আনন্দমোহন বসুর পাশে শিখ নেতা কুঁয়ার সিং, কৃপাণধারী শিখ অনুচরদের নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। বাঙলার পক্ষ থেকে সুরেন বাড়জ্জে উঠে নিজের হাতে রাখী বেঁধে দিলেন। বললেনবাঙলার আর পাঞ্জাবের প্রেমবন্ধন অটুট হোক।
সভায় তুমুল হাততালি পড়লো।
তারপর উঠলেন কবি রবীন্দ্রনাথ। তিনি ঘোষণা করলেন— ‘যেহেতু বাঙালী জাতির সর্বজনীন প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করিয়া গভর্নমেন্ট বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদ কার্যে পরিণত করা সঙ্গত বোধ করিয়াছেন, অতএব আমরা প্রতিজ্ঞা করিতেছি, বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদের কুফল নাশ করিতে আমরা সমগ্র বাঙালী জাতি আমাদের শক্তিতে যাহা কিছু সম্ভব, তাহার সকলই প্রয়োগ করিব, বিধাতা আমাদের সহায় হউন।
শুনতে-শুনতে ভূতনাথের বুকটাও কেঁপে উঠলো থর-থর করে। সেই নিবারণের কাছে একদিন শুনেছিল ব্রিটিশ অত্যাচারের কাহিনী। কেমন করে মিথ্যা দিয়ে, ছলনা দিয়ে ভারতবর্ষ একদিন জয় করে নিয়েছিল তারা। আর শুনেছিল আর একজনের কাছে। সে বদরিকাবাবু! বৈদূর্যমণি যেবার রাজাবাহাদুর হয়েছিলেন, সেবার বদরিকাবাবু বলেছিলেন—রাজাবাহাদুর তো নয়— রাজসাপ হয়েছে বড়বাবু। বলে গড়গড় করে সমস্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসটা মুখস্ত বলে গিয়েছিল।
আজও কান পাতলে ভূতনাথ যেন সেদিনের সব কথা শুনতে পায়। ভবানীপুরের অর্ধসমাপ্ত বাড়ির ভারার ওপর দাঁড়িয়ে যখন কাজ তদারক করে তখন মাঝে-মাঝে কারা দল বেঁধে গান গাইতে গাইতে যায়–
“দণ্ড দিতে চণ্ডমুণ্ডে
এসো চণ্ডী যুগান্তরে–
পাষণ্ড প্রচণ্ড বলে
অঙ্গ খণ্ড খণ্ড করে…
চারিদিক থেকে চিৎকার ওঠে–বন্দে মাতরম্–
দুটি শব্দ। সমুদ্রতরঙ্গের অবিশ্রান্ত গর্জনের মতো সারা দেশের অন্তর থেকে এই শব্দ দুটি ধ্বনিত হয়ে ওঠে। সহস্র কণ্ঠের সংস্পর্শে দুটি শব্দ হয়ে উঠলো একটা জাতির মর্ম-সঙ্গীত। মহাকালের ইঙ্গিতে ওই দুটি শব্দই একদিন জাতির জাগ্ৰত-চেতনার মতো অক্ষয় হয়ে রইল।
সভার শেষে বড়বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভূতনাথ যেন বিমর্ষ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্যে। বংশী এখনও ছোটবাবুর কাছে। তার দেখা পাওয়া গেল না। আস্তে-আস্তে সাইকেলটা আস্তাবলবাড়িতে রেখে নিজের চোরকুইরিতে গিয়ে ঢুকলো। তারপর মনে পড়লো একবার পটেশ্বরী বৌঠানের কথা। তখনও একটা রাখী আছে। বৌঠানের হাতে তো রাখী বাঁধা হয়নি।
অন্ধকার বারান্দা আজ। মেজবৌঠান হয় তো বাঘবন্দি খেলছে গিরির সঙ্গে নিজের ঘরে বসে। ওদিকে বড়বৌঠান চৌষট্টিটা সাবানের টুকরো নিয়ে হাত ধুতে ব্যস্ত বোধহয়। এখানে নতুন সমাজের শব্দ এসে পৌঁছোয় না বুঝি। দারোয়ান, দেউড়ি, সদর, অন্দরমহল পেরিয়ে এখানে আসতে বুঝি ভয় পায় তারা।
