ভূতনাথ মেঝের ওপরই বসে পড়লো। বললে—সত্যিই বিশ্বাস করে বৌঠান, তোমার মতো আপনার আমার আর কেউ নেই সংসারে। আজ যদি বড়বাড়ি থেকে আমাকে তোমরা তাড়িয়ে দাও, আমার কোনো যাবার জায়গাও নেই।
বৌঠান এবার উঠলো। বললে—তুই আমাকে আজ কিন্তু বকতে পারবিনে ভূতনাথ—আজ আমি একটু খাবোই—বলে আলমারির মধ্যে থেকে একটা বোতল আর একটা গেলাশ নিয়ে এল।
–এখনও ওটা খাও তুমি বৌঠান?
—রোজ খাই না, কিন্তু এক-একদিন না খেলে বড় কষ্ট হয় ভূতনাথ, না খেয়ে আর পারিনে।
ভূতনাথ বললে—তবে যে শুনলুম ছোটকর্তা ছেড়ে দিয়েছে একেবারে!
—ছোটকর্তা সত্যিই ছেড়ে দিয়েছে, যার জন্যে শুরু করলুম তিনি ছেড়ে দিলেন, কিন্তু আমি ছাড়তে পারছিনে আর।
—নেশা হয়ে গিয়েছে নাকি তোমার?
বৌঠান গেলাশটা মুখে উপুড় করে বললো ভাই, নেশাই হয়ে গিয়েছে বোধ হয়, তোর কাছে আর বলতে লজ্জা নেই, একদিন স্বামীকে ফেরাবার জন্যেই ধরেছিলাম, প্রথম-প্রথম কত গা ঘিনঘিন করতো, বমি-বমি হতো, আজ কিন্তু আর না হলে চলে না। তুই আজ আর বারণ করিসনে আমায়—আজ আমি প্রাণ ভরে খাবো।
–কিন্তু না খেলেই কি নয়?
বৌঠান সে-কথার উত্তর দিলে না। বোতলটা হাতে নিয়ে একবার ভালো করে দেখলে। আর সামান্যই মাত্র বাকি আছে। বললে—একটা কাজ করতে পারবি ভূতনাথ?
—কী?
–আর একটা বোতল না হলে আমার চলবে না।
—তার আমি কী করবো?
—ছোটকর্তা তো খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, আর কোথাও নেই, যে-ক’টা বোতল বাকি ছিল সব শেষ হয়ে গেল আজ, আর একটা বোতল এনে দিতে হবে তোকে।
—তুমি কি পাগল হয়েছে বৌঠান?
বৌঠান বললে—পাগলামি নয় রে ভূতনাথ, আমার খুব টনটনে জ্ঞান রয়েছে, ছোটকর্তাকে সেদিন তো তাই বলছিলাম, ও-মানুষটাই বা কী করবেন, একদিন আমাকে ধরিয়েছিলেন উনিই, সেদিন বললেন—ছাড়ো, ওটা ছেড়ে দাও ছোটবউ, ও বড় সর্বনাশা নেশা, পুরুষদের ধরলে তবু ছাড়ে, মেয়েদের একবার ধরলে আর রক্ষে নেই।
ভূতনাথ খানিকক্ষণ পাথরের মতন চুপ করে চেয়ে রইল বৌঠানের দিকে।
বৌঠানের চোখ দিয়ে ঝর-ঝর করে জল পড়তে লাগলো। বললে—সেই শেষকালে আমি স্বামীকে পেলুম ভূতনাথ কিন্তু এমন করে পেতে কে চেয়েছিল?
বৌঠানকে এমন করে কাঁদতে কখনও দেখেনি ভূতনাথ। চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপ-টপ করে যেন এক-একটা হীরের টুকরো। বললে—এক-একবার যাই ছোটকর্তার ঘরে, ভারী কষ্ট হয় দেখে। নড়তে পারেন না, সমস্ত অঙ্গ পঙ্গু হয়ে গিয়েছে। অমন রূপ, অমন স্বাস্থ্য, অমন মন, ওই অসুখ, তবু ওঁর চোখে জল নেই রে একটু, আমি কেঁদে ভাসিয়ে দিলুম পায়ের ওপর মাথা রেখে, আমার যশোদাদুলালকে তো তাই বলছিলাম, এ তুমি কী করলে ঠাকুর, আমার মানুষকে আমার কাছে ফিরিয়েই দিলে যদি, তবে অমন করে তার সব কেড়ে নিলে কেন? আমি তোমার কাছে কী অপরাধ করেছি, এ তোমার কেমন বিচার ঠাকুর?
