ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আর পুলিশ কখন গেল?
মধুসুদন বললে—শেষকালে পুলিশের বড় সাহেব কাল এল।
-কখন?
—রাত তখন প্রায় তিনটে। মেজবাবু ডেকে পাঠালেন। সারা রাত্তির আমরা কেউ ঘুমোইনি হুজুর, লোচন নাগাড়ে তামাক সেজে গিয়েছে, আমি আর বিধু সরকার ঠায় দাঁড়িয়ে, ভেতরে হাসি-গল্প হচ্ছে, খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে, সেই রাত্তিরে গাড়ি বেরলো-সরকার মশাই সেই রাত্তিরে আবার খাজাঞ্চীখানার দরজা খোলে।
-কেন?
-টাকা-কড়ি তো নেয় ওরা। হয় তো সিধে নিয়ে গেল কিছু… গুলুম যখন, তখন গঙ্গাযাত্রীদের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, সরকারমশাই-এর আর শোয়া হলো না, ভোরবেলাই বাজারে চলে গেল মাছ আনতে, থানায় সিধে পাঠাতে হবে। মেজবাবু তখন বললে-আলমারি খোল্।
ভূতনাথ চলে আসছিলো। হঠাৎ মনে পড়লো আর একটা কথা!—চুনীদাসীর খবর কিছু জানে মধুসূদন?
—সে জানবার আর সময় পেলাম কই শালাবাবু। এখন যাচ্ছি–বাজারে যাবো, অমনি চাঁদনীটা টপ করে ঘুরে দেখে আসবো।
মধুসূদন চলে যেতেই বংশী বললে—ছোটমা কী বললে শালাবাবু?
পটেশ্বরী বৌঠানের কথা ভূতনাথেরও অনেকবার মনে হয়েছে। কাল অমন করে বরানগর যেতে-যেতেও যাওয়া হলো না, তারপর আর একবার দেখা হওয়া উচিত ছিল। চিন্তার কাছে শুনেছিল আবার নাকি সেই ছাইভস্ম খেয়েছে। এখন সারারাত উপোস করার পর কেমন আছে কে জানে!
চোরকুঠুরির ধারে গিয়ে একবার দাঁড়িয়েছিল ভূতনাথ। ছোট দরজাটার ওপাশের বারান্দায় তখন সিন্ধু আর গিরির গলার শব্দ আসছে। কেমন যেন লজ্জা সঙ্কোচ হয়। ভর-সকাল বেলা। পুবমুখো বারান্দা। রোদে একেবারে ছেয়ে গিয়েছে। এমন সময় কখনও যায় নি ভূতনাথ। অতগুলো চোখের সামনে দিয়ে হুট হুট করে ছোটবৌঠানের ঘরে যাওয়া। কে কী বলবে! তা ছাড়া বংশী নেই আজ। বংশী থাকলে সে ঠিক সময়-সুযোগ বুঝে টুক করে নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে দেয় বৌঠানের ঘরে। আশে-পাশে চিন্তারও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
বংশী বললে—আজকে কী খাবো শালাবাবু?
ভূতনাথ বললে-জল-সাবু খালি। আমি কাল চিন্তাকে বলে দিয়েছি।
–দেখুন তো, কে এসব করে, ওদিকে ছোটবাবুর অসুখ, ছোটমা’র কী অবস্থা কে জানে, আর আমি রইলাম পড়ে, আমার আবার জল-সাবু হ্যান্-ত্যান-মাস্টারবাবু থাকলে একটা বড়ি দিয়ে দিতেন আর সব সেরে যেতে আজ্ঞে এক দণ্ডে।
ভূতনাথ বললে-কপালের গেরো বংশী—তুই কি করবি বল?