আস্তে-আস্তে ছোটবৌঠানের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ভূতনাথ। চুপি-চুপি ডেকেছিল—বৌঠান–
ভেতর থেকে বৌঠানের গলার শব্দ এল—কে? ভূতনাথ? আয়–আয়।
ঘরে ঢোকবার আগে কেমন যেন ভয় করছিল ভূতনাথের। অনেকদিন দেখা হয়নি বৌঠানের সঙ্গে। যদি গিয়ে দেখে বৌঠানের মুখের সে হাসি নেই, চোখের সে দীপ্তি নেই আর! স্বপ্নে দেখা বৌঠানকে দেখতে যেন ভয় করে। ভয় হয়—বড়বাড়ির চেহারা দেখলে যেমন আজকাল মায়া হয়, তার বৌঠানকে দেখেও যদি তাই হয়। পটেশ্বরী বৌঠান তার, ধ্যানের জিনিষ। তার আত্মার সম্পদ। পটেশ্বরী বৌঠানের কোনো ক্ষতি কোনো লোকসান যেন সহ্য করতে পারবে না ভূতনাথ।
কিন্তু না। সব ঠিক তেমনিই আছে। ঘরের প্রত্যেকটি জিনিষ, প্রত্যেকটি খুটিনাটি। এমন কি বৌঠানের যশোদাদুলাল পর্যন্ত। আলমারির সেই ঘাগরা-পরা মেম-পুতুলটি পর্যন্ত। আর বোঠান। বৌঠানের দিকে চাইলে ঠিক আগেকার মতোই চোখ যেন জুড়িয়ে যায়।
বৌঠান শুয়ে ছিল। বললে—আমি কিন্তু তোর ওপর রাগ করেছি ভূতনাথ।
ভূতনাথ আস্তে-আস্তে সামনে এগিয়ে গেল। বললে—তুমিও তো আর একবার ডেকে পাঠাওনি।
—আমি দেখছিলুম, আমি না ডাকলে তুই আসিস কি না।
ভূতনাথ বললে—একটা চাকরি করছি বৌঠান আজকাল, সময় পাই না আর আগেকার মতন।
—তাও শুনেছি বংশীর কাছে, বংশী বলছিল—শালাবাবুকে ডাকবো? আমি বললাম—তোর শালাবাবুর বিবেচনাটা কী রকম দেখি না..তা সবাই তো একে-একে চলে যাচ্ছে, তুই-ই বা আর আছিস কেন? তুইও চলে যা, ছোটকর্তার অসুখ, চাকর-বাকররা শুনছি আজকাল মাইনে পায় না নিয়ম করে, বড়বাড়ির বিপদের দিনে তত কেউ থাকবে না জানা কথা, তোরা সুখের পায়রা, তুই-ই বা কেন থাকবি, চলে যা।
ভূতনাথের বুক ফেটে কান্না পেতে লাগলো। বললে—তুমিও আমাকে এই কথা বলছে বৌঠান।
বৌঠান হাসতে লাগলো। বললে—তোর সঙ্গে বড়বাড়ির কীসের সম্পর্ক রে ভূতনাথ, তুই এ-বাড়িতে একদিন এসেছিলি হঠাৎ, আবার হঠাৎ চলে যাবি, তুই আমার কে বল না যে তোকে জোর করে ধরে রাখতে পারবো, আমার ভাই-ও নেই, বোমও নেই, বাবাও নেই, মা-ও নেই—আবার না-হয় মনে করবো আমি একলা। ছোটকর্তা যতদিন আছে ততদিন আমিও আছি—তারপর যা করে আমার যশোদাদুলাল–বলে হাসতে লাগলো বৌঠান। অদ্ভুত এক ধরনের হাসি।
ভূতনাথ বললে—আমারই বা কে আছে বলো?
–তুই পুরুষ মানুষ, তোর সব আছে ভূতনাথ।
—না, বৌঠান তুমি তো জানো না, আমার কেউ নেই, সংসারে নিজের বলতে আর কেউ নেই, এক তুমি ছাড়া।
বৌঠান এবার উঠে বসলো। কানে হীরের দুল দুটো ঝকঝক। করে উঠলো! হাতের চুড়ি গায়ের গয়না বেজে উঠলো টুং-টাং করে। বলে—আমাকে সত্যি তুই নিজের মতন মনে করিস ভূতনাথ?
