কিন্তু রাত্রে স্বপ্নের ঘোরে এক-একবার সে যায় পটেশ্বরী বৌঠানের ঘরে। বৌঠানের চেহারা দেখে ভূতনাথ চমকে যায়। এ কি চেহারা হয়েছে? কোথায় গেল সেই রূপ! কোথায় গেল সেই লাবণ্য! সেই স্তিমিত-ভাস্বর চোখ। আর সেই চোখের চাউনি?
বৌঠান বলে-ভূতনাথ তুই বেইমান।
ভূতনাথ অপরাধীর মতো চুপ করে থাকে।
বৌঠান বলে—তোকে খাওয়ালুম পরালুম, আর আমার কাছে তুই একবারও আসিস নে, আমি তোর কী সর্বনাশ করেছি?
ভূতনাথ অনেকক্ষণ পরে বলে—তোমার কেন এমন হলো বৌঠান, তোমাকে তো আমি এমন করে দেখতে চাই নি।
বৌঠান বলে—কেন, আমার তো কিছুই হয়নি, আমি তো এখন সুখী ভূতনাথ, ছোটকর্তা তো এখন বাড়িতে থাকে রে আজকাল। আমার তত আর কোনো দুঃখ নেই—কেন তুই ভাবছিস।
ভূতনাথ বলে-তোমার চেহারা তবে কেন এমন হলো?
-কই, কী হয়েছে চেহারার?
—তা আমি বলতে পারবে না, কিন্তু তোমাকে ভালো দেখাচ্ছে যে—তুমি হাসো না যে আগেকার মতো।
–এই তো হাসছি—এই দ্যাখ-কত হাসছি–বলে হো-হো করে হাসতে লাগলো বৌঠান। হাসতে-হাসতে হঠাৎ সে-হাসি যেন কান্নায় পরিণত হয়। গলা চিরে যায় বৌঠানের। সেই কান্নার শব্দে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পায় ভূতনাথ। চারিদিকে চেয়ে দেখে কেউ কোথাও নেই। শুধু অন্ধকার চোরকুঠুরি। ভূমিপতি চৌধুরীর অভিসার-কক্ষ। সমস্ত কলকাতা নিঃশব্দ, নিঝুম, নিশুতি। নিচে আস্তাবলে ঘোড়াদের পা ঠোকার শব্দ পর্যন্ত নেই, সেই রাতজাগা পাখীটা পর্যন্ত আর ডাকে না বাগানের আমলকি গাছটা থেকে। মনে হয় এ-যেন বড়বাড়ি নয়—এ প্রেতপুরী।
কিন্তু ভবানীপুরে গিয়ে দাঁড়ালে, রাত্রের স্বপ্ন আবার কোথায় মিলিয়ে যায়। সার-সার বাড়ি তৈরি হচ্ছে রূপচাঁদবাবুর। ইট, কাঠ, লোহা, চুন, সুরকি, ছাদ পেটানোর সুর। কলকাতা এখানে আবার যেন যৌবন ফিরে পেয়েছে। ছাদের পর ছাদ উঠছে। একএকটা বাড়ি শেষ হয়, আর নতুন লোকজন আসে গাড়ি করে। খাট, টেবিল, চেয়ার, আসবাবপত্র এসে নামে। ভরে যায় লোক শহরে। দু’দিনেই চেহারা ফিরে যায় রাস্তার।
ইদ্রিস বলে-দস্তুরির কথা বলেছিলেন বাবুকে?
—না, বলিনি ইদ্রিস।
—তা যদি বলেন তো আমিই বলতে পারি আপনার হয়ে।
–না, তোমাকে আর বলতে হবে না ইদ্রিস।
—আমি ওভারসিয়ার বাবুদের বলবো। আপনার ন্যায্য পাওনা কেন দেবে না হুজুর?
