দারোয়ান বললে–সাহেব ভবানীপুরের নয়াকুঠিতে আছে।
-নয়া কুঠি? ভূতনাথ বুঝতে পারলে না। আবার বললে–ননীলাল সাহেব আপিস থেকে ফিরেছে আজ?
এবার দারোয়ান ভালো করে বুঝিয়ে দিলে। সাহেব নতুন বাড়ি তৈরি করেছে ভবানীপুরে, সেখানেই থাকে আজকাল। এ-বাড়িতে শুধু ননীলালের শ্যালকরা থাকে। নাবালকদের নিয়ে ননীলাল সেখানে গিয়ে উঠেছে। তাও বেশি দিন নয়, মাত্র মাস খানেক হয়েছে। এখানে আসে বটে মাঝে মাঝে। এ-বাড়িটা তো শ্বশুরবাড়ি। এখানে তার থাকাও উচিত নয়। তাছাড়া এপাড়াটাও নাকি সাহেবের পছন্দ হচ্ছিলো না। বড় মোটরগাড়ি রাস্তায় ঢোকে না। সাহেব-মেমদের আসতে-যেতে অসুবিধে। তাই ভবানীপুরে নতুন রাস্তা হয়েছে এখন এলগিন রোড-সেখানে নতুন বাড়িতে উঠে গিয়েছে। ননীলালের বিধবা শাশুড়ী থাকেন এ-বাড়িতে বড়ছেলের সঙ্গে, আর ননীলাল এলগিন রোড-এর বাড়িতে উঠে গিয়েছে মেমসাহেবকে নিয়ে।
-কত নম্বর?
পকেট থেকে নোট বইটা বার করে বাড়ির নম্বরটা টুকে রাখলে ভূতনাথ। বিলের টাকা, ইট, চুন, সুরকির ভাউচার, রাজমিস্ত্রীদের হাজরে-খাতা সব সরকারকে বুঝিয়ে দিতে হয় রোজ। সরকার সেটা বড় খাতায় তুলবে তবে ছুটি। কিন্তু এক-একদিন এই ছুটি হতেই রাত সাতটা-আটটা বেজে যায়। রূপচাঁদবাবুর সঙ্গে এক-একদিন দেখা হয়ে যায়। একটা ছোট নমস্কার করে ভূতনাথ। যেদিন ব্যস্ত থাকেন রূপচাঁদবাবু, সেদিন দেখতেই পান
ভূতনাথকে। সামনের উঠোনে সার-বন্দি হয়ে বসে থাকে কুলী, মিস্ত্রী, কারিগরের দল। হপ্তায়-হপ্তায় তাদের পেমেন্ট। রূপচাঁদবাবুর সামনে বিড়ি খায় না তারা আর বাবু এলেই সব গোলমাল থেমে যায়। তার আগে পর্যন্ত যত ঝগড়া, বকাবকি!
মিস্ত্রীরা বলে—বাবু তো ভালো লোক হুজুর—ওই সরকারটাই পাজি।
কতখানি কাজ হলো, তার মাপজোক নেয় ইঞ্জিনীয়ার-ওভারসিয়ারবাবুরা। তাদের মাপজোকের হিসেবও বড়খাতায় উঠে যায়। দামী দামী মাল কিনতে যায় ওভারসিয়ারবাবুরা।
ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে ওভারসিয়ারবাবুদের সড় থাকে। মোটা মাল কেনবার সময় কমিশন রেখে দেয় ওদের জন্যে। সে-কমিশন আবার ভাগ হয় ওদের মধ্যে আড়ালে।
বুড়ো মিস্ত্রী ইদ্রিস বলে—এ-মাসে কত পেলেন বিলবাবু?
–বারো টাকা—যা বরাবর পাই।
–তা বলছিনে, দস্তুরি কত পেলেন?
অবাক হয়ে যায় ভূতনাথ।—কীসের দস্তুরি?
—আপনাকে দেয় না বুঝি?
ইদ্রিসের কাছেই প্রথম জানতে পারে ভূতনাথ।
—আপনি এবার চাইবেন হুজুর, না চাইলে দেবে কেন?
