ভূতনাথ বললে–তাই নাকি! আমি তো এ-সবের কিছুই জানতে পারিনি।
এখন সব মনে পড়তে লাগলো। তাই বাড়িময় কর্তাদের মুখে একটা থমথমে ভাব। ক’দিন বড়মাঠাকরুণ হাসিনী ওরা কেউ আসেনি। একলা লোচন তামাক দিয়ে এসেছে। আর মেজকর্তা নিজের মনে চুপচাপ নাচঘরে বসে কাটিয়েছেন। পায়রা উড়ছে দেখেনি ভূতনাথ। মোটর গাড়িটা চলে যাবার পর থেকেই এমনি ভাব। সমস্ত বাড়িটা যেন নিঝুম নিস্তব্ধ। ছুটুকবাবুর গানের আসর তো অনেকদিন থেকেই বন্ধ ছিল। মাঝে-মাঝে যদিও বা একটু-আধটু বসতো—তা-ও বন্ধ একেবারে। সেদিন পুকুরের দিকে লোকজন এসে কী সব মাপ-জোক করে গেল। চেন ফিতে সব নিয়ে এসেছিল ওরা। ভৈরববাবু ক’দিন এসে ফিরে গিয়েছে। চুপি-চুপি এসেছে লোচনের ঘরে। তামাক খেতে-খেতে জিজ্ঞেস করেছে-মেজবাবু কী করছে লোচন?
লোচন নল পরিষ্কার করতে করতে বলে—একলা বসে-বসে গড়গড়া টানছেন তো দেখে এলাম।
হুঁকোটা রেখে ঠোট মুছতে মুছতে ভৈরববাবু বলে—তবে যাই, দেখা করে আসি, কী বলে?
—আজ্ঞে, আমি কী বলব, আপনার খুশি হয় আপনি যান।
–তবে তুমি কী বলছে, যাবো না?
—আজ্ঞে, আমি চাকর মনিষি, আমার কথায় আপনি যাবেন কেন?
—তোমাকে মেজবাবু জিজ্ঞেস-টিজ্ঞেস করেনি আমার কথা?
–কই, মনে তো পড়ে না আজ্ঞে।
–কী রকম মেজাজ এখন দেখলে?
এখন সব মনে পড়ছে, কেন সেদিন পঞ্চায়েৎ বসেছিল নাচঘরে। কেন মোটরটা কেনা হবার পর আবার চলে গেল। কেন বালক উকিল ঘন-ঘন আসে এ-বাড়িতে। সমস্ত ঘটনার যেন একটা পারম্পর্য খুঁজে পাওয়া গেল।
ননীলাল বললে—সেই কোলিয়ারিই কিনলে, কিন্তু কেনবার আগে আমাকে একবার বললে না—এমন jealous—জানিস!
–তোকেও বলেনি? ভূতনাথও অবাক হয়ে গেল।
–অথচ ওদের মাথায় বুদ্ধিটা তো আমিই দিই—আমার কাছেই প্রথম আইডিয়াটা পায় চূড়ো, আর শেষকালে আমাকেই জানালে না। ভাবলে পাছে আমি কিছু কমিশন মারি—অনেক টাকার তত কারবার।
–শেষকালে কার কাছে কিনলে?
-লাভ যা-কিছু পেলে ঝুমুটমল। আমি তো সেই কথাই বলেছিলুম চূড়োকে, চূড়ো বললে—আমার তো একার সম্পত্তি নয়, কাকারা আছে এর মধ্যে। মেজকর্তার বন্ধুবান্ধব আছে, তারাই পরামর্শ দিয়েছে।
—ছুটুকবাবুর শ্বশুর কিছু জানতে পারেনি?
