ভূতনাথ রেগে গেল। বললে—এরকম আর কখনও করো না বৌঠান—যদি করো আর কখনও তোমার কাছে আসবে না।
বৌঠান তখন অঝোরে কাঁদতে শুরু করেছে। চুপ করে বসে চোখ বুজে আছে। আর দুই গাল বেয়ে ঝর-ঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছে। ভূতনাথ তখনও দুই হাতে ধরে রয়েছে বৌঠানকে। হাত দুটো ছেড়ে দিলেই যেন বৌঠান পড়ে যাবে। যেন অবশ হয়ে গিয়েছে বৌঠানের সারা শরীর। বললে—আর একদিন সত্যি যাবে ভূতনাথ বরানগরে।
ভূতনাথ বললে—কবে যাবে বৌঠান?
বৌঠান বললে-ছোটবাবু একটু ভালো হোক, এখন বড় ভয় করে..কখন ছোটকর্তার কী হয়—সারাদিন ও-মানুষ রোগে কাতর হয়ে পড়ে থাকে, মনটা কেমন যেন করে-মাঝে কখনও যদি ডাকেন..আজকাল বড় ডাকেন আমাকে, অনেক কথা বলেন।
আমি বলি—কিছু ভয় নেই, তুমি আবার সেরে উঠবে।
ছোটকর্তা বলে—আমি হয় তো আর সারবো না ছোটবউ!
আমি বুঝিয়ে বলি—তোমাকে যে সেরে উঠতেই হবে, নইলে আমার পূজো-উপোস-ব্ৰত সব মিথ্যে হবে যে!
এক-একদিন যখন আমার মুখে গন্ধ পান, তখন ওঁর চোখ দুটো কঠোর হয়ে আসে, বলেন—তুমি এখনও ওটা ছাড়তে পারেনি।
আমি বলি—কী করে ছাড়বো তুমি বলে দাও?
—নিজের মনের জোরেই ছাড়তে হবে, তোমার ইচ্ছে না হলে কেউ ছাড়াতে পারবে না।
সেইদিন থেকে চেষ্টা করি কতরকম ভাবে। বার-বার যশোদা দুলালের পায়ে লুটিয়ে পড়ি, কত কাদি, তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ি, পোড়া চোখে ঘুমও তো আসে আমার, কিন্তু আবার এক সময় সব প্রতিজ্ঞা, সব কল্পনা ধুয়ে-মুছে যায়, তখন স্বামী, সংসার, আমার যশোদাদুলাল সকলের কথা ভুলে যাই। মনে হয়, যেন কতদিন ঘুমোইনি, কতকাল খাইনি, তখন নিজেই বোতলটা পেড়ে নিয়ে, একটু খাই—আবার কাঁদি, আবার অনুতাপ হয়।
বৌঠান আবার বললে-যা ভূতনাথ, ওই সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে যা। আজকের মতো শেষবার খাবো, কাল থেকে আর ও ছোঁবো না—কথা দিচ্ছি তোকে।
কিন্তু সিন্দুক খুলে ভূতনাথ সেদিন কম অবাক হয়নি। আর একদিন এমনি নিজের হাতে ভূতনাথ সিন্দুক খুলে সুবিনয়বাবুর দেওয়া পাঁচ শ’ টাকা রেখে দিয়েছিল। সেদিন সে-সিন্দুকের ভেতর কত ঐশ্বর্য দেখে চোখ ঝলসে গিয়েছিল ভূতনাথের। কত গয়না, কত মোহর অগোছালো ভাবে ছড়ানো ছিল চারিদিকে। আজ যেন মনে হলো অনেকটা খালি। অন্ধকারে ভালো করে দেখা যায় না। তবু অনেক খুঁজেও যেন কোথাও টাকা পাওয়া গেল না।
ভূতনাথ বললে—টাকা তো নেই বোঠান এখানে!
—নেই? বলে বৌঠান নিজেই এবার নেমে এল পালঙ থেকে। বললে–সামনেই রয়েছে আর দেখতে পাসনে তুই ভূতনাথ–কিন্তু নিতে গিয়ে বৌঠানও যেন কেমন অবাক হয়ে গিয়েছে। বললে— কোথায় গেল বল তো! এই রূপোর বাটিতেই তো থাকতো। বোঠানও অনেক খুজলো। শেষে বললে-“থাক গে, দরকার নেই, রাত হয়ে যাচ্ছে, এইটে নিয়ে যা। কানের একটা মুক্তোর ফুল দিয়ে বললে—এইটেই নিয়ে যা তুই।
–ওই মুক্তোর ফুল? ওর যে অনেক দাম বৌঠান?
