শুনতে শুনতে এক-একবার চোখ খুলে দেখে ভূতনাথ। সুপবিত্র চোখ বুজে আছে। আবারও চোখ বোজা। কেমন যেন লজ্জা হয়। ভূতনাথও চোখ দুটো বুজে নির্বিকার হয়ে শোনে তখন।
তারপর উপাসনার শেষে জবা বলে—সুপবিত্র, এবার তুমি বাড়ি যাও।
সুপবিত্রর বোধ হয় যাবার ইচ্ছে হয় না। বলে—এখনও তো রাত হয় নি বেশি—আর একটু থাকি না।
জবা বলে—তা হোক, বেশি রাত করো না, তোমার শরীর ভালো নেই।
সুপবিত্র বলে—আজকাল তো আমি একটু ভালোই আছি।
-কই ভালো আছছ, দিন-দিন চেহারা কী হচ্ছে দেখছে, আয়নাতে চেহারাটা ভালো করে দেখে একবার।
আর বাক্যব্যয় না করে সুপবিত্র চলে যায় অবশেষে।
কিন্তু চলে যাবার পরেই যেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায় জবা। মুখ দেখে বোঝা যায় কেমন যেন চিন্তিত। বলে—এত রাত্রে সুপবিত্রকে একলা ছেড়ে দেওয়া উচিত হলো না–যা ভুলো মন।
ভূতনাথ বলে—একবার দেখে আসবো বাড়িতে পৌচেছে কিনা?
জবা যেন এই প্রশ্নই চাইছিলো। বলে—দেখে আসুন না, বেশি তত দূর নয়, চট করে যাবেন আর আসবেন, শুধু জিজ্ঞেস করবেন বাড়িতে পৌচেছে কিনা।
সুবিনয়বাবু হঠাৎ ডাকেন—মা—
জবা তাড়াতাড়ি ছুটে আসে—আমাকে ডাকছিলেন বাবা?
-রাত হয়ে যাচ্ছে, ভূতনাথবাবুকে তুমি এখনও ছাড়লে মা?
জবা হেসে ওঠে—রাত কোথায় বাবা, ভূতনাথবাবু পাড়াগাঁয়ের ছেলে, অন্ধকারে বেড়ানো ওঁর বেশ অভ্যেস আছে।
ভূতনাথ বলে—না, রাত তো বেশি হয়নি।
জবা ডাকে। বলে–আসুন তো আমার সঙ্গে।
ঘরের বাইরে এসে বলে—আপনি তো আসেন আমার সঙ্গে দেখা করতে—তবে বাবার কাছে বসে থাকেন যে দিনরাত? চলে আসুন।
তারপর জবা নিয়ে আসে তার নিজের ঘরে। বলে—শুধু শুধু বসে থাকলে চলবে না—এই কাপড়টা ধরুন তো। জবা নিজের বিয়ের জন্যে জামা তৈরি করছে। কাপড় কিনেছে। জামাগুলো নিজের হাতে তৈরি করছে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করে—আর বাকি রইল কী কী?
জবা বলে—সুপবিত্রর জন্যে বাবা যা যা দেবেন সব তো হয়ে গিয়েছে। তা ওর তো পছন্দ বলে কোনো জিনিষ নেই, আমাকেই সব করতে হয়েছে–কিন্তু আমার জিনিষগুলোই এখনও হয়ে উঠলো না সব।
-কিন্তু আর তো মাত্র মাস দু’এক বাকি!
জবা বললে—আর একটা কাজ বাকি—বাবা সব নাম-ঠিকানা দিয়েছেন—সেইটে দেখে একটা লিস্ট করতে হবে—আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলকে নেমন্তন্ন করে আসা। ওটা আপনাকেই করতে হবে, কিন্তু।
ভূতনাথ বললে—আমাকে তো দিলেই আমি করি।
—সব কাজ কি আপনার মুখের কাছে এগিয়ে দিতে হবে নাকি? সারাদিনই তো আপনার ছুটি, সকালে খেয়ে-দেয়ে চলে আসলেই পারেন?
-আমাকে তো এতদিন বলেনি।
—সব কাজের কথা বলতে হবে আমাকে? নিজেরই তো আপনার বোঝা উচিত। আমি কোন্ কাজটা কখন করি বলুন তো? সারাদিন দেখছেন তো সংসার নিয়ে ব্যস্ত, তারপর বাবারও কত কাজ করতে হয় আমাকে—এগুলোও যদি আপনি না করেন, তাহলে আমার আর কি উপকার হলো?