-থাক গে, আমার ওতে দরকার নেই—ভূতনাথ কেমন যেন ভয় পায়।
–তা বলে আপনার ন্যায্য পাওনা-গণ্ডা বুঝে নেবেন না? অন্য বিলবাবুরা যে পায়।
–থাক ইদ্রিস, বাবুর কানে গেলে আবার এত কষ্টের চাকরিটা শেষকালে হয় তো চলে যাবে।
ইদ্রিস বলে—চাকরি যাবে কেন, বাবুর তো তাতে লোকসান নেই, দস্তুরি তো দেয় দোকানদারেরা।
তা হোক, তবু ওসব পথে না যাওয়াই ভালো। কী এমন তার ক্ষতি হচ্ছে। আগে পেতে সাত টাকা ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে, এখন বারে টাকা। তাছাড়া ট্রাম ভাড়ার খরচা নেই।
সরকার বলে—আপনার কথা আলাদা মশাই, আপনার সঙ্গে কার তুলনা।
—কেন?
—আপনি হলেন বাবুর পেয়ারের লোক, এই দেখুন না, সব বিলবাবুরা পায় সাত টাকা করে, আপনি ভর্তিই হলেন বারো টাকায়, আপনাকে কে ঠেকায়?
-কেন, ওকথা বলছেন সরকার মশাই, আপনাদের আশীর্বাদে চাকরি যদি থাকে তো অনেক ভাগ্যি বলতে হবে। কত জায়গায় পুজো দিচ্ছি, কালীঘাটে কতদিন গিয়ে কত মানত করে এসেছি।
সরকার মশাই-এর হাতের কাজ বোধ হয় সেদিন কম ছিল। পান মুখে পুরে দিয়ে হাসতে হাসতে বললে—আপনাকে ঠেকায় কে মশাই? দেখবেন তবে, আমাদের চাকরিটা যেন থাকে।
-সে কি বলছেন?
—ঠিকই বলছি, এই বলে রাখলুম, মনে রাখবেন, আপনি কি আর বেশিদিন বিলবাবু থাকবেন, ওভারসিয়ার হলেন বলে!
কথাটা জানাজানি হয়েছে তা হলে। সুবিনয়বাবুর বিশেষ সুপারিশেই তার চাকরি। সব কর্মচারিই যেন তাকে বেশ সন্ত্রম করে কথা বলে।
ইদ্রিস বলে—যদি দস্তুরি না দেয় তো বাবুকে বলে দিন।
সাইকেল চালিয়ে বড়বাড়ির দিকে আসতে-আসতে ভূতনাথ সেই কথাই ভাবছিল-সব চাকরিতেই ওই রেষারেষি। ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসেও সেই ঠাকুর নিয়ে কী কাণ্ডটাই না হয়ে গেল।
ওদিকে রাস্তায় সেই দলটা আবার বেরিয়েছে—“৩০শে আশ্বিন দোকানপাট সব বন্ধ থাকবে। দোকানী দোকান বন্ধ করবেন, কেরানীরা আপিসে যাবেন না, সেদিন অরন্ধন, আমাদের জাতীয় ঐক্যকে স্মরণ করবার জন্যে আমরা পরস্পরের হাতে রাখী বেঁধে দেবো-ভাই ভাই এক ঠাঁই” আর তারপর সেদিন বেলা তিনটের সময় পার্শিবাগানে এক বিরাট সভার অনুষ্ঠান হবে, বাঙলা দেশের রাজধানীতে দেশবাসীরা গড়ে তুলবেন ‘ফেডারেশন হল, সেই মিলন-মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করবেন জাতির অগ্রজ শ্রীআনন্দমোহন বসু-বন্দে মাতরম্’ তারপর সমবেত সঙ্গীত করতে-করতে চললো সবাই—
বাঙালীর পণ বাঙালীর আশা
বাঙালীর কাজ বাঙালীর ভাষা
সত্য হউক সত্য হউক
সত্য হউক হে ভগবান—
গুটি চার-পাঁচ ছেলে। রাস্তার ভিড়ের মধ্যে ওদের উপস্থিতি নজরেই পড়ে না বিশেষ। তবু কী উৎসাহ নিয়েই না বলে চলেছে। কী অদম্য উৎসাহ। রোজই এমনি করে। অথচ লোকে যে খুব উৎসাহ দেখায় তা নয়!
সাইকেল ঘুরিয়ে ভূতনাথ বনমালী সরকার লেন-এ ঢুকলো এবার।
বড়বাড়িতে আজকাল আর তেমন যেন জাঁকজমক নেই। তবু দিনের শেষে এখানে আসবার জন্যে ভূতনাথের ছটফটানির আর অন্ত থাকে না। ব্রিজ সিং এখন একাই ডিউটি করে।
