আর ওই তো রূপচাঁদবাবু! কী নিষ্ঠা নিয়ে ব্যবসা করছেন। মাসে-মাসে মাইনে দিয়ে যাচ্ছেন ঠিক। এতগুলো ইঞ্জিনীয়ার, ওভারসিয়ার, বিলবাবু, রাজমিস্ত্রী, ছুতোর মিস্ত্রী খাটছে। নতুন শহর গড়ে তুলছেন ভবানীপুরে! লোহা, কাঠ, ইট দিয়ে স্বপ্ন গড়ছেন মানুষের, ভবিষ্যৎ পাকা করে তুলছেন নিজের, পরের, সকলের।
রূপচাঁদবাবু বলেন—ভাঙা গড়াই নিয়ম-নদীর যখন এপার ভাঙে, তখন ওপার গড়ে ওঠে।
ভবানীপুরের নতুন পাড়ার ছেলেরা খেলা করে পার্কে। ফুটবল খেলে, গান গায়, ওরা গড়ে উঠছে বুঝি। কিন্তু একদিক গড়ে তুলতে গেলে আর একদিক কি ভাঙতেই হবে?
সেদিন ইদ্রিস কাজে আসেনি। কাজকর্ম বন্ধ হবার যোগাড়।
পরদিন আসতেই প্রশ্ন। ইঞ্জিনীয়ার সাহেব, ওভারসিয়ারবাবুও রেগে আগুন। ওভারসিয়ারবাবু বলে-ফুরনের কাজ আমাদের তুমি কী বলে কামাই করলে? একটা আক্কেল নেই তোমার?
ইদ্রিস বলে—আমারই না-হয় রোজটা নষ্ট হলো—আপনাদের কী ক্ষতিটা হলো শুনি?
—আমাদের আবার ক্ষতি কী? কিন্তু বাবুকে তো খেসারৎ দিতে হবে?
–কীসের খেসারৎ? আর যদি খেসারৎ দিতেই হয় তো দিন , কত দিক থেকে লাভ তো হচ্ছে বাবুদের—একটু না-হয় ক্ষতিই হলো!
–ওই কথা বাবুকে গিয়ে বলবে আমি?
–বলুন গে আপনি, আমরা কাজের ভয় করি না, যেখানে যাবো, সেইখানেই কাজ মিলবে আমাদের, কাজের কি অভাব আছে ওভারসিয়ারবাবু, কাজের অভাব নেই আজকাল। তামাম ভবানীপুর পড়ে আছে, সব বাড়ি হবে—আমাদের ডাকতেই হবে।
-নাও, নাও, কাজ করে, কেবল কথা-ওভারসিয়ারবাবু গজগজ করতে-করতে চলে যায়।
তারপর ভূতনাথের দিকে চেয়ে ইদ্রিস বলে—দেখুন তত বিলবাবু, খামকা ঝগড়া করে—ভারি ভদ্রলোক হয়েছে আমার। আমাদের চটালে আমরাও ফাঁকি দিতে জানি, এমন বাড়ি বানাবো, দু’দিনে দেয়াল ফেটে চৌচির হয়ে যাবে—উঠে যাবে কোম্পানী।
ভূতনাথ সান্ত্বনা দিয়ে বলে চুপ করে ইদ্রিস, কেন ঝামেলা বাড়াও, তা সত্যি কালকে আসোনি কেন?
ইদ্রিস বলে—আসবো কী করে বিলবাবুযে-বস্তিতে ছিলাম, সেখান থেকে কাল ঘরদোর সব তুলে নিয়ে যেতে হলো যে!
-কেন?
—আমাদের বস্তীতেও বাড়ি হবে যে, পাঁচ শ’ লোকের বাস, রাতারাতি উঠতে পারা যায়? বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে আবার এক জায়গায় আস্তানা পেলে তবে তো!
তোমাদের বস্তীতেও বাড়ি হচ্ছে বুঝি?
-হ্যাঁ বিলবাবু, বাড়ি হলেই তো ভালো আমাদের, কাজ পাবে, তা বুঝি—কিন্তু নিজেদের তত আর থাকা হবে না!
