জবা প্রথমটায় কিছু বললে না। তারপর খানিক থেমে বললে—আপনি সত্যিই একটা বিয়ে করে ফেলুন।
ভূতনাথ বললে—আর যে-জন্যেই আসি, উপদেশ শোনবার জন্যে তোমার কাছে আসি না কিন্তু জবা।
জবা বললে—কিন্তু তা ছাড়া তো আর উপায়ও দেখছি না কোনো!
ভূতনাথ এবার জোরে হেসে উঠলো। বললে—উপায় খুঁজতে যেন তোমায় মাথার দিব্যি দিয়েছি আমি।
জবা কিন্তু হাসলো না। বললে—তবে আজ আপনাকে খুলেই বলি ভূতনাথবাবু, সুপবিত্রকে বাইরে থেকে যা বোঝেন ও তা নয়, সব বোঝে। শুধু কথা বলে কম, কিন্তু অত প্রখর অনুভূতি বুঝি কম মানুষেরই আছে। আপনাকে যা বললাম ওকেও যদি তাই বলতাম—ও বোধহয় আত্মহত্যা করতে কিম্বা হয় তো সন্ন্যাসী হয়ে যেতে—কিম্বা পাগল-ওকে আপনি জানেন না ঠিক…
ভূতনাথ এবার চুপ করে রইল।
কিন্তু সুপবিত্রর কথা বলতে গিয়ে জবাও যেন আত্মহারা হয়ে যায়। হাতের ছুঁচ আপনিই কখন থেমে আসে। মনে হয় যেন নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলে চলেছে জবা। সামনে ভূতনাথ রয়েছে এ-জ্ঞান আর নেই তখন। বলে—একদিন ওর সঙ্গে ভালো করে কথা বলিনি বলে ও তিনরাত ঘুমোয়নি, জানেন—ওর মা’র কাছে শুনেছি, সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরেছে, কেউ জানে না, তিন দিন খায়নি পর্যন্ত—শেষে যখন ডেকে পাঠালুম, তখন দেখি উস্কোখুস্কো চুল, চোখ লাল। বললাম—এতদিন আসোনি কেন? ও কিছু কথা বললে না। বললাম—এমন পাগলামি করলে কি সংসারে বেঁচে থাকা চলে? দুঃখ সইতে হবে, কষ্ট করতে হবে, তবে তো জীবন! জীবন সুন্দর বটে, কিন্তু জীবন তো আবার নিষ্ঠুরও এতে অল্পে মন-খারাপ করলে চলবে কেন? বিশেষ করে পুরুষমানুষ না তুমি?
—তবু ওর মুখ দিয়ে কথা বেরুলো না।
জবা আবার বলে—ও এমনি, ঠিক এমন ধরনের পুরুষমানুষ আজকালকার যুগে অচল, তবু এমন নিষ্ঠাও কারো দেখিনি। এমন করে সত্যিকারের ভালোবাসা, এমন একাগ্রতা কার আছে ভূতনাথবাবু?
ভূতনাথও দেখেছে। অনেকদিন হঠাৎ সুবিনয়বাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখেছে—সুবিনয়বাবু হয় তো নিজের ঘরে শুয়ে-শুয়ে বই পড়ছেন। আর ওদিকে জবা নিজের সেলাই নিয়ে ব্যস্ত, আর সুপবিত্র একমনে জবার মুখের দিকে চেয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। কোনো দিকে খেয়াল নেই। যেন বাইরের জ্ঞান লোপ পেয়েছে। এমনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কথা নেই বার্তা নেই। একজন শুধু চুপচাপ কাজ করে চলেছে আর একজন একমনে তাকে দেখছে।
জবা বলে—এ ওর স্বভাব, ভালোবাসা বোধ হয় এক-এক জনের স্বভাব থাকে, ওরও তাই।
ভূতনাথ বললে—সুপবিত্রকে তো বুঝলুম—কিন্তু তোমার কথা! তুমিও কি…।
জবা হঠাৎ বলে—ওই যাঃ, তরকারি চাপিয়ে এসেছি উনুনে, দেখে আসুন তো কড়ায় জল আছে কিনা, জল যদি শুকিয়ে গিয়ে থাকে তো একটু জল দিয়ে আসবেন।
আজ কিন্তু ভূতনাথকে দেখেই জবা বললে-বাবার চিঠি পেয়েছিলেন তো?
