ব্রজরাখালের কথার শব্দ যেন গান হয়ে ভাসতে লাগলো বাতাসে। ভূতনাথ চুপ করে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। কান পেতে শুনতে লাগলো সে গানের সুর।
–তারপর সেই দীক্ষা, কী কঠোর সে ব্ৰত। অতি প্রত্যুষে ওঠা, দিনে একবার আহার, আরো কত কী! তারপর এল দীক্ষা নেবার দিন! নিবেদিতাকে অপরিগ্রহ, শৌচ আর ব্রতনিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করতে হবে! আজীবন রক্ষা করতে হবে সে ব্রত। হোমের আগুনে সর্বস্ব তাঁর আহুতি দিতে হবে। হোমের আগুনে ঘি, ফুল-ফল বেলপাতা, দুধ সব আহুতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্র পাঠ হলো—“যিনি সমস্ত বাসনা কামনা ত্যাগ করেছেন, যিনি বীতক্রোধ, অদ্বেষ্টা, সর্বভূতে ব্ৰহ্মদর্শী, দান, শৌচ, সত্য আর অহিংসাই যার জীবন, তিনিই ধন্য, তিনি ঈশ্বরে লগ্নচিত্ত, তাঁর সমস্তই ঈশ্বরে অপিত…”। তারপর নিবেদিতা সাষ্টাঙ্গে গুরুকে প্রণাম করলেন। বিবেকানন্দ তার কপালে ভস্মতিলক পরিয়ে দিলেন। সে তো ভস্ম নয়, সে বুঝি নিবেদিতারই জীবনের দগ্ধাবশেষ। তারপর গান হলো—“হে অগ্নি, হে পাবক, হে অমৃত, হে বনস্পতি, হে প্রাণ, নৈঃশব্দের সাক্ষী হে দৃলোক, হে গুরু, এই দেখো আমার পার্থিব যা কিছু এই অগ্নিতে আহুতি দিলাম, আহুতি দিলাম আমার অহংকে। হে অগ্নি আমায় গ্রাস করো— হরি ও তৎসৎ, হরি ওম্ তৎসৎ…’
কথা শেষ করে ব্রজরাখাল বললে—আজই সিস্টার নিবেদিতার মুখে এই গল্প শুনে আসছি কদম। এই রকম দশ-বারোটা ছেলে হলেই চলবে–তাহলেই একটা নেশন উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠবে।
তারপর হঠাৎ বললে—আজ তা হলে তোমরা এসে কদম— রাত হচ্ছে।
—কখন আবার তাহলে দেখা হচ্ছে বড়দা’?
ব্ৰজরাখাল বললে—দেখা করার কি আর দরকার আছে আমার সঙ্গে?
কদম বললে—তবু যদি কিছু প্রয়োজন হয়?
—তাহলে বেলুড়ে যেও, এ ক’দিন তো আছিই, তারপর কোথায় থাকবে জানি না।
উঠলো সবাই। সবার চোখ যেন ছল ছল করছে। আস্তে আস্তে সবাই ব্ৰজরাখালের পায়ের ধুলো নিয়ে চলে গেল। সবাই চলে যাবার পর ব্রজরাখাল একবার চাইলে ভূতনাথের দিকে। এতক্ষণ ভূতনাথ অভিভূতের মতন চেয়ে ছিল। কথা বলার সাহস হচ্ছিলো না।
ভূতনাথের পিঠে একটা প্রচণ্ড চাপড় মেরে হেসে উঠলো ব্ৰজরাখাল-তারপর কী খবর তোমার বড়কুটুম?
ভূতনাথ কী উত্তর দেবে ভেবে পেলে না। এতদিন যার জন্যে অপেক্ষা করে আছে ভূতনাথ, আর শেষে এই তার পরিণাম।
ব্ৰজরাখাল জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে বললে—কথা বলছে না যে বড়কুটুম—হলো কী?
ভুতনাথ শুধু বলতে পারলো-তুমি চললে নাকি?
—হ্যাঁ বড়কুটুম, চললুম।
–থাকবে কোথায়? খাবে কোথায়?
ব্ৰজরাখাল বললে—এখানে থাকতে তত আসিনি, আর খাবো বেলুড়েই।
—আবার কবে আসবে ব্ৰজরাখাল?
—আর তো আসবে না আমি—বলে সেই সৌম্য হাসি হাসতে লাগলে ব্রজরাখাল।
—তা হলে, বেলুড়ে তোমার দেখা পাওয়া যাবে?
