এত কথা প্রথমে বুঝিয়েছিল ছুটুকবাবুকে ননীলাল।
তারপর বুঝিয়েছে ঝুমুটমল মারোয়াড়ী। শেষ পর্যন্ত ঝুমুটমল-এরই জয় হয়েছে।
—সেলাম হুজুর—
ভূতনাথ চমকে উঠেছে। ইলিয়াস দরজা খুলে সরে দাঁড়িয়েছে পাশের দিকে।
বৌঠান বললে—নামতে হবে ভূতনাথ, বংশীকে বল গিয়ে পুটলিটা আমার পালঙ-এর ওপর রাখা আছে।
ভূতনাথ যেন এতক্ষণে সম্বিত ফিরে পেলে। গাড়ি থেকে নেমে বললে-মিয়াজান, গাড়ি যেন তুলে ফেলো না, আবার যেতে হবে বরানগরে।
ব্রিজ সিং খবর পেয়েই খিড়কির চাবি খুলে দিতে এসেছিল। ব্রিজ সিংকে দেখে বৌঠান মাথায় ঘোমটা তুলে দিলে। গাড়ি খিড়কির দরজায় গিয়ে ঠেকলো। সেই নারকোল গাছটার নিচে এসে দাঁড়ালো ভূতনাথ। এরই কাছে সেই সিঁড়ির তলায় কোথায় সেই ঘরখানা। বাইরে থেকে কিছু বোঝবার উপায় নেই। সেই সুরটা বুঝি এখান থেকেই ওঠে। বৌঠান বললে—কী দেখছিস ভূতনাথ-বংশীকে ডাক।
কিন্তু ততক্ষণে চিন্তা গাড়ির শব্দ পেয়েই নেমে এসেছে। চোখে মুখে তার ব্যস্ততা। ফিস ফিস করে গাড়ির কাছে মুখ নিয়ে এসে বললে—ছোটম, ছোটবাবু এসেছে।
-ছোটবাবু?
ছোটকর্তা! এই তো বিকেলবেলা ল্যাণ্ডোলেট নিয়ে চলে গেল। বংশীর কাছ থেকে চাবুক চেয়ে নিয়ে। আজ তো জানবাজারে চুনীদাসীর কাছে তার রাত কাটাবার কথা। এখনি ফিরে এলেন যে!
বৌঠান বললে-বংশী কোথায়?
—সে অনেক কাণ্ড হয়ে গিয়েছে, তুমি একটিবার নামো ছোটমা।
-কেন, কী হয়েছে বল তো খোলসা করে।
–তোমাকে নামতে হবে ছোটমা, সব বলছি—ছোটবাবু। শরীর ভালো নেই।
—সে কি! বৌঠান এবার নামলো গাড়ি থেকে। তারপর লম্বা ঘোমটার আড়াল দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল চিন্তার আগে আগে। ভূতনাথ একবার দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ সেইখানেই। বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। কতক্ষণ দেরি হবে বৌঠানের কে জানে। ছোটকর্তার আবার কী অসুখ হলো।
মিয়াজান বললে—গাড়ি এখানে থাকবে শালাবাবু?
–রাখো গাড়ি, আমি গিয়ে দেখে আসছি।
৩৪. খিড়কির গেট পেরিয়ে
খিড়কির গেট পেরিয়ে আবার সদর গেট দিয়ে বার-বাড়িতে ঢুকলে ভূতনাথ। সত্যি-সত্যি আস্তাবলে ছোটবাবুর ল্যাণ্ডোলেট তখন দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন সন্দেহ হলো। এমন তো হবার কথা নয়। কোথা থেকে যেন এই দুর্ঘটনা এসে হঠাৎ সমস্ত গোলমাল করে দিলে। অথচ বংশীরও দেখা নেই। ছুটুকবাবুর বৈঠকখানা ঘরটা আজও অন্ধকার। চলতে চলতে তোষাখানার দিকে গেল ভূতনাথ। লোচন তখন কাজ করছিল আপন মনে। ভূতনাথকে দেখতে পায়নি। না পাক, এখন দেখতে পেলে আবার অনেকক্ষণ সময় নষ্ট করে দেবে। বংশী বোধ হয় তোষাখানাতেই আছে। নয় তো ছোটবাবুর তদ্বির তদারকে গিয়েছে।
উঠোনের মধ্যে একবার খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়ালো ভূতনাথ।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা ঘোড়ার গাড়ির ঘণ্টার শব্দে যেন চমক ভাঙলো। মেজকর্তা ঢুকছে নাকি! কিন্তু এমন সময় মেজবাবুই বা আসবে কেন!
