দারোয়ান হঠাৎ এল আবার। ডাকলে—ভূতনাথবাবু—
এত লোক থাকতে তাকেই প্রথম ডাকা। ভূতনাথ তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে ঢুকলো।
—কী খবর ভূতো, তুই?
ভূতনাথ কী বলে প্রথম কথা বলবে ভাবতে পারলে না। এত তাড়াতাড়ি ঘটনাটা ঘটলো। সময় পাওয়া গেল না মোটে। আর ননীলালেরও চেহারাটা কেমন হয়ে গিয়েছে যেন। যেন আরো বয়েস বেড়ে গিয়েছে। ভয় হয় দেখলে। বিরাট একটা টেবিল। চারদিকে কাগজপত্র। একটা কাগজে কী যেন লিখছিল। হাতে তখনও কলমটা রয়েছে। মুখে সিগারেট। চোখে চশমা।
—বোস, তোর চাকরিটা খালি পড়ে রয়েছে—আর দেখাই করলি না তুই—আছিস কোথায়? এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো কথা বলে গেল ননীলাল।
ভূতনাথ বললে—সেই বড়বাড়িতে, আবার কোথায় থাকবে।
—এখনও ওখানে আছিস…কিন্তু চাকরি?
—চাকরি তো একটা করছি রূপচাঁদবাবুর কোম্পানীতে। বিল সরকারের কাজ পেয়েছি একটা।
—ভালোই হয়েছে, আমিও চলে যাচ্ছি আজ।–কোথায়?
—তোকে বলেছিলাম, একবার বেড়াতে যাবোআজই যাচ্ছি—শুধু দেরি হলে চূড়োর জন্যে।
—ছুটুকবাবু? ছুটুকবাবুর জন্যে?
ননীলাল আর একটা সিগারেট ধরালে। তারপর বললো, ওদের বড়বাড়িটা আমার কাছে বাঁধা রাখলে কিনা–আমার তেমন ইচ্ছে ছিল না।
বাঁধা। বন্ধক। বড়বাড়ি! কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল সমস্ত। ননীলাল এ বলছে কী!
ননীলাল বললে-আমার তেমন ইচ্ছে ছিল না ভাই, নিজেদের মধ্যে, এতদিনের জানাশোনা, তা ছাড়া ছোটবেলা থেকে ওদের বাড়িতে যাচ্ছি, কত খাওয়া-দাওয়া করেছি ও-বাড়িতে, চুভোর কাছে কতবার কত টাকা নিয়েছি, শোধ করিনি, তুই তো জানিস কতদিনের আলাপ ওদের সঙ্গে—অথচ তাই-ই করতে হলো—বড় সঙ্কোচ লাগছিল নিজের মনে।
ভূতনাথের মন তখন কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে। যা শুনছে সব সত্যি! সেই আস্তাবলবাড়ি, খাজাঞ্চীখানা, তোষাখানা, ভিস্তিখানা, পূজোবাড়ি, বৈদূর্যমণি, হিরণ্যমণি, কৌস্তুভমণি, ছুটুকবাবু, ভূতনাথের জীবনের অর্ধেকের সঙ্গে ও-বাড়ির সমস্তটা জড়িয়ে আছে যে। সেই ভৈরববাবু! ছুটুকবাবুর বিয়ে! আর সকলের চেয়ে সেই পটেশ্বরী বৌঠান। পটেশ্বরী বৌঠানের
কী হবে!
বৌঠান বলেছিল—এ-সব কর্তাদের ব্যাপার,আমরা ও নিয়ে মাথা ঘামাই না।
—কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন এমন হলো?
ননীলাল বলতে লাগলো—প্রথমে আমার ইচ্ছে ছিল না, অতবড় বংশ, বনেদী বাড়ি, আমার কাছে যখন চূড়ো প্রস্তাব করলে, তখন আমি বললুম—আমার দ্বারা হবে না ভাই, কলিস তো ও-টাকার জন্যে আমি অন্য লোক যোগাড় করে দিচ্ছি।
চূড়ো বললে—আর কেউ হলে জানাজানি হতে পারে, ওটা তুই-ই দিয়ে দে। আমরা শোধ করে দেবে বছর দু’-একের মধ্যে। সুদ যা বলবি তাই-ই দেবো।
শেষে রাজি হলাম—কিন্তু জানি ও আর শোধ হবে না, টাকাও ওদের যোগাড় হবে না, ও-বাড়িও ওদের ছাড়তে হবে।
–বাড়ি ছাড়তে হবে? ভূতনাথ যেন নিজের কানে নিজের ফঁসির হুকুম শুনছে।
–ছাড়তে হবে বৈকি! টাকা তো আমার একলার নয়, আমাদের ফ্যামিলির টাকা, আমার নাবালক শালারা রয়েছে, আমার শাশুড়ী রয়েছে, তারা সুদই বা ছাড়বে কেন? আর টাকা দিয়ে বন্ধকি বাড়িই বা হাতছাড়া করবে কেন! শেষ পর্যন্ত তেমন হলে বাড়িও খালি করতে হবে বৈকি!