ভূতনাথ বললে—এতদিন স্পষ্ট করে বলোনি তো-আমার এ-বাড়িতে ঘন-ঘন আসাটা তোমার ভালো লাগবে কিনা তাই-ই তো জানতাম না।
লাগবে, লাগবে, লাগবে, ভালো লাগবে। গলা বাড়িয়ে এ-কথাটা না বললে যেন বোঝেন না আপনি। এদিকে এত সেয়ানা হয়েছেন আর এটা বুঝতে পারেন না?
-এবার থেকে জানা রইল।
—হ্যাঁ, জেনে রাখুন, আর ভুলে যাবেন না যেন কখনও, আপনি এলে কত কাজ করিয়ে নিই দেখেন না, সুপবিত্র তো ওই রকম, বাবাও তো দেখছেন অসুস্থ, অন্য একটা লোক নেই যে, সাহায্য করে। আপনি এলে উপকার হয় এ তো সহজ কথা!!
—আমি তো বলেই রেখেছিলাম, আমাকে দিয়ে তোমার কখনও কোনো উপকার হলে আমি ধন্য হয়ে যাবো।
–কিন্তু সেটা কি আমাকে চিৎকার করে বলতে হবে—ওগো আমার একটা উপকার করে দিয়ে যান আপনি।
–না বললে আমি বুঝবে কী করে?
—না বলতে তো আমার অনেক কথাই বুঝেছিলেন—আর এটা বুঝবেন না?
-তবু মুখ থেকে শুনতে ভালো লাগে তো!
জবা বললে—এই তো সেদিন, সুপবিত্রর তিন দিন দেখা নেই, ভাবছিলাম অসুখ-বিসুখ হলো নাকি—এমন তো কখনও করে না, একবার করে রোজ আসেই উপাসনার সময়টা। আমি একলাই বা কার সঙ্গে যাই—কই, আপনার তো দেখে আসা উচিত ছিল?
ভূতনাথ চুপ করে রইল। তারপর বললে—তা একবার শুধু মুখ ফুটে বললেই পারতে।
—আমি বলবো কেন, আপনার তো বুঝে নেওয়া উচিৎ ছিল।
-কিন্তু সকলের বুদ্ধি কি সমান হয় জবা, নইলে সবাই তো এম-এ. পাশ করে ল’ পাশ করতে পারতো সুপবিত্রবাবুর মতন! আর তোমার মতন স্ত্রী পেতো! বলে হো-হো করে হেসে উঠলো ভূতনাথ।
জবা কিন্তু হাসতে পারলো না। জামা সেলাই করতে করতে হঠাৎ মুখ তুলে বললে—আমি কি সুপবিত্রর তুলনা করেছি?
ভূতনাথ বললে—তুমি করবে কেন, তুলনা করছি আমিই কথাটা হঠাৎ মনে এল কিনা!
জবা বললে—হঠাৎ এমন ধারা কথা মনে আসাও তো ভালো নয় আপনার!
ভূতনাথ বললে—ঠিক বলেছো জবা, কিন্তু মন তত বোঝে না।
জবা আবার সেলাই-এর দিকে মন দিয়ে বললে—মনকে বশ করতে শিখুন—ভালো হবে তাতে।
ভূতনাথ বললে—আমার ভালো হয়ে আর দরকার নেই জবা, আর তা ছাড়া এ-সংসারে সকলেরই যদি ভালো হয় তো খারাপ হবে কার?
-খারাপ বুঝি কারো-না-কারোর হতেই হবে?
ভূতনাথ বললে—নিশ্চয়ই, নইলে ভালোরও তো একটা শেষ আছে। সব ভালোগুলো সবাই কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নেবার পর, কারোর ভাগ্যে তো খারাপগুলোই পড়ে থাকবে—আমি সেই দলে।
জবা আবার হাসলো। বললে—ভালো মেয়ে শুধু আমি একলাই নই ভূতনাথবাবু, খুঁজলে আমার মতো অনেক মেয়েই পাবেন।
ভুতনাথ বললে—যখন বুঝতেই পেরেছে কথাটা, তখন বলি— ততো ভাললাতে আমার দরকার নেই।
