ভূতনাথ ভাত খেতে-খেতে একবার আরশোলাটার দিকে চেয়ে, দেখলে। মনে হলো যেন আরশোলাটাও তার দিকে চেয়ে দেখছে। অদ্ভুত বাদামি রং। চোখের চারপাশে গোল পাঁশুটে দাগ। কী মতলব করছে বসে-বসে কে জানে। হয় তো আলো দেখে বিব্রত হয়েছে। কিম্বা হয় তো ভাত খাওয়া শেষ হবার পর এটো বাসন চাটবার লোভে অপেক্ষা করছে। কী খেয়ে ওরা বাঁচে কে জানে। কতটুকু প্রাণ ওদের! কোথায় থাকে! এই ঘরের মধ্যেই হয় তো কোনো গর্ত আছে। সেখানে ডিম পাড়ে আর এটো খেয়ে জীবন ধারণ করে। আরশোলাটার দিকে চেয়ে থাকতে-থাকতে অদ্ভুত সব চিন্তা মাথায় এল ভূতনাথের। ও-ও তো এ-বাড়ির আশ্রিত। তার সঙ্গে ওই আরশোলাটার তফাৎ কী!
হঠাৎ মনে হলো যেন আরশোলাটা নড়তে শুরু করেছে। ঠিক তার ভাতের থালাটা লক্ষ্য করে যে আসছে তা নয়, কিন্তু সেইটেই যেন লক্ষ্য। প্রথমে উত্তর দিকে চলতে লাগলো, তারপর অকারণেই হঠাৎ পুব দিকে মুখ ফেরালো। তারপর এদিক-ওদিক দেখে একবার শুঁড় নাড়াতে লাগলো। তারপর আর নড়ে না। মনে হলো যেন এদিকে আর আসবে না।
ভূতনাথ নিজের মনেই ভাত খেতে লাগলো এবার। না, আর সে ওদিকে দেখবে না। সমস্ত শরীর যেন তার শিরশির করে উঠছে। কত অদ্ভুত সব সৃষ্টি। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, ওই আরশোলাটাও তো সেই তঁরই সৃষ্টি। কিন্তু এমন বিপরীত সৃষ্টি একই হাতে কী করে সম্ভব! একবার অন্যমনস্কভাবে হঠাৎ আবার ভূতনাথের চোখ গিয়ে পড়লো আরশোলাটার ওপর। এবার মনে হলো, আস্তে-আস্তে আরশোলাটা যেন তার দিকেই আসছে!
আরও কাছে এল। আরো কাছে। এবার খুব সন্তর্পণে কাছে এসে ঠিক তার থালায় মুখ দিতেই…
—দাদা কেমন আছে, জানেন?
ভূতনাথের যেন চমক ভাঙলো এবার। ঘরে কেউ নেই। প্রশ্নটা এল দরজার আড়াল থেকে।–কে, বংশী? বংশীর কথা বলছে?
-হ্যাঁ।
–দেখে এলাম তো, জ্বর হয়েছে খুব।
—আজ কিছু খাবে দাদা?
—আজ আর কিছু খাবার দরকার নেই, আজ রাতটা উপোসই থাক।
হঠাৎ মনে হলো আরশোলাটা যেন থালার ধারে মুখ লাগিয়ে কী খাচ্ছে। মুখ নড়ছে না। শরীর নড়ছে না। শুধু শুডটা যেন অল্প-অল্প হেলছে দুলছে। ভূতনাথ থালাটা একবার নাড়িয়ে দিলে। যদি ভয় পেয়ে চলে যায় তো যাক। কিন্তু অদ্ভুত নির্ভীক এই আরশোলাটা! নড়ে না চড়ে না। কাঠ হয়ে লেগে রইল থালার গায়ে! ভূতনাথের শরীর আবার শিরশির করতে লাগলো।
–ছোটমা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, জানেন?
ভূতনাথ খেতে-খেতে মুখ তুললো। বললে—অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন কেন?
দরজার আড়াল থেকে আবার সেই গলা। বাড়িতে এসেই ছোটবাবুর খবর পেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে অজ্ঞান।
—তারপর?
—মাথায় বরফ দিয়ে-দিয়ে এখন জ্ঞান হয়েছে একটু—আপনার কথা বলছিলেন।
—আমায় ডাকছিলেন নাকি?