–তা হলে যাবে কোথায় ওরা? এতদিনের বংশ, এত লোকজন, চাকর-বাকর, পূজা-পার্বণ, বিগ্রহ সকলকে নিয়ে সব তুলে নিয়ে-সে কি সম্ভব?
ননীলাল বললে—চূড়ো তত এটর্নিশিপ পাশ করতে পারলে না জানিস—তা বিয়ের পর কেউ এগজামিনে পাশ করতে পারে?
—কী করবে তা হলে?
—বলছিল আর একবার পরীক্ষা দেবে, কিন্তু ও আর পাশ করতে পারবে না, দেখে নিস। এখন ওর মাথায় কেবল ওই সব চিন্তা, স্বপ্ন দেখছে কেবল সম্পত্তি ফিরে পাবার, ব্যাঙ্কটাও ওদের ফেল মারলো। জমিদারী যেটুকু আছে, তাতে কিছুই চলে না, এদিকে কোলিয়ারি কিনলে তাতেও ওই…
—তাতে কী? কোলিয়ারি চললো না কেন?
ননীলাল আর একটা সিগারেট ধরালো এবার। বললেওদের কপালই খারাপ, যেমন প্রথমে আমাকে কিছু বললে না, জিজ্ঞেসও করলে না, ভাবলে এত টাকার কারবার, আমি বোধহয় দালালি মারবো। তাই বিশ্বাস করে ঝুমুটমলকেই ডাকলে—এখন বুঝতে পেরেছে। এতখানি নেমকহারামি আমি অন্তত করতে পারতুম না—অনেক খেয়েছি রে ওদের বাড়িতে, অনেকদিন চূড়োর পয়সায় বাবুয়ানি করেছি, ওর অনেক পয়সা ধার নিয়ে শোধ দিইনি আজ পর্যন্ত—একটু কৃতজ্ঞতা অন্তত পেতে আমার কাছে। এখন ছুটুককে তাই বললুম—মায়োয়াড়ীকেই তুই বেশি বিশ্বাস করলি!
চুলো বললে-কাকারা যা করতো তাতে তো আগে আমি কিছু বলতে পারতুম না।
ননীলাল আবার বলতে লাগলো—তা শেষকালে দেখা গেল শুধু ওপরটাই কয়লা, নিচে সমস্ত পাথর—ভালো করে এক্সপার্ট দিয়ে দেখালে না পর্যন্ত, অত সময়ই ওদের নেই—যা করে বিধু সরকার আর ঝুমুটমল। ননীলাল এবার হাতঘড়িটা দেখলে।
ভূতনাথ বললে—আমি এবার উঠি ননীলাল—দেরি হয়ে যাচ্ছে হয় তো তোর।
রাস্তায় বেরিয়ে কান্না পেতে লাগলো ভূতনাথের। মনে হলো এখনি সে দৌড়ে যাবে বড়বাড়িতে। পটেশ্বরী বৌঠানের কাছে না যেতে পারলে যেন তার স্বস্তি হচ্ছে না। বড়বাড়ির সমস্ত প্রাণীর জন্যে যেন মায়া হতে লাগলো তার। সেই ছুটুকবাবু, মেজবাবু, ছোটবাবু, বৌঠান, বংশী, চিন্তা, ইব্রাহিম, ইয়াসিন সবাই। এমন কি সেই রান্নাবাড়ির আরশোলাটা পর্যন্ত। কেন এমন হলো! কোথায় যাবে সব! এর হাত থেকে বাঁচবার কি কোনো পথ নেই? নিজের জন্যে তার চিন্তা নেই। কিন্তু বৌঠান! আর ছোটবাবু যে উঠতে পারে না—তাকে যে উঠে বসিয়ে ধরে খাওয়াতে হয়, স্নান করাতে হয়! ছোটবাবু কোথায় যাবে! বনেদী বংশ, কখনও নিজের হাতে এক গেলাশ জল গড়িয়ে পর্যন্ত খায়নি। কখনও নিজের কাপড়টার হিসেব পর্যন্ত রাখেনি! কোথায় যাবে ওরা! কোথায় ওরা যাবে!
৩৭. সন্ধ্যেবেলা রূপচাঁদবাবুর বাড়িতে
সন্ধ্যেবেলা রূপচাঁদবাবুর বাড়িতে যেতেই সরকারবাবু ডাকলে— এই যে ভূতনাথবাবু, বাবু একবার খুঁজছিলেনআপনাকে?
