একদিন ভূতনাথ জিজ্ঞেস করেছিল—তোমার দোস্তভাই —নাথু সিং কোথায় গেল?
–ছুটি নিয়ে দেশে গিয়েছে এক মাসভি হলো, আর আসছে
শালাবাবু।
–তা বলো না কেন সরকারবাবুকে, আর একজন রাখতে একা দিনরাত পাহারা দিতে পারবে কেন?
তা পাহারাও আজকাল সেই রকমই দেয় ব্রিজ সিং। বন্দুকটা পাশে রেখে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে খৈনি ঘষে। উর্দির আর সে-বাহার নেই। শুধু গাড়ি-টাড়ি এলে-গেলে চিৎকার করে ওঠে—হুঁশিয়ার
–হুঁশিয়ার হো–
এদানি ইব্রাহিমের ঘরের সামনে রেড়ির তেলের বাক্স-বাতিটা আর জ্বলে না। একদিন ঝড়ে পড়ে গিয়েছে উঠোনের ওপর। তারপর থেকেই অন্ধকার। সন্ধ্যেবেলা থেকেই উঠোনটা অন্ধকার। আস্তাবল বাড়িটাতে তেমন গাড়ি-ঘোড়ার আসা-যাওয়া নেই। ছোটবাবুর ল্যাণ্ডোলেটখানা সেই যে সেদিন জানবাজার থেকে এসে ঢুকেছে ওখানে আর বোধহয় বেরোয় নি। ভালো করে ধোয়ামোছও হয় না আজকাল।
–কেমন আছো আজকাল বংশী?
আস্তে-আস্তে হাটে বংশী। এখনও দুর্বল। তেমন করে ছোটাছুটি করতে পারে না। বলে—এখন একটু ভালো আছি শালাবাবু।
—ছোটমা তোমার কেমন আছে?
–কেউ ভালো নেই শালাবাবু, কেউ ভালো নেই, সেই যে ছোটবাবু পড়েছে, আজো উঠতে পারলো না, আমি তো উঠে হেঁটে দিব্যি বেড়াচ্ছি। আজো শশী ডাক্তার এসেছিল, বললে—এখনও সময় লাগবে। শশী ডাক্তার মদ খেতে একেবারে মানা করে দিয়েছে আজ্ঞে।
ভূতনাথ বলে—তা বলে ছোটবাবু কি আর সত্যি-সত্যি মদ ছাড়তে পারবে?
বংশী বলে—না শালাবাবু, তাই তো আশ্চর্য হয়েছি, ছোটবাবু মদ আর ছোঁয় না, বলে—আমার সামনে ও-বিষ আর আনবি না, আমি খেতে চাইলেও দিবিনে আমাকে।
-সত্যি?
—আজ্ঞে, মা কালীর দিব্যি বলছি, একদিনও খায় না, আমার হাতেই তো মদের আলমারির চাবি ছিল, সব ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করে দিয়েছি—চাইলেও আর পাবে না কেউ।
-সে কি? ভূতনাথও কম অবাক হয়নি। এ-ও কি সম্ভব?
–চেহারা যদি দেখেন ছোটবাবুর তত আপনি আরো অবাক হয়ে যাবেন। এই এমনি হয়ে গিয়েছে-বলে হাতের কড়ে আঙলটা উচু করে দেখায়।
-হ্যাঁ শালাবাবু, এই এমনি রোগা হয়ে গিয়েছে। উঠতে হাঁটতে তো পারে না, কেবল শুয়ে পড়ে আছে—খুব যখন খেতে ইচ্ছে করে, তখন সোডা খায় কেবল, আস্তে-আস্তে ধরে তুলে পিঠে বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিই দিনের বেলা, আবার শুইয়ে দিই খানিক পরেই, বলে-পিঠে ঘা হয়ে গিয়েছে এক নাগাড়ে শুয়ে-শুয়ে–আমি না হলে ছোটবাবুর একদণ্ড চলে না আজকাল। একলা মানুষ কোন্ দিকে দেখি বলুন তো হুজুর।
—আর সব কোথায় গেল?
—এখন বাজার করতেও আমি, তামাক সাজতেও আমি, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবই একা।
—কেন, লোচন কোথায় গেল?
–কেন, আপনি জানেন না কিছু?
-আমি তো বেরোই সেই সকালবেলা, তারপর দুপুরবেলা ভাত খেতে আসি আধঘণ্টার জন্যে, তারপর সেই আসতে যার নাম রাত্তির হয়ে যায়।
—তা তো জানিই। লোচন তত সেই পান-বিড়ির দোকান করেছে বড়বাজারে না কোথায়, কিন্তু মধুসূদন সেই যে দেশে গেল আর আসবার নামটি নেই হুজুর, কী নেমোখহারাম দেখুন, এই বড়বাড়ির নুন খেয়ে আমরা সাতপুরুষ মানুষ হয়েছি, তোর এই সময়ে যাওয়া ভালো হলো—হ্যাঁ, না হয় বুঝলুম মাইনে পায়নি ক’মাস, আরে মাইনেটাই বড় হলো, এই যে আমরা ভাইবোনে সাত মাস মাইনে পাইনি–কিছু বলেছি?