–তা হোক, ওরকম কত আছে, বেঁচে থাকলে আরো কত হবে, তুই আর ‘না’ করিস নি ভূতনাথ, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ভূতনাথ বিস্ময়ে অবাকই হয়েছিল সেদিন। কিন্তু বৌঠানের আদেশ অমান্য করবার সাহস তার ছিল না। সেই রাত্রে স্যাকরার। দোকানে কেমন করে ফুলটা বাধা দিয়ে টাকা এনেছিল তা আজো মনে আছে। বৌঠানের ঘরে বোতলটা দিয়ে যখন ফিরে যাচ্ছে। তখন রাত বেশ গভীর হয়েছে।
আস্তে-আস্তে বাইরে পা দিতেই কে যেন পেছন থেকে বলে উঠলো—কে?
মেজবাবুর গলার মতন অওয়াজ।
এক নিমেষে অন্ধকারের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে ভূতনাথ চোরকুরির মধ্যে পালিয়ে এসেছিল। কিন্তু মেজবাবু তখনও হাঁকডাক দিচ্ছে—কে গেল ওদিকে? কে?
চোরকুরির মধ্যে ঢুকেও যেন বুকের সে অস্থিরতা থামেনি ভূতনাথের সেদিন। যদি এখনি ধরা পড়ে যেতো! যদি কেউ দেখতে পেতো! সর্বনাশটার সবটুকু কল্পনা করতে গিয়ে বারেবারে বিছানায় শুয়েও শিউরে উঠেছিল ভূতনাথ। কিন্তু মেজবাবু এমন সময়ে বাড়ির অন্দরমহলে আসবে সেদিন, কে জানতো! এমন তো কখনও আসে না। রাত বারোটার আগে মেজবাবুর গাড়ি কখনও ঢোকেনি বাড়িতে। মেজবাবু এলে বাড়িতে সোরগোল পড়ে যায়, পাড়ার লোক টের পায়। দারোয়ান থেকে বেণী, চাকর-বাকর সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। শুধু মেজগিন্নীই এক অঘোরে ঘুমিয়ে থাকে নিজের ঘরে।
পরের দিন বংশী বললে—খুব বেঁচে গিয়েছেন কাল আপনি শালাবাবু।
—মেজবাবু খুঁজেছিলেন বুঝি?
বংশী বললে—আমাকে ডাকলে মেজবাবু, বললে—কে গেল রে ওখান দিয়ে?
–তুমি কী বললে?
–আমি বললাম—আমিই তো বেরোলাম ছোটমা’র ঘর থেকে, ছোটমা ডেকেছিল আমাকে। মেজবাবু তবু ছাড়ে না, বলে— বারান্দাটা অন্ধকার করে রাখিস কেন, লোক চেনা যায় না।
–তোমার ছোটমা কী বললে?
বংশী বললে-ছোটমা শুনে বললে—যদি এর পরে কেউ জিজ্ঞেস করে কোনো দিন ভূতনাথের কথা, বলবি, আমার গুরুভাই। তা ভাগ্যিস সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল আজ্ঞে, নইলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। মেজবাবুর মেজাজ যে রাশভারী, যখন ভালো তো ভালো, একবার রাগলে ঠিক ছোটবাবুর মতন হুজুর, আর জ্ঞান থাকে না।
—তা মেজবাবু কাল অত সকাল-সকাল বাড়ি ফিরেছে যে?
—মেজবাবু তো কাল বেরোয় নি, ভৈরববাবু এল তখন সন্ধ্যে, হাসিনী, মাঠাকরুণ ওঁয়ারাও এলেন, একে-একে সবাই ফিরে গেল, মেজবাবু কারোর সঙ্গে দেখা করলেন না, কাল কেবল তামাক খেয়েছেন বসে-বসে নাচঘরের ভেতর, মেজাজ ভালো যাচ্ছে না এ ক’দিন—আর ছোটবাবুরও অসুখ, বাড়িতে শান্তি নেই কারো মনে।
