শশী ডাক্তার বুঝি এবার নামলো। বিধু সরকার ওষুধের বাক্সটা গাড়িতে তুলে দিলো।
একবার মনে হলো বিধু সরকারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে— সরকার মশাই, কেমন আছেন ছোটবাবু—কিন্তু ভয় হলো। দরকার কী! লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়। সেদিন বদরিকাবাবু খুব জব্দ করেছে বিধু সরকারকে! নিচেই বৈঠকখানা। এদিকে তো এত কাণ্ড, কিন্তু বদরিকাবাবু কী করছে এখন কে জানে। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলে ভূতনাথ।
হঠাৎ সারা কলকাতা কাঁপিয়ে একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো। রাত ন’টা বাজলো বুঝি। তোপ পড়লে কেল্লায়। চিৎপাত হয়ে শুয়েছিল বদরিকাবাবু। শব্দটা কানে যেতেই চিৎকার করে উঠলো —ব্যোম কালী কোলকাত্তাওয়ালী-বলে উঠে বসলো। তারপর টাক থেকে ঘড়িটা বার করে মিলিয়ে নিলো সেটা। তারপর দেয়ালের বড় ঘড়িটার দিকেও একবার তাকালে। সেটাতেও ঢং-ঢং করে ন’টা বাজছে তখন। ভূতনাথকে দেখতে পেয়েই ডাকলে— শোন–আয় এদিকে।
ভূতনাথ গিয়ে বসলো তক্তপোশের ওপর। খানিক পরে বললে-শুনেছেন, কী হয়েছে?
বদরিকাবাবু নিলিপ্তের ভঙ্গিতে বললে—আমি জানতাম।
–আর শুনেছেন, বংশীও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মার খেয়ে।
–আমি জানতাম এ-হবে।
–আর চুনীদাসী খুন হয়েছে।
–তাও হবে জানতাম।
বদরিকাবাবু কেমন করে সব জানতে কে জানে!
বদরিকাবাবু আবার বললে—আরে কী কী হবে তাও বলে দিতে পারি, শুনবি?
ভূতনাথের বিস্মিত মুখের দিকে চেয়ে বদরিকাবাবু বলতে লাগলো—দেখবি, একদিন এই কড়িকাঠ ভেঙে পড়বে, এই বাড়ি গুড়ো হয়ে যাবে, বড়বাড়ির ভিটেতে ঘুঘু চরবে, পায়রাগুলো না খেতে পেয়ে মরবে, চাকর-বাকর সবাই পালাবে, যদি না পালায় তো সবাই ইট চাপা পড়ে মরবে দেখে নিস—তারপর এই বাড়ি ভেঙে মাটি সমান হবে একদিন, সেই মাটি খুড়তে খুড়তে মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে কুলি-মজুরদের, শেষে মাটি খুড়ে…বদরিকাবাবু থামলো।
ভূতনাথ বললে–তারপর? মাটি খুড়ে…?
—মাটি খুড়ে স্ফটিক-পাথর পাওয়া যাবে একটা।
—স্ফটিক-পাথর?
—হ্যাঁ রে, স্ফটিক পাথর, বিশ্বাস হচ্ছে না?
—স্ফটিক-পাথর? কেন?
–সব বলবো না এখন, তুই ভয় পেয়ে যাবি, কিন্তু তুইও রেহাই পাবি না তা বলে, তোকেও ভুগতে হবে, মাথা ফেটে তোর রক্ত ঝরবে, তোরও সময় হয়ে এসেছে যে, তখন এক গেলাশ জলের জন্যে ছটফট করবি, কেউ জল দেবে না, এ-বংশের রক্তের সঙ্গে তোর রক্তের ছোঁয়া লেগেছে কিনা। দর্পনারায়ণের অভিশাপ কি বৃথা যাবে ভেবেছিস, এক ফোটা জল পর্যন্ত পায়নি শেষকালে, মুর্শিদকুলি খা’র ‘বৈকুণ্ঠে’ বসে তিলেতিলে শুকিয়ে মরেছে, আর মরবার শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত কেবল শাপ দিয়ে গিয়েছে যে কথা বলতে বলতে বদরিকাবাবুর মুখ চোখের ভাব-ভঙ্গি কেমন যেন ভয়াবহ হয়ে উঠলো। ফুলে উঠলে চোখ দুটো! ভূতনাথ নিঃশব্দে উঠে এল ঘর থেকে। যেন মারমুখী হর্ষে উঠেছে আজ বদরিকাবাবু! সর্বক্ষণ ঘড়ি ধরে-ধরে যেন শাপ দিয়ে চলেছে নিজের অন্নদাতাকে! অথচ কিসের এ ক্ষোভ! কেন এ অভিযোগ! কিন্তু কে জানতো
বদরিকাবাবুর কথাগুলো এমন বর্ণে-বর্ণে ফলে যাবে শেষ পর্যন্ত।
বংশীর ঘরে গিয়ে কপালে হাত দিয়ে একবার দেখলে ভূতনাথ। জ্বরে গা যেন পুড়ে যাচ্ছে তার।
হঠাৎ মধুসূদন ঘরে ঢুকলো।
ভূতনাথ বললে—কী দেখে এলে মধুসূদন?
