—কীসের কী হবে?
–পুলিশ যদি ছোটবাবুকে ধরে?
–ছোটবাবুকে ধরবে কেন? ছোটবাবু কী করেছে যে, ধরতে যাবে তাকে?
–তবে পুলিশ এল কেন?
—আরে, পুলিশ তো দু’বেল। আসছে বাড়িতে, দারোগা তো মেজবাবুর বন্ধু।
বংশী তাতেও যেন সান্ত্বনা পেলে না। বললে—আজ যে ছোটবাবু রক্তারক্তি করেছে।
ভূতনাথ বললে—দূর, গাড়ি উল্টে পড়ে গিয়েছে তা রক্ত পড়বে না—ছড়ে গিয়েছে হয় তত হাত-পা।
-না শালাবাবু, লোচন কাছে সরে এল। গলা নিচু করে বললে—না শালাবাবু, তা না।
লোচনের ভাব-ভঙ্গি দেখে কেমন যেন সন্দেহ হলে ভূতনাথের। বললে—কী হয়েছে তবে?
—আজ্ঞে, কাউকে বলবেন না—বলে লোচন এবার চারদিকে দেখে নিলে।
—না, কাউকে বলবো না, বলো।
—ছোটবাবু খুন করেছে।
–কাকে?
কিন্তু কাকে খুন করেছে সে-উত্তর আর দেওয়া হলো না। ভীষণ গোলমাল হচ্ছে। যেন অনেক লোক জমায়েৎ হয়েছে বড়বাড়ির উঠোনে। লোচন সেই দিকেই ছুটলো।
ভুতনাথ বললে—দেখে আসি বংশী, কী হচ্ছে বাইরে।
বংশী বললে—যাবেন না শালাবাবু, পুলিশের হাঙ্গামা ওখানে। তারপর বললে—ছোটমা ফিরে এসেছে শালাবাবু?
—ফিরে এসেছে।
—ছোটমা শুনেছে সব?
—কি জানি, তা যাবো একবার বৌঠানের সঙ্গে দেখা করতে?
-আপনি বরং ছোটবাবুকে একবার দেখে আসুন শালাবাবু, ছোটবাবুর জন্যে মনটা কেমন করছে আমার। আচ্ছা শালাবাবু, ছোটবাবু বাঁচবে তো!
বাইরে যেন আবার গোলমাল শোনা গেল। ভূতনাথ উঠলো এবার। বললে—আসছি আমি বংশী। কী হচ্ছে ওদিকে, দেখে আসি একবার।
তোষাখানার বাইরে এসে দাঁড়ালো ভূতনাথ। চারদিকে একবার চেয়ে দেখলে। শশী ডাক্তারের গাড়িটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি-বারান্দার তলায়। ইব্রাহিম দোতলার উপর দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াসিনও দাঁড়িয়ে দেখছে। মিয়াজান, আব্বাস, ইলিয়াস তারাও উঠোনে ভিড় করেছে। লাল পাগড়ি পরা দু’চারটে পুলিশ গেট-এর কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে লাঠি। খাজাঞ্চীখানার ভেতর আলো জ্বলছে। দরজার সামনে-সেখানেও ভিড় জমেছে। দারোগা সাহেব বোধহয় ওখানে ঢুকেছে। সারা বাড়িতে যেন একটা চাপা চাঞ্চল্য। ভূতনাথ আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে এল।
কে যেন সামনে আসছিল। সামনে আসতেই চেনা গেল। মধুসূদন।
-কী খবর মধুসূদন?
—সব্বনাশ হয়ে গিয়েছে শালাবাবু।
—কী হলো?
–চুনীদাসী খুন হয়ে গিয়েছে শুনছি। আমি যাচ্ছি একবার সেখানে।
—চুনীদাসী!
—শুনছি তো! কী জানি, কী ব্যাপার!
–কে খুন করলে?
মধুসূদন বললে—শুনছি ছেনি দত্তর ছেলে নটে দত্তর সঙ্গে নাকি মারামারি হয়েছে ছোটবাবুর।
-নটে দত্ত?