–-হ্যাঁ, আমি ডাকতে গিয়েছিলাম, আপনাকে পেলাম না ঘরে। আমার বড় ভয় করছিল। চোখ দেখে মনে হচ্ছিলো ঘোট বুঝি বাঁচবে না, একলা তখন কী যে করি, মেজমাকে খবর দিলাম, বড়মাকে খবর দিলাম, শেষে বরফ আনিয়ে মাথায় দিতেই–
—এখন কেমন আছেন?
-এখন একটু ভালো, সারাদিন তো উপোস দিয়েছেন, পেটে কিছুই পড়েনি, আমি ছোটবাবুর পা ছোঁয়া জল আনতে পাঠিয়েছিলাম, দাদা তো নেই, বেণী বললে-ছোটবাবু পা ছুঁড়ে জলের বাটি ফেলে দিলেন, পাথরের বাটি তো, বাটিটাও ভেঙে গিয়েছে। ছোটমার কিছু খাওয়া হয়নি, এখন একটু ওষুধ খেতে চাইছিলেন।
—ওষুধ? কী ওষুধ?
–যে-ওষুধ খান রোজ।
প্রথমটা বুঝতে পারেনি ভূতনাথ। তারপর হঠাৎ খেয়াল হলো। তাই তো! ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে—ওটা কি এখনও খান রোজ?
—হ্যাঁ, রোজই তো খান।
রোজই খায় বৌঠান! কেমন যেন লাগলো ভূতনাথের। খাওয়ার পর উঠে আসতে গিয়ে হঠাৎ পেছন ফিরে একবার দেখলে ভূতনাথ। আরশোলাটা এবার তার থালার ওপর একেবারে উঠে বসেছে। কেমন ঘিনঘিন করতে লাগলো সারা শরীরটা।
তারপর বিছানায় শুয়েও অন্ধকারের মধ্যে মনে হলো যেন অতিকায় একটা আরশোলা তার দিকে মিটমিট করে চাইছে। তারপরেই মনে হলো, ওটা আরশোলা নয়, তারই বিকৃত মন কুৎসিত একটা জীবের রূপ নিয়ে তাকে গ্রাস করতে আসছে বুঝি। চোখের চারদিকে তেমনি পাঁশুটে দাগ, লম্বা-লম্বা শুড়, অনিশ্চিত গতি। তেমনি বিবর্ণ, কুৎসিত। তেমনি বীভৎস!
৩৫. দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত। আর রাত গড়িয়ে সকাল।
কিন্তু তবু অন্যদিনের সকালের চেয়ে আজকের সকালের যেন অনেক অফাৎ। আজ দাসু জমাদারের ঝাটার শব্দ যেন অন্যদিনের চেয়ে মৃদু। আজ চিৎকার কম। সবাই যেন সন্ত্রস্ত। সচকিত। ভেতর বাড়িতে সৌদামিনীর গলায় ঝাঝ নেই তেমন। আজও ঘোড়ার ডলাই-মলাই চলছে আস্তাবলে। কিন্তু চাপড়গুলো যেন একটু আস্তে। ঘোড়াগুলোও যেন বুঝতে পেরেছে। তারাও পা ঠোকে আস্তে-আস্তে।
তোষাখানায় বংশীর কাছে গেল ভূতনাথ। জ্বরটা কমেছে একটু। কিন্তু চিৎপাত হয়ে তেমনি শুয়ে আছে। ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আজ খেতে ইচ্ছে করছে কিছু?
বংশী বললে—ছোটবাবু কেমন আছে আগে তাই বলুন শালাবাবু, সারারাত ছোটবাবুকে স্বপ্ন দেখেছি আজ্ঞে।
মধুসূদন বললে—শশী ডাক্তারকে তো আবার ডাকতে গিয়েছে সরকারমশাই।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে–ছোটবাবু কেমন আছে জানো তুমি?
মধুসুদন বললে—শশী ডাক্তারের ওষুধে কাজ হবে না! কী বলেন, শালাবাবু।
সত্যিই শশী ডাক্তার ধন্বন্তরি বটে! বুড়ো মানুষ, কিন্তু কাল রাত্রে ঘণ্টা তিনেক নিজে রোগীর পাশে থেকে চাঙা করে দিয়ে গিয়েছেন ছোটবাবুকে! গায়ের ব্যথা অনেক কম।
