—আমাকে? কেন? যেন ভয় করতে লাগলো ভূতনাথের। কাজের কোথাও কোনো গাফিলতি হয়েছে নাকি? কিম্বা কোনো
ত্রুটি।
সরকারবাবু বললে—আর কি, আপনার তো হয়ে গেল, মেরে দিলেন আপনি।
—কী হয়ে গেল?
—বাবু তো অকারণে ডাকেনি, আর কাউকে তো ডাকে না, আপনার ওপর একটু নেকনজর আছে ভূতনাথবাবু, যাই বলুন আর তাই বলুন। হা হা করে সঁাত বের করে নির্বোধের মতো হাসতে লাগলো সরকারবাবু! হাসি থামিয়ে সরকারবাবু বললে—আপনাকে বাবু বসতে বলে গিয়েছেন—এখনি বেরোবেন।
ভূতনাথের মনে হলো–কী এমন কাজ যার জন্যে এমন অপেক্ষা করতে হবে। কোনো দোষ হয়েছে তার, কোনো গাফিলতি কিম্বা কোনো অপরাধ।
সরকারবাবু বললে—ভয় নেই আপনার, আপনার ক্ষতি হবে কিছু।
-কীসে বুঝলেন?
—আরে এতদিন কাজ করছি তা আর বুঝি না, আর কাউকে তো এমন করে কই ডাকে না, আপনার উন্নতি এই হলো বলে, দেখে নেবেন।
—কখন আসবেন?
-এই তো এখনি আসবেন বলে গিয়েছেন, গাড়িও তো তৈরি হয়ে রয়েছে।
ভূতনাথ দেখলে উঠোনের পাশে রূপচাঁদবাবুর গাড়ি সত্যিই তৈরি। ঘোড়া দুটো অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে।
সরকারবাবু ভাউচারগুলো নিয়ে পাকা খাতায় তুলতে লাগলো। একে-একে সব খুটিয়ে-খুটিয়ে হিসেব দিতে হয়। রূপচাঁদবাবুর কোম্পানীর কাজ খুব পাকা। হিসেবের খুব কড়াকড়ি। প্রত্যেকদিনের হিসেব প্রত্যেকদিন খাতায় ওঠে। তারপর পাওনাদারদের হিসেব মেটানো হবে সেই পাকা খাতা দেখে। কোথায় সুরকি গেল দু’গাডি, ইট গেল কত হাজার, চুন ডেলিভারি ক’বস্তা, সব লিখতে হবে। যা যা দরকার সব ইঞ্জিনিয়ার ওভারসিয়ারদের অর্ডার মাফিক বিলবাবুকে সাপ্লাই দিতে হবে দোকান থেকে। দোকানে গিয়ে মাল লোডিং থেকে ডেলিভারি হওয়া পর্যন্ত সক বিলবাবুর কাজ। এমনি কাজ শিখতে-শিখতে একদিন ওভারসিয়ার হওয়া। মাপজোক করতে শেখা, নক্সা করতে শেখা, কতগুলো ঘর করতে কত ইট চুন সুরকি লাগে তার হিসেব জানা।
তা এই ক’মাসেই ভূতনাথ বেশ পাকা হয়ে গিয়েছে বৈকি। এখন একলাই ফিতে ধরে হিসেব করতে পারে। চুরি ধরতে পারে। চারদিকে যখন এত বাড়ি উঠছে, ওভারসিয়ার-এর সংখ্যাও বাড়বে। রূপচাঁদবাবুর কোম্পানীও আগেকার চেয়ে এখন অনেক বড় হয়েছে। নতুন শহর গড়ছে, বস্তি ভেঙে নতুন বাড়ি, নতুন সমাজ তৈরি হচ্ছে—নতুন সভ্যতা। এখানে সবই যেন নতুন। নতুন মানুষ, নতুন সমাজ, নতুন বাড়ি,নতুন প্রাণ! উকিল ব্যারিস্টার কত নতুননতুন হচ্ছে। একটু পয়সা হলেই ভবানীপুরে বাড়ি করা চাই।
এই তো সেদিনের কথা।
৩০শে আশ্বিন। ভূতনাথ প্রথমে ভেবেছিল কিছু হবে না! কিন্তু সেই দিন রাখী বাঁধার কী হিড়িক।
ইদ্রিস বলে—হাত দেখি বিলবাবু।
–কেন?