—আজ্ঞে, ছোটবাবু আজ জানবাজারে গিয়ে দেখে নটে দত্ত নাকি চুনীদাসীর ঘরে বসে আছে—দেখে বোধহয় আর রাগ সামলাতে পারেনি। তারপর মারামারি হয়েছে দুজনে। ও-পাড়ার গুণ্ডারা তো সব নটে দত্তর হাতের মুঠোয়, এদিকে ছোটবাবু তো একলা-তা ছেনি দত্তদের সঙ্গে এ-বাড়ির ঝগড়া তো আজকের নয়। সেই দেখলেন না ছুটুকবাবুর বিয়ের সময় কী কাণ্ডটা হলো!
–কিন্তু খুনটা করলো কে?
—কে করলো, কে জানে, হয় নটে দত্ত, নয় ছোটবাবু।
ভূতনাথ বললে-চুনীদাসী কি মারা গিয়েছে?
মধুসূদন বললে-শুনছি তো এখনও জ্ঞান আছে—যাই, তাড়াতাড়ি একবার দেখে আসি গিয়ে। বড় ভালোমানুষ ছিল আজ্ঞে—বলে মধুসূদন চলে গেল।
ভূতনাথ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই। একবার মনে পড়লো চুনীদাসীর কথা। সেদিনকার সেই দেখা, তারপরেই এ কী কাণ্ড। চুনীদাসীকে সেদিন সত্যি-সত্যি বিশেষ খারাপ লাগেনি তার। কী চমৎকার ব্যবহার। খাতির করেছে খুব। কীসে ভূতনাথের সুবিধে হয় সেই কথাই বলেছে বারবার। তামাক খাবার কথা বলেছে। জল চেয়েছিল, দিয়েছে সরবৎ। তা সরবতে কী দোষ থাকতে পারে। হয় তো সিদ্ধি মেশানো ছিল সামান্য। যারা সিদ্ধি খায় তাদের তাতে নেশা হয় না। কিন্তু ভূতনাথের তো অভ্যেস নেই। হয় তো মাথাটা একটু ঘুরে উঠেছিল। কিন্তু তারপরে চুনীদাসী নিজে তার মাথাটা কোলে করে নিয়ে কত যত্ন করেছে। নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দিয়েছে। কে অমন করে! ভূতনাথকে আদর যত্ন করে তাদের কী লাভ! আর তারপর যদি নটে দত্ত আসার জন্যে তাকে ঘর থেকে বাইরে চলে যেতে বলে থাকে তো এমন কিছু অন্যায় করেনি। ছোটবাবু যাওয়া বন্ধ করলে ওদের চলে কী করে! সংসার তো চলা চাই! অত চাকর, ঝি, নিজে, আবার একটা পাখী! খরচ কি কম। গাড়িটা পর্যন্ত বেচে দিতে হলো।
আস্তে আস্তে ভূতনাথ একেবারে উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো।
ছুটুকবাবু তখন বাড়িতেই ছিল। খবর পেয়ে নিচে এসে গিয়েছে। হাবুল দত্ত রোজকার মতো বড়বাড়িতে এসেছিল। পেছন পেছন সে-ও এসে দাঁড়ালো!
দারোগা সাহেবের সঙ্গে ছুটুকবাবুর কী সব কথা হচ্ছে।
এমন সময় হৈ চৈ শুরু হলো—হটো সব, ভিড় ছাড়ো–
একটা সোরগোল উঠলো। ভিড়ের মধ্যে এতক্ষণে যেন একটা আশার সঞ্চার হলো হঠাৎ! মেজবাবু এসে গিয়েছে!—ওই মেজবাবু এসে গিয়োছ, মেজবাবু এসে গিয়েছে।
এতক্ষণে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়লো সকলের। মেজবাবু থাকলে কি এতক্ষণ পুলিশের সঙ্গে এত কথা কাটাকাটি হয়। কতবার কত কাণ্ড হয়ে গিয়েছে আগে। সুখচরে খুন হয়েছে প্রজাপাঠক, প্রজারা কাছারি বাড়িতে এসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই বাড়িতেই যেবার দুর্গাপুজোর সময়ে নবমীর রাত্রে মেজমা’র পুরোনো ঝি বিলাসীবালা গলায় দড়ি দিয়েছে, অন্দরমহলের কড়িকাঠের থেকে ঝুলছে শরীরটা—সেদিনও অনেক পুলিশ-থানার হেফাজত থেকে বাঁচিয়েছে মেজবাবুই। মেজবাবু এসে পড়াতে ভূতনাথও অনেকখানি স্বস্তি পেলো যেন। যাক, মেজবাবু এসেছে, বাঁচা গিয়েছে।