ছোটকর্তা আমার কান্না দেখে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেলেন। জানিস ভূতনাথ, একটা কথা পর্যন্ত বললেন না। আজ তার বলবার মতো মুখও নেই বুঝি।
ভূতনাথ বললে—আর একদিন যাবে বৌঠান?
–কোথায় রে?
—সেই যে সেখানে, বরানগরে?
বৌঠান বললে—যেতে চাস চল কিন্তু আমার সব বিশ্বাস আজ হারিয়ে ফেলেছি ভূতনাথ, আমার মনে হয় এমন করে যশোদাদুলালকে মিনতি করলাম, এত পূজো, এত উপোস, এত ব্ৰত করলাম, আমার যা সাধ্য সব করলাম, এততেও যখন হলো না তখন আর কিছুতেই হবে না। মানুষের ওপর, দেবতার ওপর, এমন কি নিজের ওপরও আর বিশ্বাস নেই। নিজের মনের ওপরও আর যেন জোর নেই।
ভূতনাথ বললে—একটা কথা শুনবে বৌঠান, সমস্ত ফিরে পাবে তুমি, শুধু মদটা তুমি খেয়ো না।
বৌঠান বললে—আমারও কি খেতে সাধ ভাই, কিন্তু ওই যে বললুম নিজের ওপরেও আর বিশ্বাস নেই–কতবার ঠিক করি খাবো না, স্বামী যার রোগশয্যায় শুয়ে আছে, তার এ খাওয়া উচিত নয়, প্রতিজ্ঞা করি আর আমি ছোঁবো না, যশোদাদুলালের পা ছুঁয়ে কতবার দিব্যি করলুম, কই, রাখতে তত পারিনি আমার প্রতিজ্ঞা—আমি পারবো না ভূতনাথ। আজকের মতো তুই এনে দে লক্ষ্মীটি।
ভূতনাথ উঠলো এবার। বললে—আজ আমি আনছি—কিন্তু আর কখনও আমাকে বলে না।
বৌঠান বললে–আর যদি কখনও খাই, তুই আমাকে শাপ দিস ভূতনাথ, তুই বামুনের ছেলে, তুই শাপ দিস আমাকে-তুই শাপ দিলে নির্ঘাৎ ফলবে।
ভূতনাথ হাসলে—তোমাকে শাপ দিলে সে-শাপ বুঝি আমার গায়ে লাগবে না ভেবেছে।
বোঠান বললে তোকে সত্যি কথাই বলি ভূতনাথ, আমার আর বাঁচতে সাধ নেই, বেঁচে তো দেখলাম অনেকদিন, এবার দেখবো মরে কত সুখ।
ভূতনাথ হঠাৎ বললে—আমারও আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না বৌঠান।
—তুই কোন্ দুঃখে মরবি ভূতনাথ, তোর আমি কোনো অভাব রাখবো না, আমার যা কিছু আছে যাবার আগে সব তোকে দিয়ে যাবো, আমার শাশুড়ীর যত গয়না, সব আমাকে দিয়ে গিয়েছেন, আমি ছোটবউ ছিলাম, বড় আদরের বউ ছিলাম রে এ-বাড়ির, আমার সব তোকে দেবো।
বোতলের শেষটুকু গেলাশে ঢেলে নিয়ে সেটুকুও মুখে ঢেলে দিলে বৌঠান। তারপর বললে—এবার যা, আর একটা বোতল নিয়ে আয় তুই, কাল থেকে আর আমি খাবো না—কথা দিচ্ছি—বলে হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসলো বৌঠান। ভূতনাথের পা দুটো ছুঁয়ে বললে—এই কথা দিচ্ছি তোকে ভূতনাথ।
তাড়াতাড়ি নিজের পা দুটো সরিয়ে নিয়ে ভূতনাথ দুটো হাত চেপে ধরলো বৌঠানের। বললে-করলে কি—ছিঃ–ছিঃ–নেশা হলে মানুষের আর জ্ঞান থাকে না!
বৌঠান হাত দুটো মাথায় ঠেকিয়ে বললে—না রে, তুই বামুন, নিলে দোষ নেই।