ইদ্রিসের ন্যায়-অন্যায় নিয়ে ইদ্রিসই থাক, ভূতনাথের তাতে দরকার নেই। ব্রজরাখাল তাকে আশীর্বাদ করে গিয়েছে, তার কল্যাণ হবে। ব্রজরাখালের কথা কি মিথ্যে হবে! কিন্তু জীবনে এর বেশি কিছু তো চায়নি ভূতনাথ! ফতেপুরে মঙ্গলচণ্ডীতলায় প্রণাম করে ভূতনাথ ছোটবেলায় একদিন যা কামনা করেছে, বনমালী সরকার লেন-এর নরহরি মহাপাত্রের দেবতামণ্ডলীর সামনে প্রণাম করে সেই একই প্রার্থনা সে করেছে। যেন কল্যাণ হয়। কল্যাণ শুধু নিজের নয়। সকলের কল্যাণ। ব্রজরাখালের কল্যাণ, ছোটবৌঠানের কল্যাণ, জবার কল্যাণ, বংশীর কল্যাণ—সকলের, সকলের। কাউকে বাদ দিয়ে তার নিজের কল্যাণ দরকার নেই।
সেদিন হঠাৎ ভবানীগুর দিয়ে চলতে-চলতে এলগিন রোড-এর সামনে এসেই থমকে দাঁড়ালো ভূতনাথ! ননীলালের সঙ্গে একবার দেখা হয় না।
পকেট থেকে ঠিকানা লেখা নোট বইটা বের করে একবার দেখলে বাড়িগুলোর সামনে! আশ্চর্য। সামনের বাড়িটাই ননীলালের। কী বিরাট বাড়ি! প্রাসাদ বললে চলে। সাইকেল থেকে নেমে পড়লো ভূতনাথ।
—ননীবাবু আছে? নীলালবাবু? সামনের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতে হলো।
দারোয়ান ভুল শুধরে দিলে—বাবু নেই—সাহেব আছে।
নিজেকে সামলে নিয়ে ভূতনাথ আবার বললে—সাহেব বাড়িতে আছে?
দারোয়ান বললে—সাহেব বেরিয়ে গিয়েছে।
–কখন ফিরবে?
—কিছু ঠিক নেই। দারোয়ানের উত্তরগুলো শুনতে ভালো লাগলো না অবশ্য। হয় তো তার চেহারা দেখে ঠিক অনুমান করতে পারছে না, সাহেবের সঙ্গে তার আত্মীয়তা কতখানি। তবু দারোয়ানের কথায় মন খারাপ করা বোকামি! আবার জিজ্ঞেস করলে—কালকে সন্ধ্যেবেলা এলে দেখা হবে?
-না।
—পরশু সকালবেলা?
–না।
—তারপর দিন?
—না বাবু, না। সাহেব বিলাইত চলে যাবে কাল।
–বিলেত? ননীলাল বিলেত যাবে? আবার জিজ্ঞেস করলে কালই যাবে?
–হ্যাঁ বাবুজী।
ভূতনাথ অগত্যা সাইকেল-এ উঠলো। কালকেই ননীলাল বিলেত যাচ্ছে। একবার তার আগে দেখা করা যায় না। একসঙ্গে পড়েছে দুজনে, এক স্কুলে, একই ক্লাশে। কী ভালোই যে লাগতো তখন ননীলালকে। তার হাতের লেখা চিঠিটা বোধ হয় আজো টিনের স্যুটকেসের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে। কোথা থেকে মানুষের কী হয়ে যায়। বাড়িখানার দিকে আবার পেছন ফিরে দেখলে ভূতনাথ। কত বড় বাড়ি। বড়বাড়ির চেয়েও বড়। উত্তরমুখো বাড়ি। কিন্তু সমস্ত রাস্তা জুড়ে আছে সামনের দিকটা। দক্ষিণ দিকেও কতদূর পর্যন্ত প্রসার কে জানে। সবটা এখান থেকে দেখা যায় না। জানালায়-জানলায় পর্দা। তামার প্লেট-এর ওপর ননীলালের পুরো নামটা লেখা। কেমন করে এ হলো? ও-দিকে বড়বাড়ির চৌধুরী বাবুরা কেন পড়ে যাচ্ছে, আর এদিকে এরা ওঠে কী করে? ওদের তো অনেক টাকা। ননীলালেরই তত টাকা দিন টাকা ধার করে নিয়ে গিয়েছে ছুটুকবাবুর কাছ থেকে। আজ পর্যন্ত সে-টাকা তল শোধই দিলে না। তবে কেন এমন হয়। ননীলাল অবশ্য বলেছিল একদিন—ওরা যে বসে-বসে খায়।
কিন্তু ননীলালও তত বসে খায়। কী এমন পরিশ্রম করে সে। গাড়িতে করে শুধু তো ঘুরে বেড়ায়। টাকা ওড়ায় দু’হাতে। মদ তো ননীলালও খায়। মেয়েমানুষ তো ননীলালও রাখে। কত কাণ্ডই করেছে ননী জীবনে! ছুটুকবাবুকে ওই ননীলালই তে নিয়ে গিয়েছিল মতিয়া বাঈজীর বাড়িতে! তবে?
