কে চিনতে পারবে সেদিনের সেই গোবিন্দপুরকে! কোথাকার কে ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী। কে তার জামাই ভবানী দাস। সেই ভবানী দাসই বুঝি কালীঘাটের সেবায়েত হালদারদের পূর্বপুরুষ। আজ সেই ভবানী দাস এলেও হয় তো চিনতে পারবে না তার নামের এই জায়গাকে।
ভূতনাথ বাঁশের সিঁড়ি দিয়ে এক-একটা অসমাপ্ত বাড়ির মাথায় উঠে এক-একবার চেয়ে দেখে। যেদিন প্রথম এখানে এসেছিল তার সঙ্গেও এ-শহরের আজ কোনো মিল নেই। দিনের বেলায় এ-পাড়ায় ইঞ্জিনীয়ারের গজ ফিতে, কন্টাক্টারের হিসেব আর কুলি-মজুরের গাঁইতি আর রাত্রে অর্ধসমাপ্ত ভবানীপুর যেন একটা স্বপ্নের মতন। সাইকেল-এ চড়ে সন্ধ্যেবেলা ফেরবার সময়ে ওদিকে চাইতে চাইতে যায় ভূতনাথ। বৌবাজারের বনেদীয়ানা নেই এখানে, কিন্তু শৃঙ্খলা আছে। মেদ নাই, কিন্তু স্বাস্থ্য আছে। এ-পাড়ার বাড়িগুলোর মতো, বাড়ির অধিবাসীরাও যেন অন্যরকম। ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা ফর্সা ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে। পুরুষরা কেউ পরে চাপকান, কোটপ্যান্ট। স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ সব। রাস্তার নতুন টেলিফোন টেলিগ্রাফের পোস্টগুলো পর্যন্ত যেন সভ্যভব্য। বনেদীয়ানা না থাক, কিন্তু সুরুচি তত আছে। বেশ লাগে ভূতনাথের।
রূপচাঁদবাবু লোক ভালো। বলেছিলেন—মাইনের সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলেছেন সুবিনয়বাবু?
ভূতনাথ বলেছিল—আমার কাজ দেখে যা খুশি দেবেন।
খুশিই হয়েছিলেন রূপচাঁদবাবু। ইট-চুন-সুরকির হিসেব রাখা, রাজমিস্ত্রীদের হাজরে রাখা, কাজ তদারক করা—এই সব কাজ। কোথা থেকে কোথায়। ঝাঁ-আঁ করছে দুপুর, তারই মধ্যে হেঁটে হেঁটে শহর পাড়ি দেওয়া। তবু জীবিকার জন্যে সব করতে হয়।
খুশি নিশ্চয়ই হয়েছিলেন রূপৰ্চাদবাবু। নইলে সাইকেল কিনে দিলেন কেন! বললেন—সাইকেলটা শিখে নিন, এতে কাজের সুবিধে হবে।
দু’চাকার গাড়ি। কিন্তু যেন বিশ্বজয় করা যায় দুটো চাকার দৌলতে। সকালবেলা বেরিয়ে পড়ে ভূতনাথ বড়বাড়ি থেকে। তারপর দুপুরবেলা শুধু খেতে যাওয়া। আবার দুটো মুখে দিয়েই চলে আসা ভবানীপুরে। তারপর সন্ধ্যেবেলা গড়াতে গড়াতে কোনোদিন বা যায় জবাদের বাড়ি-বার-শিময়ে। তখন শরীরটা একটু ক্লান্ত হয় বটে, কিন্তু তবু বেশ লাগে। পুরুষ মানুষ, কাজ না করতে পেলে কেমন যেন আরো বেশি ক্লান্ত মনে হয়।
সেদিন এক কাণ্ড ঘটে গেল।
বড়বাড়িতে ঢুকছে এমন সময় ব্রিজ সিং বললে—শালাবাবু, মাস্টারবাবু আ গিয়া!
–মাস্টারবাবু? যেন বিশ্বাস হয়নি ভূতনাথের। বললে— ব্ৰজরাখালবাবু।
সত্যিই ব্রজরাখাল। আস্তাবল-বাড়ির ওপরের ঘরটা খোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে তো! তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরের সামনে যেতেই দেখলে—এ আর এক ব্ৰজরাখাল।
ব্ৰজরাখাল তখন আরো অনেকের সঙ্গে কথা বলছে। সেই কদমদা রয়েছে, নিবারণ রয়েছে, শিবনাথ রয়েছে। ভূতনাথকে দেখে শুধু একবার বললে—এসো বড়কুটুম—বলে আবার সামনের ভদ্রলোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলো।
ভূতনাথ দেখতে লাগলো–ক’ বছর আগেকার ব্রজরাখালের সঙ্গে আর যেন কোনো মিল নেই। আরো উজ্জ্বল হয়েছে গায়ের রং। সমস্ত মাথার চুল কামানো। একটা বাসন্তী রং-এর মোটা পাঞ্জাবী পরা। মোটা কাপড়।
কদমদাকে বলছে—আমার দ্বারা তোমাদের কী কাজ হবে বলো?