মধুসূদন বললে-হাসপাতালে গিয়েছিলাম শালাবাবু, চুনীদাসীকে চাঁদনীর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে।
-কেমন আছে এখন?
মধুসূদন বললে—জ্ঞান হয়েছে একটু।
—কথা বলছে।
–কথা বলছে না, তবে আমায় দেখে চিনতে পারলে আজ্ঞে, চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো, কিন্তু ডাক্তার বললে, ভয় নেই, বেঁচে যাবে, তবে সময় লাগবে অনেক।
—কী হয়েছিল?
–কে জানে শালাবাবু, কেউ বলতে পারছে না, নটে দত্ত আর ছোটবাবুতে মারামারি হয়েছিল, ছোটবাবুর হাতে তো ছিল চাবুক, আর নটে দত্তর গুণ্ডার দল তৈরিই ছিল ও-পাড়ায়, ঠিক যে আসলে কী হয়েছিল কেউ বলতে পারছে না।
আস্তে-আস্তে ভূতনাথ নিজের চোরকুঠুরিতে এসে উঠলো। আজ বংশী নেই, কে আর খেতে ডাকতে আসবে। নিজের বিছানাটা পেতে নিয়ে চিত হয়ে অন্ধকারের মধ্যেই শুয়ে পড়লো ভূতনাথ। অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়া-মৃতি যেন নিঃশব্দে ঘোরাফেরা করছে বলে মনে হলো। কোথায় যেন কত যুগের পরপার থেকে সেই ইটালিয়ান শিল্পী ফিরে এসেছে আবার তার স্ত্রীর শয্যার পাশে। ভূমিপতি চৌধুরীকে যেন আজ হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়েছে সে। আবার যেন আজ নতুন করে প্রতিশোধ নেবে। আজ আর পিস্তলের গুলী ফস্কে যাবে না তার। অনেক সমুদ্র অনেক নদী পার হয়ে আবার ভারতবর্ষে এসেছে হারানো স্ত্রীর খোঁজে। দেয়ালের গায়ের অস্পষ্ট ছবিগুলো যেন আবার সজীব হয়ে উঠেছে। উড়ন্ত পরীদের আবার নতুন করে পাখা গজিয়েছে। নতুন করে যেন অভিসার হবে এই ঘরে।
হঠাৎ যেন দরজার পাশ থেকে কার গলার আওয়াজ এল। ডাকছে-বাবু, বাবু–
অতি মৃদু ডাক। আওয়াজ শুনে বোঝা যায় না কার গলা। তবু বোঝা গেল যেন মেয়েমানুষের গলার শব্দ।
দরজা খুলে ভূতনাথ বাইরে আসতেই দেখলে পাশে ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিন্তা। হাতে একটা হ্যারিকেনের আলো। থান কাপড় পরা। অন্যদিকে মুখ ফেরানো। বললে—আমায় ডাকছিলে? ভূতনাথ আর যে কী বলবে ভেকে পেলে না।
চিন্তা তেমনি ঘোমটা ঢেকেই বললে—আপনার খাবার দেওয়া হয়েছে বাবু।
ভূতনাথ বললে—চলো, আমি যাচ্ছি।
আগে-আগে চললো চিন্তা। পেছনে ভূতনাথও চলতে লাগলো। গলি ঘুজির মতো রাস্তা। বড়বাড়ির এ-দিকটা রান্নাবাড়ির গায়ে। রান্নাবাড়ির পাশেই ভাড়ার ঘর। তারপর একটা শুধু দেয়ালের ব্যবধান। আর দেয়ালের গা দিয়ে রান্নাবাড়ির রাস্তা। সারা দেয়ালে ধোয়ার দাগ। বহুদিনের ব্যবহারে মেঝেটার জায়গায় জায়গায় সিমেন্ট উঠে গিয়েছে। থালা সোজা হয়ে বসে না। ঘরের কোণে একটা আরশোলা চুপচাপ বসে শুঁড় নাড়াচ্ছে।