বংশী বললে—আপনি আজকের দিনটা কোথাও আর বেরোবেন না শালাবাবু—ছোটমা কখন কী করে।
ভূতনাথ তা জানতত। তবু না বেরিয়েও উপায় ছিল না।
বংশী বললে—যদি বেরোন, তো শীগগির-শীগগির কিন্তু বাড়ি ফিরবেন হুজুর।
—যাবো আর আসবো, বার-শিমলেয় যেতে কতটুকু আর পথ। হেঁটে গেলেও বেশি সময় লাগবার কথা নয়। সুবিনয়বাবুর চিঠি পেয়ে না-যাওয়াটা উচিত নয়। লিখেছিলেন—চাকরির একটা সন্ধান হয়েছে। এসে একটা চিঠি নিয়ে যেতে হবে। ঠিকেদারের কাছে কাজ। বাড়ি তৈরির ঠিকেদার। সেই কাজ তদারক করা, দেখা। লোকজন খাটানো। হিসেবপত্তোর রাখা। এই সব।
কিন্তু আজো মনে আছে সেদিন সুবিনয়বাবুর মুখে যে উল্লাস দেখতে পেয়েছিল ভূতনাথ, তা আর কখনও দেখে নি। মুমুষু সুবিনয়বাবু। চুপচাপ শুয়ে থাকেন। শহরের প্রান্তে এসে বসবাস করছেন। চাকরবাকর, কর্মচারি সমস্ত ঐশ্বর্য-আড়ম্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও যেন এতটুকু দুঃখ নেই। মাঝে-মাঝে গান করেন। হয় একলা, নয় তো জবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে।
জবা গান গাইতে-গাইতেই হঠাৎ থেমে যায়। বলে—বাবা ভাত চড়িয়ে এসেছি, পুড়ে গেল বোধ হয়, দেখে আসি।
সুবিনয়বাবু বলেন—দুজন লোকের খাওয়া, অত ব্যস্ত হয়ে–না মা।
জবা বলে—বা রে, দুজন লোক বলেই তো ভালো করে রান্না করা দরকার!
সুবিনয়বাবু বলেন—বাবা-মা’র কাছে বলরামপুরে মানুষ হয়েছে কিনা, আর আমার মাও খুব রাঁধতে ভালোবাসতেন, বুঝলে ভূতনাথবাবু! বলরামপুরে যখন ছোটবেলায় ছিলাম, কত রকম রান্না যে খেয়েছি মায়ের, বাবা ছিলেন ভোজনরসিক-জবাকে নিজের হাতে সব শিখিয়েছিলেন আমার মা।
মাঝারি বাড়ি। তবু পরিপাটি করে সমস্ত গুছিয়ে রেখেছে জবা। রাতারাতি এতখানি ঐশ্বর্য থেকে এমন মধ্যবিত্ত পর্যায়ে নেমে আসতে জবারও যেন কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়। কত সহজ করে নিয়েছে নিজেকে। সাবান দিয়ে কাপড় কেচে শুকোতে দেয় উঠোনের দড়িতে। ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে ঘরগুলো।
জবা বলে—অমন হাঁ করে দেখছেন কী, নিন, এগুলো নিঙড়ে মেলে দিন দড়িতে?
বাইরের কাজ করবার জন্যে একজন ঝি আছে শুধু বাড়িতে। বাজারটা করে নিয়ে আসে। ফাইফরমাশ খাটে। তারপর সন্ধ্যে হবার আগেই সে নিজের বাড়ি চলে যায়। একদিন নিজের জলটা যে নিজে গড়িয়ে খেতে পারতো না, তার এই পরিবর্তন দেখে বাক হয়ে যেতে হয়।
সুবিনয়বাবু বলেন—মা, এবার উপাসনার ব্যবস্থা করো, পাচটা বাজতে চললো যে।
উপাসনা ঘরে আস্তে-আস্তে ধরে নিয়ে এসে বসাতে হয় সুবিনয়বাবুকে! এই ঘরটাই বড়। মাঝখানে বেদীর ওপর গালচে পাতা হয়। ধুপ-ধুনো জ্বেলে দেয় জবা। তারপর সুপবিত্র গিয়ে বসে একধারে। মাঝখানে জবা। আর তার পাশে ভূতনাথ।
সুবিনয়বাবুর ইঙ্গিতে জবা গান ধরে–
তার নাম পরশ রতন
পাপী-হৃদয় তাপ হরণ—
প্রসাদ তার শান্তিরূপে ভকত হৃদয়ে জাগে–
তারপর সুবিনয়বাবু প্রার্থনা শুরু করেন–
নমঃ সম্ভবায় চ ময়োভলায় চ। সেই সুখকরকে নমস্কার করি। কল্যাণকরকে নমস্কার করি। কিন্তু কল্যাণকর শুধু সুখকর নন, তিনি যে দুঃখকর। দুঃখের আঘাত থেকে আমাদের মনকে ভয়ে ভয়ে কেবলই বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করলে জগতে আমাদের অসম্পূর্ণভাবে বাস করা হয়। যিনি সুখকর, তাঁকে প্রণাম করো এবং যিনি দুঃখকর তাকেও প্রণাম করো-তাহলেই যিনি শিব, যিনি শিবতর তাঁকেই প্রণাম করা হবে…