মেজবাবু রোজ আর গাড়ি নিয়ে বেরোয় না আজকাল। যেদিন বেরোয় দেরি করে, সেদিন দেখা হয়ে যায়। সেই বড়মাঠাকরুণ, মেজমাঠাকরুণ থাকে সঙ্গে। আর থাকে হাসিনী। পানের ডিবে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে ওঠে। ভৈরববাবু আজকাল নিয়ম করে রোজ আসতে পারে না। বয়েস তত বাড়ছে। আর তেমন ফুর্তিও নাকি হয় না আজকাল। রাত বারোটা না-বাজতেই আবার মেজবাবু ফিরে আসে। ঘুমের মধ্যে গেট-এর ঘড়ঘড় শব্দ কানে আসে। আস্তাবল বাড়িতে ঘোড় এসে ঢোকে। অন্ধকার উঠোন। তারই মধ্যে পা ঠুকে-কে ইব্রাহিম গিয়ে ওঠে নিজের ঘরে।
বিধু সরকারের ঘরের সামনেও আজকাল বেশি ভিড়।
শুধু বরফওয়ালা নয়, মুদিখানার লোক আসে, কাপড়ওয়ালা আসে, গয়লা আসে, মিস্ত্রী-মজুর আসে। বিধু সরকারের মেজাজ আরো উগ্র হয়েছে। বলে—খ্যাচ খ্যাচ করিস কিসের জন্যে শুনি? পাওনা কি কখনও পাসনি? তবে এত হেনস্তা কেন? পাবি, পাবি, পাবি, ব্যস এই বলে রাখলাম। বাবুদের ধর্মের পয়সা, অধর্ম বাবুরা করবে না-তোদের দুটো পয়সা মেরে বাবুরা বড়লোক হবে নাকি!
কিন্তু রাত্রে যেন সেই সুরটা আজকাল বড় ঘন-ঘন শোনা যায়। খিড়কির দিকের সেই নারকোল গাছটার গোড়ায় একতলার সিঁড়ির নিচ থেকে প্রথমে মৃদু একটা সুর ওঠে। তারপর তার ব্যাপ্তি বাড়ে। প্রদক্ষিণ করে সমস্ত বাড়িটা। দক্ষিণের বাগানটা ঘুরে এসে যেন দাঁড়ায় একেবারে বড়বাড়ির অন্ধকার উঠোনে। চায় এদিক-ওদিক একবার। তারপর ওঠে ছাদের ওপর। তখন সেসুরটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। আকাশে-বাতাসে সেই তীব্র সুর সমস্ত অন্তরীক্ষ ছাপিয়ে এক আর্তনাদের মত আওয়াজ করে। সে-আর্তনাদে বড়বাড়ির ভিত্ পর্যন্ত যেন কেঁপে ওঠে। তারপর ভোরের দিকে যখন দক্ষিণের বাগানের আমলকি গাছটার ডাল থেকে সেই অদ্ভুত পাখীটা ডাকতে ডাকতে কোথায় হঠাৎ উড়ে যায়, তখন ধীরে-ধীরে থেমে আসে সে-সুর। তখন বুঝি আবার গিয়ে ঢুকে পড়ে সেই অন্ধকূপ কোঠরে। দিনের আলোয় লোকালয়ে বুঝি ওর বেরোনো নিষেধ।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে গিয়েও যেন আলস্য ধরে ভূতনাথের। সারা শরীর যেন ব্যথা করে। আর মন? মন কি ব্যথা করে না? কে জানে মনের খবর। নিজের মন নিয়ে কখনও মাথা ঘামাবার তো সময় হয়নি। একবার এক জায়গায় হয় তো একটু সময় হয়েছিল কিন্তু সে কথা তো ভুলে যাওয়াই ভালো। এক-একবার মনে হয়, পটেশ্বরী বৌঠানের কথা। ভাবলেই কেমন যেন ভয় করে। অত যার রূপ, অতখানি যে স্নেহ করে, ভালোবাসে, তাকে এতখানি ভয় করা যেন অন্যায়। তবু মুখ দেখাতেই কেমন যেন ভয় করে। কেমন করে মুখ দেখাবে সে। বৌঠানের মুখখানা যদি কালো দেখে, যদি দেখে সে-মুখেও হাসি নেই—তাহলে? তাহলে সহ্য করবে কী করে ভূতনাথ? যদি দেখে, বৌঠানও শীর্ণ হয়ে গিয়েছে। অত্যাচারে, রাত জাগায়, হতাশায় আর দীর্ঘশ্বাসে? তার চেয়ে না দেখা করাই ভালো। বার-বার। চোরকুইরির বারান্দার দরজাটার সামনে গিয়েও কতদিন দাঁড়িয়েছে। খিলটা খুলতে গিয়ে আবার থেমেছে। কী দেখবে সে! কী শুনবে সে!