ভূতনাথ ভাবলে—এ তো বেশ মজার।
ইদ্রিস বলে—তাই তো ভাবি-বাড়ি করবো আমরা, থাকবে অন্য লোক! এই দেখুন না, ভবানীপুরের বস্তিতে ছিলাম, এখন উঠে গেলাম বালীগঞ্জের ধোপাপাড়ায়, তারপর যখন আবার বালীগঞ্জে শহর তুলবে, তখন যাবো চেতলায়।
পরদিন ননীলাল সেই কথাই বলেছিল।
ভোরবেলাই সেদিন বেরিয়ে পড়েছিল ভূতনাথ। অল্প-অল্প কুয়াশা চারদিকে। রাত থাকতে উঠতে হয়েছে। চাকর-বাকর কমে গিয়েছে আজকাল বড়বাড়িতে। সব সময় জল থাকে না ভিস্তিখানায়। অত সকালে কলেও জল আসে না। কেউ দেখবার আগেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে। রাস্তা তখন নির্জন। যখন এলগিন রোড-এ এসে পড়লো তখন বেশ ফর্সা হয়েছে। ননীলাল বরাবরই ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে। দেখা করবার এইটেই সময়। তবু এরই মধ্যে ননীলালের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে আরও অনেক লোক জড়ো হয়েছে।
দারোয়ান যে-ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেল, সে-ঘরটার ভেতর চারপাঁচটা বেঞ্চি। আরো ক’জন বসে আছে। কিন্তু বসে-বসে ক্লান্তি, ধরে গেল ভূতনাথের।
পাশের লোকটি হঠাৎ বললে—আপনি কোত্থেকে আসছেন স্যার?
ভূতনাথ চেয়ে দেখলে লোকটার দিকে। গরীব লোক। বেঞ্চির ওপর একটা পা তুলে বসে আছে। ভূতনাথ বললে— বৌবাজার থেকে।’
—চাকরির জন্যে বুঝি?
–না
—তবে কি দালালি?
–না।
অন্য লোকগুলো তাদের কথা শুনছিল। কেউ-কেউ ভদ্র চেহারার, একজন শুধু কোট-প্যান্ট পরা সাহেব। সবাই প্রতীক্ষমান। নতুন বাড়ি। নতুন দেয়াল। দেয়ালের গায়ে লেখা রয়েছে–গোলমাল করিবেন না।
আগের লোকটি এবার বললে—আমি আসছি মশাই বরানগরু থেকে।
—সে তো অনেক দূর।
—তা অনেক দূর বললে তো চলবে না, পেটের দায়ে লোকে কঁহা কঁহা যায়, এ তো সামান্য। সেই রাত থাকতে বেরিয়েছি, শুনলুম কিনা সাহেব চলে যাবে আজ।
ভূতনাথ বললে—আমিও শুনেছি।
—তবে তো ঠিকই বলেছে হরিহরদা’–হরিহরদা’ কাজ করে কি না সাহেবের আপিসে, আমাকে বলেছে—সাহেবের পা গিয়ে জড়িয়ে ধর—একটা হিল্লে হয়ে যাবেই। কী বলেন স্যার, হবে না?
কোট-প্যান্ট পরা লোকটি তখন একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। সিগারেট খেতে-খেতে একবার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে। কে জানে কী কাজ ওর। হয় তো চাকরির জন্যেই এসেছে।
এমন সময় হঠাৎ সকলের যেন একটু সন্ত্রস্ত ভাব দেখা গেল। পাশের ঘরে যেন শব্দ হলো একটু। কোট-প্যান্ট পরা লোকটি হাতের সিগারেট ফেলে দিলে।
দারোয়ান এসে পড়লো। বললে—আপনাদের নাম-ঠিকানা সব এই কাগজে লিখে দিন।
কোট-প্যান্ট পরা লোকটি আগে লিখে দিলে—এস, আর, মিটার।
পাশের লোকটা বললে—আমি তো লিখতে জানিনে স্যার, আপনি একটু লিখে দেবেন?
ভূতনাথ সকলের শেষে লিখলে—ভূতনাথ চক্রবর্তী, বড়বাড়ি, বৌবাজার।
দারোয়ান কাগজ নিয়ে চলে গেল। সব ক’জন লোকই যেন একটু তটস্থ হয়ে বসেছে। এখনি এক-এক করে ডাক আসবে। ভূতনাথও কেমন অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো। এত লোকের মধ্যে তার নামটাই অমন নাম পিসিমা কেন যে রেখেছিল। বাবার দেওয়া নাম ‘অতুল’ই তো ছিল ভালো। পিসিমা বলতো–বউ-এর ছেলে হয় আর মরে যায়, শেষে পঞ্চানন্দের দোর ধরে এই ছেলে হলো–সতীশ বললে এর নাম থাক ‘অতুল’-আমি বললাম —পঞ্চানন্দের দোর ধরে হয়েছে, এর নাম থাক ভূতনাথ, তা ভূতনাথ তো ভূতনাথ–ভোলানাথ আমার, খেতে ভুলে যায়, ঘুমোতে ভুলে যায়, এমন ছেলে কোথাও দেখেছো মা তোমরা। ভূতনাথের মনে হয়—কেন, অতুল নাম থাকলেই তো ভালো হতো। অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী। বাবা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন অতুল বলেই কিন্তু ডাকতো তাকে।
