-কে মেরেছে বললে?
লোচনের এক হাতে গড়গড়া আর এক হাতে কলকের আগুনে ফুঁ দিতে দিতে বললে–মেরেছে বেশ করেছে—আলবাৎ মারবে, ছোটবাবু তাই চাবুক দিয়ে মেরেছে—মেজবাবু হলে একে আজ খুন করে ফেলতে হুজুর। রাগে লোচন জোরে জোরে ফুঁ দিতে লাগলো কলকের মাথায়। বললে—খুব করেছে মেরেছে-ও কেবল ছোটমা আর ছোটমা। আরে ছোটমা যেন তোর মনিব— খাওয়ায় পরায় কে তোকে? সত্যি কথা বলুন তো, আপনি তো বিজ্ঞ লোক, মাইনে দেয় ছোটমা, না, ছোটবাবু? বলুন আপনি।
চুলোয় যাক বাজে কথা। ভূতনাথের রাগে গা গিস গিস করতে লাগলো।
লোচন বললে—বাড়ির মালিক তত ছোটমা নয়, মালিক হলেন ছোটবাবু-না কি বলুন আজ্ঞে। যাই, আমি আগে তামাকটা দিয়ে আসি আজ্ঞে। টিকে পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেল এদিকে।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু ছোটবাবুর রক্তারক্তি কেন হলে জানো কিছু?
লোচন বললে-আমিও তো তাই বলি–ছোটবাবুকে দেখলাম গাড়ি হাঁকিয়ে গেল, হাতে চাবুক নিয়ে, আমি তখন মেজবাবুর জন্যে তামাক সেজে নিয়ে যাচ্ছি কিনা—আমার তখন মাথার ঠিক নেই শালাবাবু। এদিকে নতুন তামাক এসেছে আজ একেবারে ভূযো মাল, যতবার সাজি ততবার আঠার মতো আঙুলে আটকে যায়, তামাক হবে ঠিক যেন পুরোনো খেজুরের গুড়-পুরোনো খেজুরের গুড় দেখেছেন? তা নয়, এ যেন বটের আঠা একেবারে, হাতে লাগলে…
ভূতনাথ বিরক্ত হয়ে সোজা চলে এল তোষাখানায়। তোষাখানার চারদিকে তখন বেশ ভিড় জমেছে। মধুসূদন দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামসুন্দর, বেণী সবাই আছে। নাথু সিংও দাঁড়িয়ে তামাসা দেখছে।
ভূতনাথ ভিড় ঠেলে একেবারে বংশীর সামনে গিয়ে হাজির।
বংশীর মাথায়, হাতে, পিঠে তখন জলপটি।
ভূতনাথকে দেখেই বংশী হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলো।
ভূতনাথ কাছে গিয়ে বসে বললে—কাঁদিসনে বংশী–থাম।
বংশী বললে—আপনি এসে গিয়েছেন শালাবাবু, ছোটমা এসেছে?
—এসেছে, এসেছে—কিন্তু এ কী হলো তোর বংশী?
বংশী তবু হাউ-মাউ করে কাঁদে। মুখ দিয়ে ভালো করে কথা বেরোয় না কান্নার চোটে।
ভূতনাথ বললে—কী হয়েছে তাই ভালো করে বল না আমায়?
বেণী বলে—আমার কাছে শুনুন তবে শালাবাবু, ছোটবাবু ওকে খুব পেটান পিটিয়েছেন চাবুক দিয়ে, দেখছেন না সারা গায়ে মুখে দাগড়া-দাগড়া দাগ বেরিয়েছে?
ভূতনাথ মুখ ঘুরিয়ে বেণীর দিকে চেয়ে বললে—কিন্তু কেন, মারলে কেন ছোটবাবু হঠাৎ?
—আজ্ঞে, গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে গাড়িবারান্দায়—-ছোটবাবু ডেকেছেন কয়েকবার, সাড়া পাননি—কে ধরবে, কে ধরে নামাবে। বংশী তখন ভেবেছে ছোটবাবু নেই বাড়িতে, তাস খেলছে এখেনে বসে বসে—ওদিকে হুশ নেই। তারপর আমি যাচ্ছিলাম, দেখি ছোটবাবুর জামায় কাপড়ে রক্ত-কপালে মাথায় রক্ত-রক্তে ভাসাভাসি—আমি তো দেখেই ধরলুম গিয়ে।
—তারপর?