—হটো, হট যাও—বাবুজী।
এক পাশে সরে দাঁড়ালো ভূতনাথ। গাড়ি গিয়ে থামলো। গাড়িবারান্দার তলায়। ভূতনাথ ভালো করে দেখলো। এ তো অচেনা গাড়ি। ঘোড়া দুটোও যেন রোগা-বোগা। বড়বাড়ির ঘোড়ার মতো চেহারা নয় এদের।
গাড়ি থেকে প্রথমে নামলে বিধু সরকার। তার পেছনে পেছনে নামলো শশী ডাক্তার। বৌবাজারের শশী ডাক্তার। এ-বাড়িতে শক্ত অসুখ-বিসুখ হলে শশী ডাক্তার মাঝে মাঝে আসে বটে। কিন্তু কার আবার অসুখ হলো!
বিধু সরকারের একটু তটস্থ ভাব। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমেই ওষুধের বাক্সটা হাতে তুলে নিলে। সামনে কে যেন পড়তেই খেঁকিয়ে উঠলোসররা দিকি সামনে থেকে—পায়ে পায়ে ঘোরা দেখতে পারিনে।
যে সামনে এসেছিল সে এক লাফে সরে পড়েছে।
বিধু সরকার বললে—আসুন ডাক্তারবাবু—চলে আসুন।
শশী ডাক্তারকে নিয়ে বিধু সরকার ভেতরে ঢুকে গেল। ভূতনাথ তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আজ যেন সমস্ত বড়বাড়িটা বড় নিঝুম নিঃসঙ্গ মনে হলো। কই, কারো তত সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। গেল কোথায় সব।
হঠাৎ লোচন এদিকেই, আসছিল। ভূতনাথকে দেখেই হাউ মাউ করে উঠলো—আজ্ঞে, শালাবাবু আপনি এখানে? কোথায় ছিলেন সন্ধ্যেবেলা?
লোচনের মুখের ভাব-ভঙ্গী দেখে কেমন যেন ভয় হলো ভূতনাথের। বললে—কেন, কী হয়েছে?
—আজ্ঞে, ছোটবাবু যে খুন হয়ে গিয়েছে।
–খুন! ভূতনাথ যেন সামনে ভূত দেখার মতো আঁৎকে উঠলেন।
–আজ্ঞে, রক্তে ছোটবাবুর কাপড় চোপড় ভেসে গিয়েছে একেবারে, ওই তত শশী ডাক্তার এলো—দেখি গিয়ে কী বলে।
কথা বলতে বলতে পড়ি-কি-মরি করে দৌড়ে চলে যাচ্ছিলো লোচন।
-শোনো, শোনো,—ও লোচন,-শুনে যাও?
লোচন চলতে গিয়ে থেমে দাঁড়ালে আবার। বললে—যাই, শশী ডাক্তারকে তামাক দিয়ে আসি, ডাক্তারবাবু আমার তামাকের খুব তারিফ করেন আজ্ঞে, আমাদের বাড়ি এলে আমার হাতের তামাক না খেয়ে নড়বেন না। সেবার অত বড় অসুখটা হলো মেজবাবুর…
ভূতনাথ থামিয়ে দিলে। বললে—থামে, সে কথা পরে হবে। কী হয়েছে ছোটবাবুর খুলে বলল দিকি আগে।
লোচন বললে—যান না, বংশীর কাছে সব শুনবেন খন।
—বংশী কোথায়।
—বংশী কি আর দাঁড়াতে পারছে আজ্ঞে, তোষাখানায় যান, দেখুন গিয়ে কী কাণ্ড হয়েছে তার।
—বংশীর আবার কী কাণ্ড হলো?
লোচন বললে-বংশীরই তো দোষ আজ্ঞে, আমি বলবো বংশীরই দোষ—হাজার বার বলবো বংশীর দোষ, এদিকে ছোটবাবুর সব্বাঙ্গ রক্তারক্তি, তার ওপর বাড়িতে ঢুকে বাবুর দেখা নেই, ওদিকে ছোটবাবু বাড়িতে নেই তো ও যেন সাপের পঞ্চাশ পা দেখেছে, তাস খেলছিল বসে-বসে তোষাখানায়-অন্যায় তো বংশীরই আজ্ঞে বেশ করেছে মেরেছে ছোটবাবু।
