মেজবাবুর গাড়ি গড়গড় করে একেবারে গাড়ি-বারান্দার তলায় শশী ডাক্তারের গাড়ির পেছনে এসে থামলো।
দারোগা সাহেব খবর পেয়েই দৌড়ে এসেছে।
মেজবাবু গাড়ি থেকে নামলেন। পেছনে ভৈরববাবু।
দারোগা সাহেব সামনে এসে সেলাম করলে একবার।
মেজবাবু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সোজা ওপরে উঠে গেলেন। ভৈরববাবুকে বললেন—ছোটবাবু কেমন আছে আগে দেখে আসি।
ভৈরববাব বললে-কী হয়েছে দারোগা সাহেব?
দারোগা সাহেব বললে—জানবাজারে খুন হয়েছে সন্ধ্যেবেলা।
ভৈরববাবু বললে খুন হয়েছে জানবাজারে, তা এখানে কেন?
—কৌস্তুভমণি চৌধুরীর স্টেটমেন্ট নেবো।
—খুন করেছে কে?
—সেই ইনভেস্টিগেশন করতেই তো এসেছি।
খানিক পরেই ডাক এল। বেণী এল। দারোগা সাহেবকে বললে—আপনাকে মেজবাবু ওপরে ডাকছেন।
দারোগা চলে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে যেন সমস্ত ঘটনার ওপর একটা যবনিকা পড়ে যায়। যে-যার জায়গায় চলে যায় একে-একে। এবার আর কোনো ভয় নেই। মেজবাবু দারোগা সাহেবকে ওপরে ডেকে নিয়ে গিয়েছে। দারোগা সাহেবই আসুক আর লাটসাহেবই আসুক, একবার নাচঘরে গিয়ে বসলে জলের মতো সোজা হয়ে যাবে সব। কতবার সব সমস্যার সমাধান ওইখানে হয়ে গিয়েছে নিঃশব্দে। কতদিন সব সন্দেহের নিরসন হয়ে গিয়েছে ওই ঘরের নির্জনে।
আবার আস্তে-আস্তে উঠোনটা নিরিবিলি হয়ে এল। আবার নির্জন হয়ে এল বড়বাড়ি। টিমটিম করে ইব্রাহিমের ঘরের সামনের বাতিটা তেমনি জ্বলতে লাগলো। রাত নেমে এল ঘন হয়ে। শশী ডাক্তার কিন্তু তখনও যায়নি। ঘোড়াটা মাথা নিচু করে ঘাস খেতে-খেতে এক-একবার পা ঠোকে। ইটের দাগরাজি করা মেঝের ওপর তার পা-ঠোকার শব্দ যেন অনেক দূর থেকে শোনা যায়। আর পুলিশ ক’টা তখনও দাঁড়িয়ে আছে গেট-এর কাছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খৈনি খাচ্ছে।
একা-একা নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় ভূতনাথের। এত দুর্ঘটনা, এত উত্তেজনার মধ্যেও কেন নিজেকে এত দুর্বল মনে হয় কে জানে। যেন কোথাও কেউ নেই। এত বড় বাড়ি-তবু যেন মনে হয় এখানে অরণ্যের স্তব্ধতা। সেই আদিম কলকাতার প্রাগৈতিহাসিক চেহারা যেন ফিরে এসেছে। ভূমিপতি চৌধুরী এ-বাড়ি তৈরি করবার আগেকার চেহারা। যেন ডোবা-পুকুর, চারপাশে ব্যাঙ ডাকছে নির্ভয়ে। দু একটা হিজল আর হোগল গাছের ঝোপ-ঝাড়। তাঁতিদের কুঁড়েঘর কয়েকটা। সন্ধ্যে হতে না হতে বাঘের ভয়ে ঘরের ভেতর সেধিয়েছে সবাই। অথচ ভূতনাথের চোখের ওপরেই তো এই শহর বেড়ে চলেছে। হ্যারিসন রোডটা চোখের সামনে গড়ে উঠলো। কলের জল, বড় বড় রাস্তা, ইলেকটিক আলল, কলের ট্রাম—ধনে-জনে কলকাতার কত ভিড় বাড়লো, বস্তি ভেঙে নতুন-নতুন বাড়ি হলো, পুকুর-ডোবা, খানাখন্দ বুজিয়ে