-তারপর যখন আমি ধরে নামিয়েছি, তখন দৌড়াতে দৌড়তে বংশী গিয়েছে সামনে। আর যাঁহাতক বংশীকে দেখা, আর শঙ্কর মাছের ল্যাজের চাবুক ছিল হাতে তাই দিয়ে বংশীকে শপাং শপাং করে মার—একবার, দু’বার, তিনবার—পঞ্চাশবার—মারতে-মারতে ছোটবাবু পড়ে গেলেন আজ্ঞে মাটিতে।
-তারপর?
—তারপর বংশী আবার ধরে তুললে ছোটবাবুকে। ছোটবাবু উঠেই আবার মার, দৌড়ে এল সব লোক, যে-যেখানে ছিল, আমার তো তখন শরীর থর থর করে কাপছে শালাবাবু। বংশী মার খাচ্ছে আর জোরে জাপটে ধরে আছে ছোটবাবুকে—যাতে ছোটবাবু আবার না পড়ে যায়–শেষে–
বংশীও হাউ হাউ করে কাঁদছিল আর বলছিল–ছোটবাবুর যদি চেহারা দেখতেন শালাবাবু-রক্তে একেবারে ভেসে গিয়েছে গা
-কী যে হবে শালাবাবু!
মধুসূদন এক ধমক দিলে।-থাম তুই বংশীকাঁদিসনে পাগলের মতন।
ধমক খেয়ে চুপ করে গেল বংশী।
বেণী বলে—কিন্তু সেই অবস্থায়ও বংশী ছোটবাবুকে ধরে তুলে নিয়ে গেল ঘরে। তারপর তো এই অবস্থা এখন জলপটি দিচ্ছি। আমাকে যেবার মেজবাবু মেরেছিল—মনে আছে কাকা? সেবার তো জলপটি দিয়ে দিয়েই সারলো—রাগলে তো মাতাল মানুষদের জ্ঞান থাকে না।
ভূতনাথ বললে কিন্তু ছোটবুর রক্তারক্তি কেন হলো— কিছু জানো?
উত্তর দিলে বংশী। বললে—উঃ, ছোটবাবুর কী কষ্টটাই যে হচ্ছে শালাবাবু—আপনি দেখলে আপনার চোখ দিয়ে নিঘ্যাৎ জল গড়াতে আজ্ঞে।
মধুসূদন ধমক দিলো।—থাম দিকি তুই, লজ্জা করে না তোর কথা বলতে।
—আমার লজ্জা হবে কেন কাকা, আমি দোষ করেছি তাই মার খেয়েছি—কী বলেন শালাবাবু। কিন্তু ছোটবাবুর কষ্টটার কথা তোমরা একবার ভাবে দিকিনি।
ভূতনাথ কিন্তু তখনও ব্যাপারটা ভালো বুঝতে পারেনি। বললে কিন্তু ছোটবাবুর রক্তারক্তি হলো কিসে বেণী?
বেণী বললে—আজ্ঞে, গাড়ি বোধহয় উল্টে গিয়েছিল—নেশা করা তো ছিলই—ঠিক ঠাহর হয়নি হয় তো রাস্তা।
বংশী কাঁদতে কাদতে বলে—এখন কেমন আছে ছোটবাবু? শশী ডাক্তার এসেছে?
মধুসূদন ধমকে উঠলো—তুই থাম তো বংশী, তোর নিজের ঘা সামলা আগে—বলে, মরে যাসনি এই ঢের, যে-মার খেয়েছিলিস।
লোচন দৌড়াতে দৌড়োত হঠাৎ ঘরে ঢুকলো। হাঁফাচ্ছে। বললে—সব্বনাশ হয়েছে কাকা, পুলিশ এসেছে!
—পুলিশ! একসঙ্গে যেন সবাই বলে উঠলো। পুলিশ কেন?
লোচন বললে—দেখো গে গিয়ে, বারবাড়ির উঠোন একেবারে ছেয়ে গিয়েছে লোকে। দারোগা সাহেব কথা বলছে সরকার মশাই-এর সঙ্গে।
বেণী, শ্যামসুন্দর, মধুসুদন—সবাই দৌড়লো। শুধু দাঁড়িয়ে রইল লোচন।
বংশী ভূতনাথের দিকে চেয়ে হঠাৎ কেঁদে উঠলো আবার। ভুতনাথ বললে-কাদিস কেন রে? খুব কষ্ট হচ্ছে?
—শালাবাবু, কী হবে?