—দেখা করতে যেও না তুমি বড়কুটুম—দেখা হয় তো পাবে না আর।
-কেন?
—এতদিন পরে দীক্ষা নিলুম বড়কুটুম, আগে নিইনি, কিন্তু এখন কেন নিয়েছি তা তত শুনলে।
গেট পর্যন্ত চলতে চলতে আর কোনো কথা বললে না। ব্ৰজরাখাল। ভূতনাথও চলতে লাগলো সঙ্গে-সঙ্গে।
গেট-এর কাছে আসতেই ব্রিজ সিং সেলাম করলে ব্ৰজরাখালকে। স্মিত হাসি দিয়ে ব্রজরাখাল তাকে আপ্যায়ন করলো। তারপর রাস্তায় পড়েই ব্ৰজরাখাল বললে—এবার তুমি ফের বড়কুটুম।
ভূতনাথ তবু একটু যেন দ্বিধা করতে লাগলো।
ব্ৰজরাখাল আস্তে-আস্তে চলতে লাগলো সামনের দিকে। তার যেন কোনো দিকে ভ্রক্ষেপ নেই। পেছন ফিরে একবার তাকালেও না সে।
ভূতনাথের চোখ ফেটে কান্না আসতে লাগলো। ব্ৰজরাখাল এমন নিষ্ঠুর হতে পারলে কেমন করে! কোথা থেকে কোন্ শক্তি সে আহরণ করেছে! কোন্ মন্ত্র সে পেয়েছে। ভালোবাসার কোনো মুল্যই নেই তার কাছে। না কি ভালোবাসার ওপরে, অনেক ওপরে, ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যে পরম কর্মচেতনা তাকে চিনতে পেরেছে। সিস্টার নিবেদিতা যা পেয়েছিলেন?
ভূতনাথ দৌড়ে গিয়ে আবার ব্রজরাখালকে ধরলে।
-কী? আবার কী চাও বড়কুটুম?
—আমায় তো কিছু বলে গেলে না?
—কী বলবো তোমাকে? কী শুনতে চাও? থামলো ব্ৰজরাখাল একবার।
—যা তোমার খুশি!
–কী বললে খুশি হবে?
–যা হোক কিছু, আমার পাথেয় হয়ে থাকবে।
—তবে বলি—আশীর্বাদ করি—তোমার কল্যাণ হোক।
ভূতনাথ চুপ করে রইল।
—খুশি তো?
মাথা নাড়লে ভূতনাথ।
তারপর ব্রজরাখাল আবার বনমালী সরকার লেন দিয়ে তেমনি ধীর মন্থর গতিতে চলতে লাগলো। একবার পেছন ফিরে তাকালো না পর্যন্ত।
৩৬. ব্ৰজরাখাল সেদিন ‘কল্যাণ হোক’ বলে আশীর্বাদ
ব্ৰজরাখাল সেদিন ‘কল্যাণ হোক’ বলে আশীর্বাদ করেছিল বটে। কিন্তু সত্যি কি ভূতনাথের কল্যাণ হয়েছিল। এক-একবার সন্দেহ হয় ভূতনাথের। আবার মনে হয়, কল্যাণই তো হয়েছে। ব্রজরাখালের আশীর্বাদ তত তার জীবনে সফলই হয়েছে। সমস্ত পাপ, সমস্ত প্রলোভন, সমস্ত কামনাকে যে সে ত্যাগ করতে পেরেছে, সে-ও কল্যাণ বৈকি! জবা তার জীবনে যে-ঝড় বইয়ে দিয়েছিল, কেমন করে সে-ঝড়কে সে সেদিন প্রশমিত করতে পেরেছে? আর ছোটবৌঠানের অত নিবিড় সান্নিধ্যও তত তাকে… কিন্তু সে-কথা এখন থাক!
সাইকেলে চড়ে পটলডাঙায় তাগাদায় যেতে-যেতে সেদিন ননীলালের কথা মনে হলো হঠাৎ। অনেকদিন ননীলালের সঙ্গে দেখা নেই। তা ছাড়া ননীলাল সেদিন তাকে না বলে জবাদের বাড়ি কেনই বা গিয়েছিল তাও জানা হয়নি!
পুরোনো বাড়িটার সামনে আসতেই দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে–সাহেব হ্যায়?