–হাত বাড়ান না।
ওভারসিয়ার আর ইঞ্জিনিয়ারবাবুরাও বাদ গেল না। রূপচাঁদবাবু প্রথমে কিছু বলেন নি। কিন্তু ভূতনাথই গিয়ে সাহস করে সামনে দাঁড়ালো।
–ও আবার কী? ও-বুঝতে পেরেছি, রাখী বুঝি, বাঁধুন, বেঁধে দিন—বলে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।
বিল কালেকশন করতে গিয়ে বিকেল বেলা ভিড় দেখে একবার সাইকেল থেকে নামলো ভূতনাথ। মাথার ওপর ঝাঁ-ঝ করছে রোদ। কিন্তু তবু অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। সকালে বাড়িতে-বাড়িতে অরন্ধন ছিল। উপোস করেছে লোকে। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভলান্টিয়াররা বলেছে—একটা দিন না হয় না খেলেন–কী হয় তাতে। ভবানীপুরের পাড়াতে অনেকে রান্নাই করেনি। দোকান-পাটও অনেক বন্ধ ছিল। এ-এক ধরনের অভিজ্ঞতা।
বড়বাড়িতে মেজবাবু হুকুম দিয়েছিল—কাউকে ঢুকতে দেবে না–যত সব বদমাইস-এর দল।
তা বড়বাড়িতে কে-ই বা ঢুকতে সাহস করবে! ভূতনাথেরও মনে হয়েছিল খাবে না সে। সত্যিই তো একটা দিন না খেলে কী হয়। ভিস্তিখানাতে গিয়ে স্নান সেরে নিয়ে আবার সাইকেল-এ উঠতে যাবে, এমন সময় বংশী এসে গেল। বললে—যাচ্ছেন যে শালাবাবু, খাবেন না আজ?
–রান্না হয়েছে আজকে?
–রান্না হবে না কেন?
—অরন্ধন হয়নি আজ? ভলান্টিয়াররা আসেনি?
—কে সাহস করে ঢুকবে আজ্ঞে, মেজবাবু ব্রিজ সিংকে গেট বন্ধ করতে বলে দিয়েছেন।
—বাজার খোলা ছিল?
-কিছু-কিছু ভোলা ছিল হুজুর, বাজার বন্ধ হবে কোন্ দুঃখে। মাছ এল, তরকারি এল, বিধু সরকার মশাই আজকাল নিজে বাজার করে কি না, মধুসূদন চলে যাওয়া এস্তোক…
ভূতনাথের মনে হয়েছিল এক বড়বাড়ি ছাড়া সেদিন সব বাড়িতেই বুঝি সমান অবস্থা। অন্তত ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকজনদের মুখের দিকে চেয়ে তাই মনে হলো। এমনি আর একটা ভিড়ের কথা মনে পড়লো ভূতনাথের। সে কিন্তু শীতকাল ছিল। ভোরবেলা সেদিন শেয়ালদ’ স্টেশনে স্বামী বিবেকানন্দ এসে নেমেছিলেন। সে কয়েক বছর আগেকার কথা।
ভিড়ের মধ্যে কে একজন বললে—প্রেসিডেন্ট আসছেন না আজ জানেন তো—আনন্দমোহন বসু অসুস্থ।
আর একজন বললে—আসছেন তিনি, স্ট্রেচারে করে তিনি আসছেন—খবর এসেছে এইমাত্র।
শেষকালে সত্যিই তিনি এসে পড়লেন। সমস্ত জনতা জয়ধ্বনি করে উঠলো। বন্দে মাতরম্। বহুদিন থেকে কঠিন রোগে শয্যাশায়ী। আজ তিনি মুমূযু! কিন্তু এমন মুহূর্ত তো তার জীবনে আর ফিরে আসবে না। চারদিকের জনতা সেই অগ্রজ জননায়কের কথা শোনবার জন্যে অধীর আগ্রহে চুপ করে আছে।
সব মনে নেই ভূতনাথের। তবু কিছু-কিছু মনে আছে। সেদিন কলকাতার সেই জনসমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভূতনাথের মনে হয়েছিল সত্যিই একটা জাতির মহা-অভ্যুদয় যেন সে প্রত্যক্ষ করছে।
শুয়ে-শুয়েই আনন্দমোহন বসু বললেন—আমার সামনে সেই দিন উপস্থিত যেদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে অনন্তের পথে যাত্রা করতে হবে, আজ এই যে আপনাদের দেখলাম, হয় তো এই আমার শেষ দেখা…আমি ঋষি নই, কোনো ঋষির পদধূলি গ্রহণেরও যোগ্য নই, তবু যিনি সকলের পিতা, ভারতবাসী ও ইংরেজের পিতা, তাকে আজ আমি আমার অন্তরের ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্যে যে তিনি আমাকে এইদিন পর্যন্ত জীবিত রেখেছেন, আমি যাবার আগে দেখে যেতে পারলাম এই এক জাতির অভ্যুদয়। এই যে মিলন-মন্দিরের ভিত্তি আজ প্রতিষ্ঠিত হলো, এই অখণ্ড বঙ্গভবন, এর ভিত্তি আমাদের সকলের অশ্রু-ধৌত আর্দ্র হৃদয়ের ওপর—এই শোণিতহীন নবতর সংগ্রামক্ষেত্রে আজ দেবতারা এসেছেন উধ্ব থেকে পুষ্পবৃষ্টি করতে