ভূতনাথ বললে–হ্যাঁ, তাই তো এলাম।
জবা বললে—ওপরে যান, বাবা আপনার একটা চাকরি না করে দিয়ে আর ছাড়বেন না।
সুবিনয়বাবুর ঘরে যেতেই ভূতনাথ দেখলে তিনি তারই প্রতীক্ষা করছেন। বললেন—এসে গিয়েছো ভূতনাথবাবু, এসো এসো, তোমার কথাই ভাবছিলাম।
সুবিনয়বাবু খানিক থেমে বললেন—আমার চিঠি পেয়েছিলে তো ভূতনাথবাবু? রূপচাঁদবাবু নিজে এসেছিলেন এখানে। বলছিলেন—লোক আমার এখনি চাই—বড় সদাশয় লোক, তোমার কোনো কষ্ট হবে না।
ভূতনাথ বললে—কী বলে যে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো, আমার বড় অভাব চলছিল।
-সে কি ভূতনাথবাবু, তোমাকে কাজ খুঁজে দেওয়া আমার একটা কর্তব্য যে—ব্রজরাখালবাবুকে আমি নিজে কথা দিয়েছিলাম। তা ছাড়া আমার কাছে এতদিন তুমি একনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলে! আর এ-কাজও বিশেষ শক্ত নয়, তবে বাইরে বাইরে ঘঘারাঘুরি করতে হবে, বাড়ি তৈরি হচ্ছে, সেই সব তদারক, চুনসুরকির হিসেব রাখা—কখনও এ-সব কাজ করেছো ভূতনাথবাবু?
–না, আপনার কাছেই আমার প্রথম চাকরি।
–করতে পারবে তো? হিসেব রাখতে হবে রাজ-মিস্ত্রীদের কাজের। আর বাড়িও তো একটা নয়, চারিদিকেই বাড়ি তৈরি হচ্ছে।
—আপিসটা কোথায়?
—কাজ তোমায় ভবনীপুরেই করতে হবে, ওই সব অঞ্চলেই বাড়ি তৈরি হচ্ছে কিনা, আগে তো ও সব অঞ্চল বাদা জঙ্গল ছিল, এখন দেখবে কেবল সব উকিল ব্যারিস্টারদের বাড়ি। চেনা যাবে
কিছু, নতুন-নতুন রাস্তা হচ্ছে, শহর বাড়ছে যে, লোকও কত বাড়ছে দেখো না কলকাতার, তা ছাড়া ট্রাম হয়ে যাতায়াতেরও
সুবিধে হয়েছে। তা এ-কাজ পারবে তো তুমি?
—আমি আপনার আশীর্বাদে সব কাজই পারবো।
–তা হলে আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি নিয়ে যাও।
জবা এল।
সুবিনয়বাবু বললেন—দুটো জিনিষ সম্বন্ধে আমার শেষ কর্তব্য ছিল মা, একটা ভূতনাথবাবুর চাকরি, সেটা হলো—আর বাকি রইল তোমার বিয়েটা—তা সেটারও আর দেরি নেই। তারপরে আমার সংসারের ওপর আর কোনো কর্তব্য নেই—তখন আমি ছুটি নেবো মা। এবারের মাঘোৎসবই হয় তো আমার জীবনের শেষ উৎসব।
জবা বললে—বাবা–
রাস্তায় বেরিয়ে ভূতনাথ একবার ভাবলে আজ বৃহস্পতিবার, বারবেলা। আজ হয় তো না যাওয়াই ভালো। কাল সকালে গেলেই চলবে। সেই কোথায় ভবানীপুর। সে তো কাছে নয়!
ওদিকে কলকাতা আর এদিকে ভবানীপুর।
নতুন শহর গড়ছে এদিকে। সব বাড়ি নতুন। সব রাস্তা নতুন। শহর যেন আর এক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে এখানে। বিংশ শতাব্দীর নবজাতক এ। ওদিকে গঙ্গার ধারে-ধারে লম্বা-লম্বা চিমনিওয়ালা যত কল-কারখানার সঙ্গে এ-শহরের যেন কোথায় যোগ আছে। এইখানে যেন রাত্রে বিশ্রাম করতে আসে ওপারের ধূলি-ধূসর ভাবনাগুলো। আর হাইকোর্টের কূট-বিচার শেষ করে নথিপত্রগুলো এখানে এসে বুঝি জিরিয়ে নেয় একটু। বাড়ির সামনে নেমপ্লেট-এ মালিকদের নাম-ধাম পরিচয়টীকা। কেউ ব্যারিস্টার, কেউ ইঞ্জিনীয়ার, কেউ নতুন ব্যবসায়ী, কেউ দালাল। বড় গঙ্গার জেটিগুলো জাহাজে-জাহাজে ভর-ভরাট। পাট আর ধান, গালা আর তুলো সব এসে জমেছে জাহাজে। খাজাঞ্চীখানার কেরানীদের কলমের আর কামাই নেই বুঝি। মনে হয়-খাজাঞ্চীখানাগুলো বড়বাজারেই থাক আর যেখানেই থাক, তার চাবিগুলো যেন আজকাল আসে এখানে। এই ভবানীপুরে। ভবানীপুরের নতুন পাড়ায়।
