-কিন্তু কেন এমন হলো রে বংশী?
বংশী বললে—সত্যি মিথ্যে জানিনে শালাবাবু, শুনছি তত বাবুদের কয়লার ব্যবসা ফেল পড়েছে, কে জানে, ওদিকে খাজাঞ্চীখানায় পাওনাদারের ভিড় দেখেন না–দিনরাত হা-পিত্যেশ করে লোক ধতে দিচ্ছে। শুনছি নাকি বাবুরা বাড়ি বিক্রি করে দেবে–সত্যি মিথ্যে ভগমান জানেন।
–কিন্তু তা হলে যাবে কোথায় সব? এতগুলো লোক, দুটো দশটা তো নয়!
বংশী যেন হতাশায় হাত দুটো চিত করে ফেললে। বললে–ছুটুকবাবু তো পাথুরেঘাটায় গিয়ে উঠবে, এই বলে রাখছি আপনাকে শালাবাবু, দিনরাত তো দত্তমশাই আসছে সেই বিয়ে হওয়া এস্তোক, ছুটুকবাবুও শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে এক-একদিন রাত কাটিয়ে আসে, এমন তো কখনো দেখিনি বড়বাড়িতে, এত বছর কাটিয়ে দিলাম এখানে—তা ছুটুকবাবুই কয়লার ব্যবসা ধরালে, শেষকালে ওই ব্যবসাতেই গেল তো–মেজবাবু-ছোটবাবুর তত ইচ্ছে ছিল না আজ্ঞে।
–তুমি ঠিক ভালোরকম জানো, কয়লার ব্যবসা ফেল হয়েছে?
—লোকে তো বলে আজ্ঞে।
–কোন লোক?
—আমাদের আর জানতে কি কিছু বাকি থাকে শালাবাবু, বালকবাবু যখন অত ঘন-ঘন আসা-যাওয়া করছে তখনই বুঝেছি একটা কিছু অনখ বাধবে, তারপর সেদিন অত খাওয়া-দাওয়া হলো! মারোয়াড়ীবাবুরা আসছে যাচ্ছে, আর তো কই আসতে দেখি না, ভৈরববাবু তো তেমন আসে না আজকাল, আজকাল তেমন পায়রাও ওড়ায় না মেজবাবু।
—তা মেজবাবু কোথায় যাবে?
–আজ্ঞে, মেজবাবুর ভাবনা কী? মেজবাবুর শ্বশুরের তিরিশখান বাড়ি কলকাতায়, ছেলে নেই তো, মেজমা’ই একমাত্র মেয়ে, তাই দেখেন না, নাতিরা সারা বছরই দাদামশাই-এর কাছে থাকে, আজকাল তো সেখানেই লেখাপড়া করছে, সেখানেই থাকে, শ্বশুরের সম্পত্তি সবই তো মেজবাবু পাবে। ভাবনা তো ছোটবাবু আর ছোটমা’র জন্যে শালাবাবু, কোনো কিছুতে নেই, অথচ যত দুখ-কষ্ট সব ছোটবাবুরই। তাই তো দেখি-ছোটবাবু দিনরাত শুয়ে পড়ে আছে, কাছে গিয়ে পায়ে হাত বুলিয়ে দিই আর মানুষটাকে দেখে চোখ ফেটে জল পড়ে, কী বাবুই ছিল আজ্ঞে, একখানা কাপড় দু’বার পরতো না কখনও, একখানা পাঞ্জাবী দু’বার গায়ে দিতো না, সেই মানুষের এখন কোনো দিকে নজর নেই, ময়লা ময়লাই সই, আগে ভালো গিলে না হলে আমায় জুতো-পেটা করতো ধরে। সেই মানুষকে একবার দেখে আসুন গিয়ে, শুয়ে আছে যেন শিব একেবারে, সাক্ষাৎ শিবের মতন শুয়ে পড়ে আছে। তাই তো পা দুটো মাথায় ঠেকিয়ে এক-একবার হাউহাউ করে কেঁদে ফেলি—আর থাকতে পারিনে আজ্ঞে।
ভূতনাথেরও তাই মনে হয়, এ আর ক’দিন! যখন সবাই এবাড়ি ছেড়ে চলে যাবে! কিন্তু একমনে কাকে লক্ষ্য করে যেন ভূতনাথ তার একান্ত প্রার্থনা জানায়—তেমন ঘটনা যেন চোখে দেখতে হয়—তেমন দৃশ্য দেখবার আগে যেন এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে সে! সে বড় মর্মান্তিক যে!