-হাবুল দত্ত? হাবুল দত্তকে পর্যন্ত জানায় নি কিছু। যা করবার সব করেছে মেজকর্তা, মেজকর্তা বাড়ির বড়, কে তার ওপরে কথা বলবে? কিন্তু চূড়ো মনে মনে রেগে আছে।
-আর ছোটকর্তা।
—ছোটকর্তা কোনোকালে কোনো দিকেই নেই, টাকা এলেই হলো তার! টাকা যতক্ষণ হাতে পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ কিছু বলবে না। এই যে এত উকিল মোক্তার ব্যারিস্টার হলো, কোট-ঘর হলো, ছোটকর্তা তো কিছুতে নেই। দলিলে সই দিয়েই খালাস, ও-সব ঝঞ্চাটের মধ্যে থাকতে চায় না ছোটকর্তা। আজকেও যে এত লোজন আসছে, খানা-পিনা ডিনার ডিঙ্ক চলছে, ছোটকর্তা খানিক থেকেই সরে পড়েছে—বেশি কথা বলে না কখনও, কিন্তু মনে মনে সব বোঝে।
তারপর সে-উৎসব শেষ হলো অনেক রাত্রে। কখন সভা ভেঙেছে, কখন লোজন চলে গিয়েছে, ননীলাল চলে গিয়েছে, ফুতি হয়েছে, নাচ-গান হয়েছে, ভূতনাথ টের পায়নি। যে-বাড়িতে পুতুলের বিয়েতে হাজার বারো শ’ টাকা খরচ হয়ে যায়, সেখানে নতুন ব্যবসায়ে নামার আগে এমন উদ্বোধন উৎসব হবে বিচিত্র কী! কোথায় আসানসোলে না বেহারে কয়লার খনি, মাটির গর্ভে রত্ন সুকোনো আছে, কতখানি তার পরিধি, কেমন তার চেহারা, কাগজে-পত্রে তার চুড়ান্ত চুলচেরা হিসেব লেখা আছে। বড়বাড়ির সিন্দুকে সে-দলিল চাবি-বন্ধ হয়ে গেল। আর ওদিকে সুখচরের বিলের জলে আর হয় তো শালুক ফোটে না, সেখানে মাছ ধরে না জেলেরা, শুকিয়ে ডাঙা হয়ে গেল বিল, বাদায় বাঘ এলে তাড়াবার ভার নেবে না কেউ, তবু অজন্ম হলে খাজনার টাকা কেউ মকুব করবে না তা বলে। সুখচরের কাছারি বাড়িতে নতুন নায়েব, নতুন গোমস্তা, নতুন পাইক বরকন্দাজ। সকালবেলা অবাক হয়ে দেখবে প্ৰজা-পাঠকরা আর এক চেহারা, আর এক মনিব। সুখচর হয় তো তেমনিই থাকবে, শুধু রাতারাতি যে হাত বদল হয়ে গেল প্রজারা তা টেরও পেলে না। ভূমিপতি চৌধুরীর পূর্বপুরুষ একদিন মোগল বাদশা’র কাছে সনদ পেয়েছিল, পেয়েছিল কোতল কচ্ছলের অধিকার, সাতটা হাতি রাখবার স্বাধীনতা। তারপর কালের চক্রান্তে সে-মোগল বাদশার চলে গিয়েছে, এসেছে ইংরেজ। ইংরেজ আমলে ভূমিপতি চৌধুরী পেয়েছেন মুনের আর সোরার বেনিয়ানি। সুখচর আর কলকাতা, মাঝখানে একটা অদৃশ্য সেতু রচনা হয়েছিল বহুদিন থেকে। গ্রাম থেকে তোক আসতে বিয়ে শ্রাদ্ধে কাজকর্মে সেলামী দিতে, নজরানা দিতে, বেগার খাটতে। এবার থেকে তা-ও ছিন্ন হয়ে গেল। চৌদ্দ পুরুষের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল একদিনে। এবার বড়বাড়ির চৌধুরীরাও বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভ করবেন। এবার কল-কারখানা খুলবেন সাহেবদের মত। মেশিন চলবে, কুলী-মজুর খাটবে, টাকা বাচ্চা পাড়বে, লেন-দেন হবে। এ-উৎসব সেই আগামী বৃহত্তর সম্ভাবনার, অনাগত প্রচুরতর ঐশ্বর্যের ইঙ্গিত। তখন এমন বড়বাড়ির মতো আরো দশটা বাড়ি উঠবে কলকাতা শহরে। আস্তাবল মোটরে ভরে যাবে। আরো চাকর, আরো ঝি, আরও মদ, আরে মেয়েমানুষ। আরো বিলাস, আরো বিশ্রাম, আরো অবসর আর আরো অপচয়। রাজাবাহাদুর হয়েছেন বৈদূর্যমণি, এবার ‘নাইট’ হবেন হিরণ্যমণি। টাকা উপায়ের জন্যে ছুটুকবাবুকে এটর্নিশিপ পরীক্ষা দিতে হবে না। সকলের ওপর টেক্কা দিতে পারবে এরা। খনি যদি তেমন চালু হয় তো ট্যাক্স বাদ দিয়েও ঘরে যা উঠবে তাতেই লাল। প্রজাদের বিদ্রোহ করবার ভয় নেই, অজন্ম হওয়ার আশঙ্কা নেই, দুর্ভিক্ষ প্লাবন মহামারী কিছুরই পরোয়া করবার দরকার নেই। সমস্ত দুনিয়া কয়লা চায়। নতুন কাপড়ের কল হবে, কয়লা চাই তাদের। রেল চলবে, কয়লা চাই তাদের। কাগজ কল, পাট কল, জলের কলসকলেরই চাই কয়লা।
