এসে যখন নিশানা পেয়েছিল তখনই ফিরে এসেছিল বড়বাড়িতে। বাড়িতে যখন এসে পৌঁছেছিল তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মেজবাবুর গাড়ি তার আগেই এসে পৌঁছে গিয়েছে। ছোটবাবু তখনও আসেনি। ব্রিজ সিং গেট-এ দাঁড়িয়ে তুলছিল। সাড়া পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল—কোন্ হ্যায়?
বংশী এসে সব দেখে-শুনে মাথায় বরফ দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে দিয়েছিল। বললে—কী সব্বনাশ করেছিলেন আজ্ঞে, বলুন তো?
ভূতনাথ বললে—ওরা পালিয়েছে?
–কারা?
–যারা আসছিল পেছন-পেছন—গুণ্ডারা?
—কেউ তো আসেনি।
ভূতনাথের যেন তখনও মনে হচ্ছিলো মেছোবাজারের কাফ্রি গুণ্ডারা সেই রাত্রে তখনো তার পেছন-পেছন আসছে। যেন তাদের পায়ের শব্দ বাজছে কানে। তাদের ফিসফিস আওয়াজ, গুজগুজ, ফুসফুস। সমস্ত রাত্রির নিস্তব্ধ প্রহর গুলো তখন যেন থমথম করছে থেকে-থেকে। বুকের ধড়ফড়ানি থামেনি তখনও।
এ-সব বেশি দিনের কথা নয়। কিন্তু সেই বড়বাড়ি দেখতেদেখতে কী হয়ে গেল। কেন যে কার পরামর্শ শুনে কয়লার খনি কিনতে গেল চৌধুরীবাবুরা। মধুসূদন তখন ছিল। যেবার কয়লার খনি কেনা হলো সেবার খনি দেখতে গিয়েছিল সে।
মেজবাবু বলেছিল—এখনও তো কিছুই হয়নি, সবে খুড়ছে।
মধুসূদন বললে—তাই-ই দেখবো হুজুর, কেমনভাবে কয়লা ওঠে—এই সব।
তা শেষ পর্যন্ত ছুটি নিয়ে গেল মধুসূদন। ফিরে এল একদিন পরেই। বললে—কিচ্ছু হয়নি শালাবাবু, এখন শুধু আপিস বসেছে, মাপ-জোপ হচ্ছে চারিদিকে, জল তুলে ফেলছে নলে করে আর হাজার-হাজার কুলি মাটি খুড়ছে কেবল—আর চারদিকে শুধু মাঠ, ধোঁয়া, আর কালো-কালো ধুলো।
—ধোঁয়া কেন?
–কাঁচা কয়লা পোড়াচ্ছে যে চারদিকে—সেই কয়লায় রান্না হবে।
—তোর কোথায় খাওয়া-দাওয়া করলি?
-রান্না করলুম মাঠের ধারে, একবেলা তো ছিলুম, শুধু, কপিকল বসবে, ইঞ্জিন চলবে, এখন অনেক দেরি, মাটির ভেতর কুলিরা সব নামবে—নেমে কাজ করবে, ওখানে দিনরাত কাজ হয় কি না!
মধুসূদন সুখচরে আগে গিয়েছে, এখন আবার বাবুদের কয়লার খনিও দেখে এল। তা সেই কয়লার খনি তারপর যে এমন করে ফেল মারবে কে ভাবতে পেরেছিল। কত লক্ষ টাকা জলে চলে গেল শুধু-শুধু। ঘরে এল না একটা পয়সা।
ভাবতে-ভাবতে অনেক দেরি হয়ে গেল। সরকারবাবু হঠাৎ বললে—ওই বাবু এসে গিয়েছেন।
–কই?
—গাড়ির বাজনা শুনছেন না!
সত্যিই রূপচাঁদবাবু এলেন। গাড়ি থেকে নেমে বললেন–ভূতনাথবাবু কই?