কদমদা’ বললে—দেশের লোকের মনের অবস্থা যা হয়েছে, তা তো আপনাকে বললাম। লর্ড কার্জনের, সেই বক্তৃতা থেকেই শুরু বলা চলে—এখন ওঁরা যা করতে চান, তা তত বুঝেছেন, একটা ‘ফেডারেশন হল তৈরি করবেন, ন্যাশনাল কংগ্রেসও ওই পথেই পা দিয়েছেন, কিন্তু অনুশীলন পার্টির মতে অন্য পথ ধরতে হবে–সশস্ত্র বিপ্লব।
ব্ৰজরাখাল বললে—আমি ওতে রাজি নই কদম। সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে আমার সব কথা হয়ে গিয়েছে। তোমরা যদি সেই আশাতে ডেকে নিয়ে এসে থাকো, তত ভুল করেছে, রাজনীতিতে আমি থাকবো না—বরং তোমাদের ক্লাব থেকে আমার নামটা কেটেই দিও।
কদম চুপ করে রইল।
ব্ৰজরাখাল বললে—রাজনীতি ছাড়া কি আর কাজ নেই? বোমা আর পিস্তলের মধ্যেই কি মোক্ষ লুকিয়ে আছ কদম? শেষ পর্যন্ত তুমিও কি ওই পথ ধরবে? মনে নেই তোমাদের সেকাহিনী? বাগবাজারে যেবার প্লেগ হলো, সিস্টার নিজে নামলেন রাস্তার দমা পরিষ্কার করতে? বস্তির মধ্যে ছেলেমেয়েরা মরছে। একটা আট বছরের ছেলে মুমূষু অবস্থায় সিস্টারের কাপড় ধরে কেঁদে উঠলো—’মা, মা, মাতাজী গো—’। সিস্টার আর ধরে রাখতে পারলেন না নিজেকে। স্বামী সদানন্দ ছিলেন কাছে, তিনি ছিনিয়ে নিয়ে এলেন সিস্টারকে। কিন্তু সিস্টারের কেবল মনে হতে লাগলো কেন তাকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না! তার কি ভালোবাসার কিছু অভাব ছিল? ভালোবাসা দিয়ে কি তবে মৃত্যুকে জয় করা যায় না! সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প কি তবে মিথ্যে?
কথা বলতে-বলতে ব্ৰজরাখালের চোখ দুটো জ্বলতে লাগলো। বলতে লাগলো ব্রজরাখাল—একদিন আমারও এমনি হয়েছিল কদম, ফুলদাসীর মৃত্যুর কথা তোমার মনে আছে—আমিও ঠিক এই কথাই ভেবেছিলাম। ভেবে কূল-কিনারা না পেয়ে লোকালয় ছেড়ে আলমোড়ায় চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে এই প্রশ্নই কেবল করেছি অন্তর্যামীকে! কিন্তু আজ আমাকে এর উত্তর দিলেন সিস্টার নিবেদিতা নিজে। সিস্টার নিবেদিতারও এমনিই হয়েছিলো সেদিন, সেই ১৮৯৯ সালে।
নিবারণ বললে—কী বললেন তিনি?
ব্ৰজরাখাল বললে তিনি যা বললেন, তোমাদের তা মনে লাগবে না ভাই, তবু বলি—সেদিন সিস্টার দিক খুঁজে না পেয়ে এই প্রশ্নই করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দকে—কী সে ত্যাগের মন্ত্র? কোন্ ত্যাগ জীবন-ত্যাগের চেয়েও বড়? সুযোগ বুঝে বিবেকানন্দ বুঝিয়ে দিলেন তাঁকে—’ভালোবাসার ঊর্ধ্বে যে কর্ম তাকে চিনতে শেখো, সৃষ্টির আনন্দে নিঝরিত স্রষ্টার যে প্রেম, তাই-ই তাঁর কর্ম’—তখন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ নিবেদিতা বললেন— আমাকে সেই ব্ৰতেই দীক্ষা দিন আপনি।