সেদিন আরো মর্মান্তিক লাগলো আর একটা ঘটনা। ঠিক মৌলালির কাছে। সামনে একটা গাড়ি আসছিল। সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াতেই যেন অবাক লাগলো। সন্ধ্যেবেলা। ভালো করে অন্ধকার হয়নি। তবু আশে পাশের দোকানে রাস্তায় আলো জ্বেলে দিয়েছে। সাইকেল-এর বাতিটাও জ্বলতে হবে। মোড়ের একটা পান-বিড়ির দোকানে দেশলাই কেনবার জন্যে দাঁড়ালো গিয়ে।
পেছন থেকে কে যেন হঠাৎ এসে ডাকলে—শালাবাবু!
পেছন ফিরে চেহারা দেখেই অবাক হবার কথা! অথচ এমন চেহারা চিনতে না পারাই তো উচিত। সে-চেহারাই বদলে গিয়েছে বৃন্দাবনের। ছোট বড় করে চুল ছাঁটা। মুখে পান। পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন কামানো মুখ।
ভূতনাথ বললে—তুমি? বৃন্দাবন?
–আজ্ঞে, যাচ্ছিলাম রাস্তা দিয়ে, দেখলাম কিনা আপনাকে, চুনীদাসী বললে—ভালোমানুষবাবু না?
ভূতনাথ বললে—চুনীদাসী? কোথায়?
–ওই তো।
ভূতনাথ এদিক-ওদিক চেয়ে কোথাও দেখতে পেলে না চুনীদাসীকে।
—ওই যে শালাবাবু, গাড়িতে বসে আছে।
এতক্ষণে দেখা গেল। নীল রং-এর একটা মোটরগাড়ি। তারই এক কোণে বসে আছে।
—চলুন, আপনাকে ডাকছে যে চুনীদাসী।
সাইকেলটা হেলান দিয়ে রেখে ভূতনাথ মোটরের কাছে গেল। চুনীদাসীকে দেখেও অবাক হয়ে গেল ভূতনাথ। এত গয়না, এত তো ছিল না আগে! মোটরগাড়ি আবার কিনলে কবে! বৃন্দাবনের পোষাক-পরিচ্ছদেরও বাহার বেড়েছে।
চুনীদাসীর হাতে রূপোর পানের ডিবে। গাল ভরা পান। মুখ বাড়িয়ে পানের খানিকটা পিক ফেলে হাসতে-হাসতে বললে— হাগা ভালোমানুষবাবু, আমাদের চিনতে পারো?
ভূতনাথ কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল। মুখে একটা হাসি আনবার চেষ্টা করতে গিয়েও যেন কেমন বিকৃত হয়ে গেল মুখটা।
—আমি তো মরে গিয়েছিলুম একেবারে ভালোমানুষবাবু, মাস দুই হাসপাতালে ছিলুম, এখন ক’দিন হলো উঠতে পেরেছি। ডাক্তারে বলে একটু করে গঙ্গার হাওয়া খেতে, তাই বেড়াতে গিয়েছিলাম—তা সেই যে গিয়েছিলে আমার বাড়ি—বলি আর একবার কি আসতে নেই?
ভূতনাথ আমতা-আমতা করে বললে-একেবারে সময় পাওয়া যায় না…বড় খাটুনির চাকরি।
বৃন্দাবন বলে—আগে তবু বড়বাড়ির খবর-টবর পেতাম মধুসূদন খুড়োর কাছে, কি লোচনের কাছে—তা এখন আর তারও উপায় নেই। মধুসূদন খুড়ো আর আসছে না দেশ থেকে।
—লোচন তো পানের দোকান করেছে বড়বাজারে।
—তা করবে না কেন শালাবাবু, কাজ গুছিয়ে নিয়ে সরে পড়েছে সে–তা এখন কে কাজ করছে ওদের জায়গায়?
বিনা লোকেই চলছে। বৃন্দাবন হা হা করে হাসতে লাগলো—তখনই চুনীকে বলেছিলাম, ছোটবাবু-ছোটবাবু করেছিলে এখন দেখ—দত্তমশাই সত্যি কথাই বলে।