খেলার মাঠ হলো। বেড়াবার পার্ক হলো। তবু এই রাত্রিবেলা বড়বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সে যেন কলকাতা শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে অনেক পেছনে চলে গিয়েছে। শহর, সভ্যতা, সমাজ, পরিচিত অপরিচিত সকলের চোখের আড়ালে অন্য এক দেশে! অথচ প্রথম যেদিন এখানে এসেছিল ভূতনাথ, কত আশা ছিল মনে। এই বড়বাড়িকে কত ঈর্ষা করতো। কত উদগ্র কৌতূহল ছিল এই বড়বাড়িকে ঘিরে। কত রাতে জেগে জেগে শুনেছে এ-বাড়ির প্রত্যেকটি খুটিনাটি শব্দ। ভেতর বাড়িতে ঝনঝন করে হয় তত কারো হাত থেকে কঁসার থালা-বাসন পড়ে গেল, ছাদের কোণ থেকে পায়রার ববকম্ শব্দ, দাসু জমাদারের উঠোন ঝাঁট দেওয়ার শব্দটা পর্যন্ত ভালো লাগতো তার। যদুর মা শিল নোড় নিয়ে বাটনা বেটে চলেছে, সৌদামিনী কুটনো কুটতে কুটতে বকবক করে গালাগালি দিয়ে চলেছে—পেছনের বাগানে দাসু জমাদারের ছেলের বাঁশীতে ‘ওঠা নামা প্রেমের তুফানের সুর, এমনকি পুকুরের ধারে আমলকি গাছে একটা অচেনা পাখীর ডাক—সমস্ত, সমস্ত ভালো লেগেছে। আরো ভালো লেগেছে যখন অনেক রাত্রে ঘড়ঘড় শব্দে গেট খুলে যেতো, আর তারপর মেজবাবুর গাড়ি ঢুকতে উঠোনে। যেন অলৌকিক সব ব্যাপার। আর ভোরবেলা নাথু সিং-এর সেই ডন-বৈঠকের আওয়াজ আর নিচে একতলায় আস্তাবল বাড়িতে ঘোড়ার ডলাইমলাই-এর ক্লপ-ফ্লপ, হিস-হিস থাপ্পড় মারার শব্দ। কিন্তু এ সমস্ত শব্দ-তরঙ্গ ছাপিয়ে আর এক শব্দ উঠতো এক-একদিন। সে কোথাকার শব্দ কে জানে। সেই সুর, সেই শিষের মতো মৃদু আওয়াজ ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে সারা বাড়িময়। উত্তরে, দক্ষিণে, পুবে, পশ্চিমে। সে সুর কেউ শুনতে পায় নি। খিড়কির দিকের একতলার সিঁড়ির নিচে থেকে হয় তো উঠতো। আর শুনতো বুঝি মাত্র দুজন। একজন ভূতনাথ। আর একজন এ-বাড়িরই লোক–সে পটেশ্বরী বৌঠান!
কিন্তু ওখানে অন্যরকম। ওই জবাদের বাড়িতে। ওখানে গেলেই মনে হয়, জীবনের পথ যেন এখনও অনেকখানি বাকি। যৌবনের যেন শুরু হলো এইমাত্র। ঐশ্বর্য যখন ছিল সুবিনয়বাবুর, তখনও যেন আড়ম্বর ছিল না কোথাও। প্রাচুর্য ছিল, কিন্তু এমন অপচয় ছিল না। তা ছাড়া আজকাল রাস্তায়, ঘাটে, বাজারেও যেন নতুন জীবন ফিরে এসেছে। কোথায় যেন ভেতরে-ভেতরে কোন্ আন্দোলনের শিখা অনির্বাণ হয়ে জ্বলছে। মাঝে-মাঝে তার প্রকাশ চোখে পড়ে। সিস্টার নিবেদিতা বাগবাজারে স্কুল খুলেছেন। কোন্ এক বিদেশি মেয়ের এ কি বিচিত্র খেয়াল! কিন্তু শুধুই কি খেয়াল! সেদিন বড়বাজারে যারা গান গেয়ে-গেয়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছিলো, তাদেরও কি শুধু খেয়াল! আর কিছু নয়! নিবারণরা শুধু কি অকারণেই ভেতরে-ভেতরে অমন জ্বলবার জন্যে তৈরি হচ্ছে!
